Sunday, 19 November, 2017, 3:23 AM
Home নগর জীবন
সিটিং সার্ভিস বিরোধী অভিযান স্থগিত না রণেভঙ্গ?
আবদুর রহমান
Published : Monday, 8 May, 2017 at 8:20 PM, Count : 23

পরিবহন খাত নিয়ে সরকারের নানা প্রকল্পের কথা জানা যায় প্রায়ই, তবে এ খাতকে জনবান্ধব করে গড়ে তোলার ব্যাপারে সরকারের চিন্তা-ভাবনা সব সময়ই অদৃশ্য। মনে হচ্ছে সরকারের কাজ রাস্তাঘাট করে দেয়া, আর তাতে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেয়া। গাড়িতে ওঠা এবং এরপরে কী হবে না হবে সে ব্যাপারে সরকারের কিছু করার নেই। ১৬ এপ্রিল থেকে ঢাকার রাস্তায় যানবাহন নিয়ে এমন ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটল যে, মনে হল জনতার সমস্যার সমাধান এবার না হয়েই পারে না। সরকার আর পরিবহন মালিকরা মিলে চালালেন ‘সিটিং সার্ভিস’ বিরোধী অভিযান। অভিযান মানেই গা-ঢাকা দেয়া, এটা বাংলাদেশের কেন সারা বিশ্বেরই সাধারণ চিত্র। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু হলে সন্ত্রাসীরা তো ধরা খাওয়ার জন্য বসে থাকবে না, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান শুরু হলে যাদের ভাণ্ডারে ‘অবৈধ’ অস্ত্র আছে তারা তা দান করার মতো সরকারি তহবিলে জমা দিয়ে দেবেন এমনটাও নয়, পরিবহনে ‘সিটিং সার্ভিস’ বিরোধী অভিযান হবে আর রাস্তায় গাড়ি চলবে, তা কি হয়? অভিযানে নামতে না নামতেই রাস্তার গাড়ি হয়ে গেল এক-তৃতীয়াংশ।
স্থগিতাদেশ ১৫ দিনের পর তিন মাস পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। তারপরও যারা পরিবহন খাতে শৃংখলা আসবে বা থাকবে এমনটা প্রত্যাশা করেন তারা নিশ্চয়ই এটুকু আশা করতেই পারেন যে, এই সময়টা বিআরটিএ অন্ততপক্ষে ঘুমিয়ে কাটাবে না। এবার পরিবহন মালিকদের নিয়ে তারা যে ‘মুভ’টা করেছে তা ব্যর্থ কিংবা সফল হয়েছে সেটা ভিন্ন আলোচনা, তবে এর মধ্য দিয়ে একটি বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, পরিবহন যাত্রীদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও তাদের ছুঁয়ে গেছে।
ঢাকার পরিবহন সমস্যার সমাধান বলতে বেশির ভাগই যেটা বোঝেন তা হচ্ছে নতুন নতুন গাড়ি নামানো। ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হক ঢাকায় তিন হাজার গাড়ি নামানোর ব্যাপারে আগেই একটা ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই সেদিনও তিনি জানিয়েছেন ঢাকায় আলবৎ গাড়ি নামবে, তবে একটু সময় লাগবে এই যা।
ঢাকা দক্ষিণের মেয়রও গাড়ি নিয়ে একটা ‘মুভ’ করেছেন। তিনি নেমেছিলেন লক্করঝক্কর মার্কা গাড়ির বিরুদ্ধে। তার সে অভিযানের ফলে ঢাকার কিছু গাড়ির চেহারা বদলে ‘উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট’ হলেও লক্কড়ঝক্কড় মার্কা গাড়ি ঢাকা থেকে কতটা কমেছে সে পরিসংখ্যানটা দক্ষিণের মেয়র নগরবাসীকে জানালে ভালো হতো।
ঢাকা নগরীতে ‘সিটিং সার্ভিস’ বিরোধী অভিযান বন্ধের এ সময়টা পরিবহন মালিক ও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘুমিয়ে না কাটিয়ে ‘ব্রেইন স্টর্মিং’ করলে ভালো করতেন। তারা একটা ইতিবাচক অভিযানের সূচনা করেছেন তা একেবারে ব্যর্থ হওয়াটা নিশ্চয়ই তাদের মনোজগৎকে আহত করবে। তারা আরও বেশি করে পরীক্ষা করে দেখতে পারে কী করা উচিত, যাত্রীদের কথা শুনতে পারে, নাগরিক মতামত নিতে পারে।
বেশিরভাগের মতো আমিও একমত যে, ঢাকা শহরে আসলে ‘সিটিং সার্ভিস’ জিনিসটা চলে না। তারপরও নানা কারণে এই সার্ভিসটার দরকারও আছে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ গাড়ি ও সিটিং সার্ভিসের অনুপাতটা ৫ : ১ হওয়া উচিত। কিছু গাড়ি আছে যারা শুধুই ‘সিটিং সার্ভিস’ চালায়। এটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তাদের চারটা সাধারণ গাড়ির বিপরীতে একটি ‘সিটিং সার্ভিস’ থাকতে পারে।
‘সিটিং সার্ভিস’ ও ‘গেট লক’ সার্ভিসের নামে প্রতারণা বন্ধ করতে হবে। বেশকিছু গাড়ি আছে একটা নির্ধারিত স্থান পর্যন্ত ‘লোকাল’ যাত্রী তোলে। এরপর তারা ‘সরাসরি’ হয়। এতে প্রথম থেকেই যারা ‘সরাসরি’ গাড়িতে উঠে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছতে চান তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হয়। তারা পুরো পথের ভাড়া দিলেন ‘সরাসরি’ সেবার জন্য। কিন্তু শুরুতে এবং শেষভাগে সেই গাড়িগুলোই হয়ে যায় ‘লোকাল’। মতিঝিল থেকে এ ধরনের গাড়ির ক্ষেত্রে মতিঝিল থেকে ‘ফুল সিটিং’ করে গাড়ি ছাড়বে এরপর তারা শুধু ফার্মগেটে একটা স্টপেজ দেবে, আবার ফার্মগেট থেকে গাড়ি ছাড়বে এরপর মিরপুর ১০ নম্বর স্টপেজে গিয়ে থামবে এর মধ্যে কোথাও যাত্রী নামতে পারবে না, উঠতে তো পারবেই না। এই কড়াকড়িটুকু করা গেলেই ‘সিটিং সার্ভিস’ কার্যকর ‘সিটিং সার্ভিস’ হবে।
স্বল্প দূরত্বের জন্য গাড়ি আলাদা করে দিতে হবে। এই গাড়িগুলো রাজধানীর সবগুলো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও মোড়ে থামবে। এ ধরনের একটি গাড়ি রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে গাবতলী যাওয়ার পথে প্রতি আধা কিলোমিটার দূরত্বে থামতে পারবে। এর ভাড়া হবে স্টপেজভিত্তিক। অর্থাৎ তিনি কোন স্টপেজ থেকে উঠে কোন স্টপেজে নামলেন তার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত ভাড়া প্রদান করবেন। এই স্টপেজভিত্তিক ভাড়া হওয়া উচিত সর্বনিম্ন ২ টাকা (বর্তমানে ঢাকায় সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা, যা গাড়িগুলোতে নিয়মিত অশান্তির সৃষ্টি করছে)।
রাজধানীতে যানবাহনে ওঠানামার স্থানগুলোও খুব একটা নির্দিষ্ট করা নেই। কোথাও কোথাও আছে, কিন্তু তা এমন জায়গায় যে গাড়িগুলো সেখানে থামে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রাজধানীর শাহবাগে গাড়ি থামার নির্দিষ্ট স্থান (উত্তরমুখো গাড়ির জন্য) বাংলাদেশ বেতার ভবনের বরাবর রাস্তার পশ্চিম পাশে। অথচ বেশির ভাগ মানুষই গাড়িতে ওঠার জন্য অপেক্ষা করেন বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের মূল ভবনের সামনে। আবার পূর্ব ও দক্ষিণমুখো গাড়ির ‘স্টপেজ’-এর নির্ধারিত স্থান ঢাকা ক্লাব ছাড়িয়ে। গাড়ি থামার স্থানগুলোয় লোকসমাগম হয় এবং সহজে মানুষ উঠতে-নামতে পারে এমন স্থানে করতে হবে। গাড়ি থামার সময় নির্ধারণ করে দিতে হবে। ঢাকায় একটি গাড়ি এক মিনিটের বেশি থামা উচিত না। কিন্তু দেখা যায় অনেক সময় একই রুটের আরেকটি গাড়ি না আসা পর্যন্ত একটি গাড়ি স্থান ত্যাগ করে না।
রাজধানীর পরিবহন খাতে অনিয়ম ও নৈরাজ্যের একটি বড় উদাহরণ ভাড়া। ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন সংশ্লিষ্টদের বচসা, হাতাহাতি, মারামারি বলা যায় নিত্যদিনকার ঘটনা। সরকার ও সিটি কর্পোরেশন সংশ্লিষ্টদের মাঝে (যাত্রী ও পরিবহন মালিক) গণশুনানি করে ভাড়া নির্ধারণ করা উচিত। নির্ধারিত এই ভাড়ার বিষয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করতে হবে, প্রচার করতে হবে ইলেকট্রুনিক মিডিয়ায়।
রাজধানীর যাত্রীদের ভাড়ার ক্ষেত্রে আসন পাওয়া যাত্রী এবং দাঁড়ানো যাত্রীর ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। এ ক্ষেত্রে একটা পার্থক্য থাকা উচিত। বসা আর দাঁড়ানো যাত্রীর ভাড়ার অনুপাত হওয়া উচিত ৫ : ৩।
একটি গাড়িতে কতজন যাত্রী দাঁড়িয়ে নেয়া যাবে তারও কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই। গাড়ির স্টাফরা তাদের ইচ্ছামতো গাদাগাদি করে যাত্রী তোলে। আমার মতে, একটি গাড়িতে যতজন যাত্রী বসে যাবে তার অর্ধেক যাত্রী দাঁড়িয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে দাঁড়িয়ে গেলেও অস্বস্তিকর অবস্থা থেকে রেহাই পাবেন যাত্রীরা।
কোনো ট্রাফিক সার্জেন্ট বা পুলিশ কোনো একটি পয়েন্টের গাড়ি আটকে দেয়ার পর দেখা গেছে, গাড়ির যে সারি তার দুই বা তিন নম্বরে একটি অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্সটি উচ্চস্বরে সাইরেন বাজিয়ে যাচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ চাইলে শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে অ্যাম্বুলেন্সটিকে পার করে দিতে পারেন। এ ছাড়া একই সময়ে বেশকিছু গাড়ি ছাড়ার পদ্ধতির কারণে তৈরি হয় আরেক সমস্যা। দেখা যায়, যানজট কিংবা নিয়ন্ত্রিত গাড়িবহরে সবার আগে যে গাড়িটি, সেই গাড়িতে লোক ভর্তি হয়ে গেছে, পা ফেলার জায়গা নেই, তারপরও সবাই সেই গাড়িতে ওঠার চেষ্টা করছেন। নির্ধারিত সময়ে গাড়ি ছাড়ার ফাঁকে ফাঁকে অধিকযাত্রী ভর্তি গাড়িগুলো ছেড়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত করা একটা স্বপ্নবিলাস ছাড়া কিছু নয়। তবে দ্রুত গাড়ি পাওয়া, দ্রুত গাড়িতে ওঠা, দ্রুত গাড়ি ছাড়া, দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছার কৌশল নিলে পরিবহনকেন্দ্রিক যে ভোগান্তি, তা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করি।

আবদুর রহমান : প্রাবন্ধিক
 





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com