Sunday, 19 November, 2017, 3:26 AM
Home সামাজিক
বৈশাখী ভাতার পর আরও যা করতে হবে
শরীফ মোহাম্মদ খান
Published : Monday, 8 May, 2017 at 8:17 PM, Count : 13
১৪২৩ সনের বৈশাখ মাসে বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার একটি সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত কার্যকর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। বাঙালি জনগোষ্ঠী আবহমানকাল ধরে যে ঐতিহ্য লালন করে আসছে, তাকে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা দেয়ার ব্যবস্থা এ সিদ্ধান্তের মধ্যে নিহিত রয়েছে। শুধু তাই নয়, বাঙালি নিত্যজীবনে যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণ করে চলেছে, সেটাকেই ১৪২৩ সনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় উন্নীত করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বিলম্বে হলেও শেখ হাসিনার আমল বাংলাদেশের দেহ-কাঠামোকে বাংলার ঐতিহ্যের ভূষণে আবৃত করার সাহস দেখিয়েছে।
২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য তাদের মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষের ভাতা চালুর প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়। আর ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে তা কার্যকর করে প্রথমবারের মতো নববর্ষের ভাতা দেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এবার দ্বিতীয়বারের মতো সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা নববর্ষের ভাতা পেলেন। সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি সরকারি ও বিশেষায়িত সব ব্যাংক, বেসরকারি খাতের কিছু ব্যাংক এবং কিছু কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানেও নববর্ষের ভাতা দেয়া হয়েছে। নববর্ষ ভাতার সর্বোচ্চ পরিমাণ ১৫ হাজার ৬০০ আর সর্বনিন্ম ১ হাজার ২৫০ টাকা। এই ভাতা প্রদানে সরকারের আর্থিক সম্পৃক্ততার পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা। গত বছর থেকে প্রবর্তিত নববর্ষ ভাতাকে আবার বৈশাখী ভাতারূপে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
বাঙালির সত্তা, বাংলার ঐতিহ্য-কৃষ্টি ও ভাষা বহুকাল ধরে বঞ্চনা-অবহেলার শিকার হয়ে আসছে। সেই কবে এক কবি তার মাতৃভাষা বাংলার প্রতি বিরূপতা-অবহেলা সহ্য করতে না পেরে লিখেছিলেন- যেসবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
বাংলা ভাষা-ঐতিহ্যকে যারা খাটো চোখে দেখে, বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, তাদের সবাইকে বেজন্মা বলে গালি দিয়েছিলেন সপ্তদশ শতাব্দীর কবি আবদুল হাকিম। শুধু তাই নয়, তাদের বাংলা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। যুগ যুগ ধরে এমন বিরূপতা, অবহেলা ও বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করার চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বাঙালি জনগোষ্ঠি তার ভাষা ও ঐতিহ্যকে লালন ও ধারণ করে রেখেছে। ১৯৫৪ সালে হাজার বছরের ইতিহাসে পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের যুক্তফ্রন্টীয় সরকার পহেলা বৈশাখকে জাতীয় দিবসের মর্যাদায় উন্নীত করে। বাঙালি সত্তাকে আত্মপরিচয়ে বলীয়ান করার কোনো ধরনের পদক্ষেপ পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসকগোষ্ঠীর মেনে নেয়ার কথা ছিল না। ধর্মভিত্তিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তানি রাষ্ট্রের শাসকচক্র এবং পূর্ব বাংলায় তাদের দোসর ও অনুসারীরা বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির উত্তরাধিকার থেকে বাঙালি সত্তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার কূটকৌশলে লিপ্ত হয়। এই ধারায় বাধা এসেছে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে, বিরোধিতা করা হয়েছে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে, সর্বোপরি রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে। বাঙালিকে পাকিস্তানি ধর্মীয় জাতিসত্তায় রূপান্তরিত করার ঘৃণ্য কার্যক্রমের সূত্রপাত ঘটে তখন। ফলে পাকিস্তানি ধর্মীয় রাষ্ট্রসত্তার সঙ্গে ভাষা ও ঐতিহ্যভিত্তিক বাঙালি সত্তা দ্বন্দ্ব-সংঘাতে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়।
১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনের বিরোধিতার সফল মোকাবেলায় নিষিদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীতকে অবলম্বন করে রমনা বটমূলে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মাধ্যমে বাঙালি সত্তার দীপ্ত চেতনার স্ফুরণ ঘটে, আর বাঙালির এই জাগ্রত চেতনা বঙ্গবন্ধুর ছয়দফা কর্মসূচির সাংবিধানিক প্রস্তাবনার মাধ্যমে আবর্তিত হতে হতে রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক সত্তায় রূপান্তরিত হয়। ফলে জন্ম হয় বাঙালি জাতিসত্তার আর পৃথিবীর মানচিত্রে উদ্ভব ঘটে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির।
বিভেদ-বিচ্ছেদমূলক বিশ্ব-পরিস্থিতিতে বর্তমান বাংলাদেশ সরকারের বাংলা নববর্ষ উৎসব ভাতার মতো রাষ্ট্রীয় প্রণোদনামূলক পদক্ষেপ সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও সম্প্রদায়কে ধারণ ও লালন করার প্রবণতারই লক্ষণ। আরও এমন কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, যেমন- রাজধানীসহ দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড প্রধানত বাংলা ভাষায় লিখনের উচ্চ আদালতের রায় কার্যকর করা, সরকারি আর্থিক বছর জুন-জুলাইয়ের পরিবর্তে বৈশাখ-চৈত্রভিত্তিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সময়সীমা ঘোষণা, সব স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদ্রাসায় পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ব্যবস্থা নেয়া, সর্বোপরি ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সব কার্যক্রম বাংলা সন তারিখ অনুযায়ী সম্পাদন করার পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরির রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা। বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারসহ সব বাঙালি সাধারণের দায়িত্ব হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকে প্রকৃত বাঙালি রাষ্ট্রসত্তায় পরিণত করার সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া।

শরীফ মোহাম্মদ খান : রাজনীতি-বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com