Sunday, 20 October, 2019, 12:17 AM
Home সাহিত্য-সংস্কৃতি
রবীন্দ্রনাথ ও পূর্ববঙ্গের সংগ্রাম
কামাল লোহানী
Published : Monday, 8 May, 2017 at 8:27 PM, Count : 14

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সূত্র খুঁজে পেয়েছি খুলনার পীর আলী ব্রাহ্মণ পরিবারে। আবার তার স্ত্রীর বসতবাটি ছিল খুলনারই দক্ষিণডিহিতে। এখনও তার নিদর্শন ধরে রাখতে ছোট্ট দোতলা দালানটি সংস্কার করে রবীন্দ্র-নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির জমিজিরেতে 'অবৈধ' স্থাপনাগুলোকে অথবা বসত গেড়ে বসা স্থানীয় জনগণকে সরিয়ে অনেকটা জায়গাও পরিষ্কার করা হয়েছে। রবীন্দ্র কমপ্লেক্স হিসেবে দক্ষিণডিহিকে গড়ে তোলার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে বটে; তবে আজ পর্যন্ত ছোট্ট একতলা দালান ছাড়া অন্য কিছুই চোখে পড়েনি। শিলাইদহ, শাহজাদপুর এবং পতিসরে যে তিনটি রবীন্দ্র সম্পদ স্থাপনা রয়েছে, তাতে অবশ্য কিছু উন্নতি সাধিত হয়েছে। তবে কুষ্টিয়ায় কবিগুরুর কুঠিবাড়িটি যেমন ছিল তেমনি করে আকর্ষণীয় করে তুললেও সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে যে কাচারিবাড়ি রয়েছে, তার অস্তিত্ব সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তেমন কোনো সংস্কারের হদিস মিলবে না। পতিসরে যাওয়ার দুর্গম পথটি এখন মসৃণ হয়েছে, লোক চলাচলের জন্য বস্তুতই উপযোগী হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ বঙ্গে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে সরকারি সিদ্ধান্ত হলেও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে ওঠার নমুনা দেখতে পাচ্ছি না। প্রাসঙ্গিক প্রকল্প প্রণয়নে যতটা দ্রুততা লক্ষ্য করা গিয়েছিল, এখন যেন তা অজানা কারণে থিতিয়ে পড়েছে। অবশ্য শিলাইদহ এবং শাহজাদপুরের মধ্যে কোথায় বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপিত হবে, তা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব স্থানীয় উঁচু মহলে ছিল, তার অবসান হয়েছে বলে মনে হয় না। না হলে কবিগুরুর নামে তার স্মৃতিবিজড়িত জমিদার মহলে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে যুক্তিকে কেন আশ্রয় করা হচ্ছে না? এ কথা নিশ্চিন্তে বলা যায়, শিলাইদহ কুঠিবাড়ি অঙ্গনে কবির যে জমি রয়েছে, তার চেয়ে শাহজাদপুরে জমির পরিমাণ ঢের বেশি এবং এক দাগেই সে জমি পাওয়া যাবে। তারপরও কেন এগিয়ে চলার খবর পাওয়া যাচ্ছে না?

পাঠক, বিনয়ের সঙ্গে আপনাদের জিজ্ঞেস করতে চাই, আমরা কি ক্রমেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির দাপটের কাছে আত্মসমর্পণ করছি? বোধহয় সে কারণেই 'রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়' প্রসঙ্গে কোনো উচ্চবাচ্য শুনতে পাচ্ছি না। এ প্রসঙ্গে আমার মনে পড়ে গেল ১৯৬১ সালে যখন রবীন্দ্র শতবর্ষ উদযাপন করছিলাম, তখনকার আইয়ুবি শাসনের রবীন্দ্রবিরোধী নিষেধাজ্ঞা জারির হুমকি-ধমকির কথা। একই আমলে মেয়েরা কপালে টিপ পরতে পারবে না_ এমন হুকুমও জারি হয়েছিল; কিন্তু বাংলাদেশের মেয়েরা বিশেষ করে শিল্পী সমাজ সামরিক শাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে 'বাঙালিয়ানা' বজায় রেখেছিলেন। এ সময়ের সামরিক শাসকদের ব্যর্থতার গ্গ্নানি বহন করতে হচ্ছিল বলে ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান পার্লামেন্টে তৎকালীন কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন এক বিবৃতিতে কবিগুরুকে নিষিদ্ধ করে বলেছিলেন, ্তুঞধমড়ৎব রং হড়ঃ ধ ঢ়ধৎঃ ধহফ ঢ়ধৎপবষ ড়ভ ড়ঁৎ ধৎঃ ধহফ ষরঃবৎধঃঁৎব্থ. তখন ওই জাঁদরেল সমরনায়ক আইয়ুব খানকেও তোয়াক্কা না করে আমরা পূর্ববঙ্গের প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক অধিকারকামী সচেতন জনগোষ্ঠী প্রবল ক্রোধে গর্জে উঠেছিলাম।

পার্লামেন্ট ফ্লোরে ওই কুৎসিত উচ্চারণ ওঠার পর পূর্ববাংলার প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী এককভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বাঙালিত্বের গৌরবকে অক্ষুণ্ন রাখার অঙ্গীকার ঘোষণা করে। সংগঠনটি রবীন্দ্র বর্জনের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ জানিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদ, জাতীয় পরিষদ এবং পশ্চিম পাকিস্তান পরিষদের সব সদস্যের কাছে প্রতিবাদী তারবার্তা পাঠিয়েছিল। এর পর ক্রান্তি, ছায়ানট, বুলবুল একাডেমি, সৃজনী, সংস্কৃতি সংসদ, উন্মেষ ইত্যাদি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে ঢাকা প্রেস ক্লাবে এক বৈঠকের মাধ্যমে 'সাংস্কৃতিক স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা পরিষদ' গঠন করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের ওই ৩ দিনব্যাপী রবীন্দ্র উৎসবের। ৩ দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও নৃত্যনাট্য পরিবেশন করা হয়। খবর পেয়ে এবং সংবাদপত্রে ব্যাপক সচিত্র প্রচার দেখে প্রাদেশিক গভর্নর মোনায়েম খান মিরপুর ও মোহাম্মদপুর থেকে দুই ট্রাকবোঝাই গুণ্ডা পাঠিয়ে দেন শেষ দিনের অনুষ্ঠানে আক্রমণ চালিয়ে ভণ্ডুল করার জন্য। অনুষ্ঠান শুরুর আগে ছাত্রনেতা রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনোর মতো লিকলিকে দু'জনকে পাঁজাকোলা করে বেশকিছু হকিস্টিক আমাদের দিয়ে যেতে দেখলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এগুলো কিসের জন্য? দু'জনই অত্যন্ত গুরুগম্ভীরভাবে বলেছিল, রেখে দেন, কাজে লাগবে। এখন বুঝলাম তাদের কথার অর্থ।

প্রতিবাদী রবীন্দ্র উৎসবের শেষ দিন নৃত্যনাট্য 'চিত্রাঙ্গদা' মঞ্চস্থ হবে। বিগত দু'দিনের সংবাদপত্রের খবর পড়ে উৎসুক মানুষের ভিড়ে মিলনায়তন উপচে পড়ল। আমরা সবিনয়ে ঘোষণা দিলাম, আজ চিত্রাঙ্গদার দুটি শো হবে। ইতিমধ্যে আমরা মোনায়েম খানের গুণ্ডা বাহিনী পাঠানোর খবর পেয়েছিলাম। চিত্রাঙ্গদা শুরু হয়ে গেল। প্রথম শো শুরু হওয়ার পর গুণ্ডা বাহিনীর লোকেরা সরদারের নির্দেশ অনুযায়ী পাশের রমনা রেস্তোরাঁয় গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল, কখন দ্বিতীয় শো শুরু হবে। ওই সরদারের ধারণা হয়তো হয়েছিল, প্রথম শোর এই বিপুল সমাগমে হামলা চালালে ক্ষতিটা ব্যাপক হতে পারে। তাই দ্বিতীয় শোতে হামলা চালানোর চিন্তায় সশস্ত্র গুণ্ডাদের রমনা রেস্তোরাঁয় পাঠিয়েছিল। এদিকে আমরা যখন বুঝতে পারলাম, গুণ্ডারা সরে গেছে তখন তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম, দ্বিতীয় শো হবে না। ওয়াহিদ ভাই মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে জোড়হাত করে দর্শকদের উদ্দেশে বললেন, 'নায়িকা আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় চিত্রাঙ্গদার দ্বিতীয় শো করা সম্ভব হচ্ছে না। পরে এ শো করব।' এদিকে বুলবুল একাডেমির একটি মিনিবাস ছিল। তাতে ১৫-১৬ জন বসতে পারত। আমরা তাতে নায়িকা লায়লা হাসানসহ সব মেয়েকে ওই মিনিবাসে তুলে বুলবুল একাডেমির রবীন্দ্রসঙ্গীতের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মুরাদকে বললাম, তুমি এ গাড়ির পেছন পেছন যাবে এবং সব মেয়েকে নিরাপদে বাড়ি পেঁৗছে দিয়ে ফিরবে। জনান্তিকে বলে রাখি, মুরাদ তার কোমরে অস্ত্র বহন করত। তার ওপর দায়িত্ব দিয়ে আমরা অনেকটাই নিশ্চিন্ত হলাম। ইতিমধ্যে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রেজা আলী (পরে বিটপীর স্বত্বাধিকারী) ছুটতে ছুটতে এসে বলল, এক্ষুণি বের হন। না হলে বিপদ আছে। আমরা তখন মাত্র তিনজন_ ওয়াহিদ ভাই, হাজেরা আপা এবং আমি নৃত্যনাট্যে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলো গুছিয়ে রাখছিলাম। রেজা আলী আমাদের তাড়া দিল। আমরা বেরিয়ে এলাম। বেশ দূরে রাখা ওর 'ভক্সওয়াগন ফোর ডোর' গাড়িটায় গিয়ে উঠলাম। এ কাজগুলো এত দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করলাম যে, মোনায়েম খানের গুণ্ডারা টেরই পেল না। ধানমণ্ডিতে এসে হাজেরা আপাকে নামিয়ে ওয়াহিদ ভাইয়ের পরামর্শে ওখান থেকে প্রেস ক্লাবে গেলাম চা খাওয়ার জন্য। ক্লাবে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে যাই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে। গিয়ে যে অবস্থা দেখলাম তাতে ওই মুহূর্তে কী করব বুঝতে পারছিলাম না। হলে ঢুকতেই সামনের সারির কতগুলো আসন ভাংচুর করেছে। তারপর পর্দা ঠেলে স্টেজে উঠতে দেখি লণ্ডভণ্ড অবস্থা। যা কিছু বাদ্যযন্ত্র ছিল সব ভেঙে চুরমার করে দিয়ে গেছে।

সুপ্রিয় পাঠক, আপনারা নিশ্চয় বুঝতে পারছেন, কী বিপন্ন অবস্থার মধ্যে আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ অঙ্গে মেখেছিলাম! এ না হলে বাংলা এবং বঙ্গ সংস্কৃতির ঐতিহ্য, ঐশ্বর্য আর গর্ব-গৌরব কোথায়! 'মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ'_ এ অমোঘ ও অমর বাণীর উদ্গাতা কবিগুরুকে নৃশংসভাবে ধর্মান্ধরা চাপাতির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করতে চাইছে। এরা কারা? মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে ৪৫ বছর পর কেন রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসীম উদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, হুমায়ুন আজাদ, এমনকি কুসুমকুমারী দেবীর ওপর যে মৌলবাদের হিংস্র খৰ কৃপাণ উত্তোলিত হয়েছে?

৯ মাসের চূড়ান্ত লড়াইয়ে ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নিদ্বর্িধায় প্রাণ উৎসর্গ করেছিল দেশমাতৃকার বন্ধন মুক্তির জন্য। সেই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে যারা শহীদ হয়েছিলেন, তারা তো হিন্দুও নয়, মুসলিমও নয়; বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টানও নয়। সবাই বাংলাদেশের মানুষ। যে মাটিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে কবিগুরু লিখেছিলেন 'ও আমার দেশের মাটি, তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা'_ কবির এমন প্রার্থনা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে কিশোর থেকে বৃদ্ধ নারী ও পুরুষ; সবার হাতে ছিল মুক্তির হাতিয়ার। মনে রাখতে হবে আজ সবাইকে_ 'এ দেশ আমার গর্ব, এ মাটি আমার কাছে সোনা'। সুতরাং শক, হূণ, মোগল, পাঠান কিংবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতাবাদ যে শক্তি নিয়েই আবির্ভূত হতে চেষ্টা করুক না কেন, তাকে যে ঐক্যবদ্ধ মানুষের কাছে পরাজিত হতেই হবে, অতীতেও যেমন প্রমাণিত হয়েছে, বর্তমানেও বাংলার ঐক্যবদ্ধ লড়াকু মানুষ তার জবাব দেবে শক্ত হাতে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরনমস্য, মুক্তিদাতা। তাকে অসম্মান, অবমাননা আর বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে কলুষিত, কলঙ্কিত করতে যারাই চাক না কেন; সাময়িক আত্মসমর্পণে হতবিহ্বল হতে পারি; জানি বিজয় হবে মানুষেরই অযুত রবীন্দ্রনাথের।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]