Wednesday, 22 November, 2017, 10:11 PM
Home স্বাস্থ্য
থ্যালাসেমিয়া :চিকিত্সা ও প্রতিরোধ
ডা. এ কে এম একরামুল হোসেন স্বপন
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 08.05.2017 2:16:13 PM, Count : 15

আজ ৮ মে, আন্তর্জাতিক থ্যালাসেমিয়া দিবস। থ্যালাসেমিয়া শব্দটি অনেকটা নিরীহ মনে হলেও যেসব পরিবারের সন্তানেরা এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে তাদের জন্য এর পরিণতি হয় ভয়াবহ। খুব সহজ ভাষায় বলা যায় এটি রক্ত সম্পর্কিত এবং বংশগত এক রোগ। মাতা-পিতা দুজনেই যদি এ রোগের বাহক হয়ে থাকেন তাহলে কেবলমাত্র তাদের সন্তানেরা এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে। তবে মাতা বা পিতার মধ্যে শুধু একজনই যদি এ রোগের বাহক হন তাহলে তাদের সন্তানেরা শুধু রোগটির বাহক হয়ে জন্মাতে পারে, রোগাক্রান্ত হয়ে নয়। মায়ের গর্ভধারণের  একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই এ রোগের উপস্থিতি শুরু হয় যা ভ্রূণের অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি পরীক্ষার মাধ্যমেই নির্ধারণ করা যায় যে সন্তানটি কি সুস্থ হয়ে জন্মাবে নাকি রোগাক্রান্ত বা শুধু রোগের ধারক-বাহক হয়ে জন্মাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সাধারণত থ্যালাসেমিয়া রোগটি ধরা পড়ে সন্তানটি জন্মানোর এক বা দুবছর পর। এ সময় এর উপসর্গ হিসেবে প্রচণ্ড রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।

আমাদের শরীরে যে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে তা প্লাজমা, লোহিত রক্তকণিকা, শ্বেতকণিকা, প্লেটিলেট ইত্যাদি উপাদানের  মাধ্যমে গঠিত। লোহিত রক্তকণিকার মধ্যে হিমোগ্লোবিন থাকে বলেই রক্তের রঙ লাল হয়। এই হিমোগ্লোবিনই আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নিয়মিত অক্সিজেন এবং খাদ্য উপাদান বহন করে বলেই আমরা সুস্থ ও সবল হয়ে বেঁচে থাকি। লোহিত রক্তকণিকার জীবনকাল সাধারণত ১২০ দিন। মৃত কণিকাগুলোর স্থান পূরণের জন্য আমাদের দেহ অনবরত লোহিত কণিকা উত্পাদন করে থাকে। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া রোগীর লোহিত কণিকা ১২০ দিন পর্যন্ত বেঁচে নাও থাকতে পারে অথবা লোহিত কণিকার মধ্যস্থিত হিমোগ্লোবিন ত্রুটিযুক্ত হওয়ায় রোগীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নিয়মিত অক্সিজেন সরবরাহ নাও করতে পারে। ফলে রোগী রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। দুঃখের বিষয় এই রোগ থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সহজ ও কার্যকর কোনো চিকিত্সা পদ্ধতি আজ পর্যন্ত আবিষ্কার  হয়নি। বর্তমানে  যে চিকিত্সা পদ্ধতি বিদ্যমান তা গ্রহণ না করলে এই রোগীরা মাত্র পাঁচ থেকে ছয় বছর বেঁচে থাকে।

অত্যন্ত প্রাথমিক অবস্থায় যথোপযুক্ত রোগ নির্ণয়, নিয়মিত নিরাপদ রক্ত গ্রহণ এবং কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগীরা সাধারণভাবে জীবন-যাপন করতে পারেন। অধুনা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর বিভিন্ন অভিজ্ঞ চিকিত্সকের মতামতের ভিত্তিতে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের চিকিত্সা সংক্রান্ত একটি বিধিমালা প্রণয়ন করেছে যা ‘প্রটোকল অব ট্রিটমেন্ট ফর থ্যালাসেমিয়া পেসেন্টস’ নামে প্রচলিত। অত্যন্ত সুখের বিষয় এই যে, পৃথিবীব্যাপী যে বিপুল জনগোষ্ঠী এ রোগ নিয়ে ভুগছেন তাদের অনেকেই প্রণীত এ বিধিমালা যথাযথ অনুসরণ করে প্রায় স্বাভাবিক মানুষের মতোই  জীবন-যাপন করছেন, লেখাপড়া করছেন, জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করছেন এবং বাবা-মাও হচ্ছেন। অথচ দুঃখের বিষয়, এ চিকিত্সা পদ্ধতি এতোটাই ব্যয়বহুল যে বেশিরভাগ বাংলাদেশি রোগীর পক্ষে ব্যয়ভার বহন করা সাধ্যাতীত। বাংলাদেশে এই খরচ মাসে সাত হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। কারণ নিয়মিত নিরাপদ রক্ত গ্রহণ থ্যালাসেমিয়া রোগীর প্রাথমিক চিকিত্সা হলেও এটা হলো চিকিত্সার সর্বনিম্ন খরচের অংশ। সবচাইতে বড় খরচের অংশ হলো ওষুধ গ্রহণ। থ্যালাসেমিয়া রোগীর শরীরে অতিরিক্ত লৌহ জমার প্রধান কারণ হলো নিয়মিত রক্ত গ্রহণ। প্রতিবার রক্ত গ্রহণের সঙ্গে এই লৌহের পরিমাণ উত্তরোত্তর বেড়ে যায়। এই লৌহ ক্রমান্বয়ে জমা হতে থাকে রোগীর বিভিন্ন প্রত্যঙ্গে যেমন- যকৃত, অগ্নাশয় ও হূদযন্ত্রে। ফলে রোগী ধীরে ধীরে জন্ডিস, বহুমূত্র  প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হয় এবং সর্বশেষ হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এছাড়াও এই অতিরিক্ত লৌহ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় হরমোন তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত করে। কাজেই থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিতভাবে লৌহ অপসারণকারী ওষুধ সেবন করা অত্যাবশ্যকীয়।

বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় বাংলাদেশের শতকরা ১০ থেকে ১২ ভাগ মানুষই থ্যালাসেমিয়া রোগের  বাহক। এ দেশে দুই বাহকের বিয়ে বিরল ঘটনা নয় এবং এর ফলে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার  শিশু জন্ম নিচ্ছে এ রোগ নিয়ে যাদের একটা সামান্য অংশই পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের রোগ নির্ণয় করছে এবং নিয়মিত ওষুধ গ্রহণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে। কিন্তু অধিকাংশ অকালে মৃত্যুবরণ করছে শুধু  যথাসময় রোগ নির্ণিয় না হওয়ার কারণে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, খুব সহজেই কিন্তু এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। ব্যাপক জনসচেতনতার মাধ্যমে বিয়ের পূর্বে রক্তের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে বাহক নির্ণয় করে বাহকে বাহকে বিয়ে নিরুত্সাহিত বা বন্ধ করার মধ্যদিয়েই কেবলমাত্র এ রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। সাইপ্রাস, ইতালি, গ্রিস যার প্রকৃত উদাহরণ। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া হাসপাতাল মাত্র ৫০০/- (পাঁচশ’) টাকার বিনিময়ে এ রোগের বাহক নির্ণয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে।               

আমরা আশা করবো, বর্তমান জনদরদী সদাশয় সরকার এই ভয়াবহ রোগীদের জীবন রক্ষায় আধুনিক চিকিত্সা প্রদানের সর্বোত্তম ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। পাশাপাশি এ রোগ প্রতিরোধে সরকারিভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, গ্রুপ মিটিং, প্রচারপত্র বিতরণ এবং সকল প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এ রোগ ও তার প্রতিরোধ সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে প্রচারের মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে এ রোগ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত করে থ্যালাসেমিয়া মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।

লেখক :সিওও এবং কনসালটেন্ট (প্রজেক্ট ডেভলপমেন্ট) বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সমিতি ও হাসপাতাল







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com