Sunday, 19 November, 2017, 3:11 AM
Home বিশ্ব
ইন্দিরাজিকে তারা আবার জেলে পাঠাল
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Count : 33

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে
 প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর ৮ম কিস্তি

ঠি ক করলাম, বিধানসভা নির্বাচনে ৫০ আসনে প্রার্থী দেব। কিন্তু নির্বাচনের দিন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে প্রবল উত্সাহ দেখে ১২৬টির মধ্যে ১১৫ আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়। নির্বাচনে লড়তে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। কলকাতা ও অসম থেকে আমি যত্সামান্য সংগ্রহ করলাম। দিল্লির কেন্দ্রীয় অফিসও যতটা সম্ভব সাহায্য করল।

ইন্দিরা গান্ধী এলেন অসমে এবং চারদিনে ৫৭টি জনসমাবেশে ভাষণ দিলেন। ভোর ৬টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত তিনি কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমাদের মিটিং মিছিলে প্রায়ই হামলা হতো। বঙ্গাইগাঁও-এ একটা সভাও করতে দেওয়া হলো না। শিলচরে আমার গায়ে পাথর পড়ল। তীব্র বিক্ষোভ দেখানো হল গুয়াহাটি, নওগাঁও, শিবসাগর ও জোরহাটে। স্থানীয় সংগঠনের দুরবস্থার জন্য উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা থেকে মহসিনা কিদোয়াই, গনিখান চৌধুরী, এপি শর্মা, রামদুলারী সিং, অশোক ভট্টাচার্যের মতো নেতারা এসে মিটিং-মিছিল করতে লাগলেন।

সব চেষ্টা প্রায় ব্যর্থ হল। কংগ্রেসের ভোট ভাগাভাগির সুযোগটা নিল জনতা পার্টি। আমরা পেলাম ৮ আসন আর কংগ্রেস (ও) ২৬। মুসলিম অধ্যুষিত বড়পেটা ও ধুবড়ি থেকে এল চারটি আসন। নেতাদের মধ্যে জিতলেন কেবল সৈয়দা আনোয়ারা তৈমুর।

কিন্তু কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশের ফল হলো অপ্রত্যাশিত। দুটি রাজ্যে কংগ্রেস (আই) পেল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন আর সাফ হয়ে গেল কংগ্রেস (ও)। খুব সামান্য আসন পেয়ে জনতা পার্টি দ্বিতীয় স্থানে। মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস (আই) দ্বিতীয় স্থানে, প্রথম কংগ্রেস (ও), তৃতীয় জনতা পার্টি। অথচ এই মহারাষ্ট্রেই এক বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে জনতা পার্টি ৪৮-এর মধ্যে ২১ আসন জিতেছিল।

কংগ্রেস (ও)-র দুই স্তম্ভ ওয়াইবি চ্যবন ও ব্রহ্মনন্দ রেড্ডিকে তাদের নিজেদের রাজ্যেই ইন্দিরা গান্ধী শুইয়ে দিলেন। যে ইন্দিরা গান্ধীকে আবর্জনার স্তূপে ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিল জনতা পার্টি, তাদের কাছে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল হয়ে উঠল আতঙ্ক ও অবিশ্বাসের কারণ।

বিভিন্ন রাজ্যে প্রচারের সময় সংবাদমাধ্যম বিস্মিত হয়ে দেখল ইন্দিরাজির কর্মতত্পরতা ও উদ্যম। জনসভায়, পথের পাশে শুধু তাঁকে একবার চোখের দেখা দেখতে মানুষ ৫-৬ ঘণ্টা অবধি অপেক্ষা করছে। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে অনগ্রসর ও দরিদ্রদের মধ্যে তাঁর বিস্ময়কর জনপ্রিয়তা প্রত্যক্ষ করেও সংবাদমাধ্যম মন্তব্য করল, কর্নাটক ও অন্ধ্রে জয় যথাক্রমে দেবরাজ আরস ও চেন্না রেড্ডির জন্য। সঙ্গে ছিল নির্বাচনে প্রচুর টাকার খেলার অভিযোগ। জনতা পার্টি ও সংবাদমাধ্যম এতটাই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে যে, ১৯৭৮-এর শেষপর্বে চিকমাগালুর থেকে উপনির্বাচনে শ্রীমতী গান্ধীর বিপুল জয়ের পর বর্ষীয়ান নেতা, জনতা পার্টির জেবি কৃপালনী বললেন, দেবরাজ আরস ওই কেন্দ্র থেকে স্কুলের একটি মেয়েকেও জিতিয়ে আনতে পারতেন।

মহারাষ্ট্রে কংগ্রেস (ও) কী করবে, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিল। জনতা পার্টির সঙ্গে সরকার গড়লে তাদের সঙ্গে জনতা পার্টির গোপন আঁতাতেরর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হবে আবার কংগ্রেস (আই)-র সঙ্গে সরকার গড়াও অসুবিধানজনক, কারণ, তার সদস্যরা ‘বিতাড়িত’ ও ‘স্বৈরাচারী’। শেষপর্যন্ত দুই কংগ্রেস মিলে সরকার গড়ল সেখানে। মুখ্যমন্ত্রী হলেন বসন্ত দাদা পাতিল (কংগ্রেস-ও), উপমুখ্যমন্ত্রী আমাদের তরফে তিরপুরে। তবে এ সরকার টেকেনি, ১৯৭৯-তে শারদ পাওয়ারের সঙ্গে কংগ্রেস (আই)-তে যোগ দেন বিপুল সংখ্যক কংগ্রেস (ও) নেতা-কর্মী।

১৯৭৭-এ পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী এসবি চ্যবন কংগ্রেস ছেড়ে গেলেও ১৯৭৯-তে কংগ্রেস (আই)-তে যোগ দিয়ে শারদ পাওয়ারের সরকারে অর্থমন্ত্রী হন। ৭৯-এর নভেম্বর ব্রহ্মানন্দ রেড্ডিও চলে এলেন কংগ্রেস (আই)-তে।

আগের বছর রাজ্যসভায় জনতা পার্টির আসন সামান্য হলেও ১৯৭৮-এর মার্চের নির্বাচনে বিধানসভার শক্তির নিরিখে বেশি আসনে জয়ী হয় জনতা পার্টি। আমরা কম আসনে জয়ী হলেও রাজ্যসভার বিতর্কে তেড়েফুঁড়ে নেমে পড়লাম। সরকারের নিরন্তর সমালোচনা ধারালো হয়ে উঠল। পুরনো কংগ্রেস সদস্যদের সরকারের লেজুড় হয়ে থাকার অভ্যাস তখনও অব্যাহত। কল্পনাথ রাই, এনকেপি সালভে, সরোজ খাপার্দে, মার্গারেট আলভা রাজ্যসভায় ঝড় তুলতে থাকলেন। সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়ে আমাকে বক্তব্য রাখতে হতে পারে এ বিষয়ে দল আমাকেই মুখপাত্রের দায়িত্ব অর্পণ করে।

অন্ধ্র-কর্নাটক জয়ের পর একটার পর একটা সাফল্য আসতে শুরু করল। লোকসভায় আমরাই হয়ে গেলাম একক বৃহত্তম বিরোধী দল। আমাদের ৭৬, অন্য কংগ্রেসের ৭৩। সিএম স্টিফেন (কং-আই) বিরোধী নেতা নির্বাচিত হলেন। নভেম্বর ১৯৭৮-এ কর্নাটকের চিকমাগালুরে ইন্দিরাজির বিপুল জয় অতি অবশ্যই ঐতিহাসিক ঘটনা। তাঁর ভোটে দাঁড়াবার ব্যাপারটা আমরা কৌশলগত কারণে গোপন রাখি। আশঙ্কা ছিল, তিনি ভোটে দাঁড়াচ্ছেন জানলে সরকার উপ-নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারে। ইন্দিরাজি সংসদে যান এটা তারা দুঃস্বপ্নেও চায়নি। ভোটের দিন ঘোষণার পর তাঁর নাম প্রকাশ্যে আসায় জনতা পার্টিতে ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। চেষ্টা করা হয় একজন জবরদস্ত প্রার্থী দিতে। কিন্তু জাঁদরেল নেতাদের কেউই তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে রাজি হননি, যদিও সবাই তাঁকে হারাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন।

চরণ সিংরা নির্বাচনী প্রচারে বলতেন, শ্রীমতী গান্ধীকে তোমরা লোকসভায় পাঠিয়ে কী করবে, আমরা তো ওকে জেলে পাঠিয়ে দেব।

শীত অধিবেশনে সংসদে ইন্দিরাজি যোগ দিলেন, শপথ নিলেন। কয়েকদিনের মধ্যে তাঁকে সংসদ থেকে নির্বাসিত করা হলো। ইন্দিরাজিকে বলা হলো, তোমার কাজকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে নাও, তাহলে শাস্তির মাত্রা কমবে। ইন্দিরাজি বললেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। জেলে যাওয়া আমার কাছে নতুন ব্যাপার নয়। সুটকেস গুছিয়েই রেখেছি। শুধু শীতবস্ত্রগুলো নেওয়া বাকি। সংসদ সদস্যদের প্রতি জ্বালাময়ী ভাষণে ইন্দিরাজি বললেন, আমার মাথা আপনাদের জিম্মায় রেখে দিলাম। সিদ্ধান্ত নিন শিরচ্ছেদ করবেন কি না। তবে যে সিদ্ধান্ত আপনারা নিন, নিজেদের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকবেন। আমি সবই মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। স্টিফেনও সেদিন চমত্কার বলেছিলেন। জনতা দল অবশ্য তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রেখেছিল। ইন্দিরাজিকে তারা আবার জেলে পাঠাল। আদেশ ছিল: সংসদ মুলতবি হওয়া পর্যন্ত ইন্দিরাজি জেলে থাকবেন। সপ্তাহখানেক তিনি তিহার জেলে থাকলেন, কাগজে ছবি-টবি বেরোল। আমরা বুঝলাম পাঁচমিশেলি জনতা সরকার নিজেদের কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেছে। আগের বার জেলে পাঠানোর চেয়েও এবারের পরিস্থিতি ভিন্নতর। দক্ষিণ ভারতে বিজয়গর্বে ইন্দিরা কংগ্রেসের পতাকা উড়ছে। আজমগড় উপ-নির্বাচনে মহসিনা কিদোয়াই বিপুল ভোটে জিতলেন। হিন্দি বলয়েও দারুণভাবে ফিরে আসার লক্ষণগুলি পরস্ফুিট হচ্ছে। এ সময়ে নেত্রীকে জেলে পাঠানোর চেয়ে বোকামি আর কী হতে পারে!

নভেম্বরে আমরা লন্ডনে গেলাম। ইন্দো-ব্রিটিশ ফ্রেন্ডশিপ সোসাইটি-সহ বিভিন্ন সংস্থার আমন্ত্রণে শ্রীমতী গান্ধী, সস্ত্রীক আমি, সোনিয়া গান্ধী, এপি শর্মা, দরবারা সিং, সিএম স্টিফেন ও মাধব সিং সোলাঙ্কি। লেবার পার্টি তখন ক্ষমতায়। ওঁদের সঙ্গে আমাদের সখ্য বরাবর। প্রধানমন্ত্রী কালাহান ইন্দিরাজির প্রশংসা করলেন। শ্রীমতী গান্ধী বিরোধী নেত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সঙ্গেও মিলিত হন। মাইকেল ফুটের বক্তৃতা আমার এখনো মনে পড়ে। লেবার পার্টির অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ নেতা বলেছিলেন, ইন্দিরা গান্ধী একটি অধ্যায়ের নাম। ইতিহাসের নিয়মেই তিনি এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছবেন, অন্য নেতারা তাঁকে কখনো ছুঁতে পারবে না।

সাউথ হলে ইন্দিরার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল একদল ভারতীয়। তারা পচা ডিম, টমেটো ইত্যাদি ছুঁড়ছিল। আমার স্ত্রী গীতা গিয়ে খপ করে একজনের হাত চেপে ধরে প্রশ্ন করে, কেন এসব ছুঁড়ছ? কীসের বিক্ষোভ? ইন্দিরা গান্ধী কেন ফ্যাসিস্ট, তা ব্যাখ্যা করো। ফ্যাসিস্ট কাকে বলে? সেই বিক্ষোভকারী একটুও নার্ভাস না হয়ে রাগ করে বলল, এত কথার আমি কী জানি। আমাদের দশ পাউন্ড করে দিয়েছে, তাই বিক্ষোভ করছি। তুমি আমাদের দশ পাউন্ড দাও, আমরা এখনই লং লিভ ইন্দিরা গান্ধী বলতে শুরু করব। এ নিয়ে পরে আমাদের মধ্যে খুব হাসাহাসি হয়েছিল, জনতা নেতারা অবশ্য খুব চটে গিয়েছিলেন।

(চলবে)







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com