Sunday, 19 November, 2017, 3:15 AM
Home বিশ্ব
স্মৃতির ইন্দিরা
কংগ্রেসে ফিরে এল পুনর্জীবনের উচ্ছ্বাস
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Count : 21

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে
 প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর ৭ম কিস্তি

সংকটপূর্ণ সময়ের দাবিতেই জরুরি অবস্থার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে

হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—কংগ্রেসের ঘোষিত মতাদর্শ আর দেশের

অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং যে ভয়ানক অরাজকতা দেশের ওপর নেমে

এসেছিল, তাকে প্রতিহত করে দেশে আইন-শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা

ক র্নাটক ও শাহ কমিশন নিয়ে ওয়ার্কিং কমিটি যে নেতিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নেয় তার প্রতিবাদে ১৮ ডিসেম্বর ইন্দিরাজি ওয়ার্কিং কমিটি ও কংগ্রেস পার্লামেন্টারি বোর্ড থেকে পদত্যাগ করলেন। কংগ্রেস নেতৃত্ব যেন হাতে স্বর্গ পেল। ২০ ডিসেম্বর, ১৯৭৭, দ্য স্টেটসম্যানকে একজন বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা বললেন—এক কথায় বলতে গেলে এগারো বছর ধরে তার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ হয়েও আমরা আমাদের বিবেক ওর কাছে বন্ধক রেখেছিলাম।

কিছুদিন পর হায়দরাবাদে ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি বললেন—উনি চেয়েছিলেন আমরা লড়াই করি, রাস্তায় নামি আর জেলে যাই। জেলে যেতে ভয় পাই না। উনি মাত্র ৯ মাস জেল খেটেছেন আমরা বহু বছর কারারুদ্ধ থেকেছি। উনি কি চান আমরা ওঁর জন্য জনতা নেতাদের সঙ্গে হাতাহাতি শুরু করি? নাকি সঞ্জয় গান্ধী, বংশীলাল অথবা যশপাল কাপুরের হয়ে তাদের সঙ্গে তর্কে বসি? ১৮ জানুয়ারি দ্য স্টেটসম্যানে তাঁর এই বিবৃতি বের হলো—একটা ২৭ বছরের ছোকরাকে ভবিষ্যত্ প্রধানমন্ত্রী বানাতে গিয়ে দলটাই মুখ থুবড়ে পড়ল।

ওই দিন আনতুলের ২ জনপথের বাড়িতে জাতীয় সম্মেলনের জন্য স্টিয়ারিং কমিটি গঠিত হলো। ৭২ জনের কমিটিতে যাতে সামান্যতম বিতর্কিত কোনো নাম না থাকে, সে বিষয়ে আমরা সচেষ্ট ছিলাম। কমিটিতে স্থান না পেয়ে বহু নেতা তাদের অসন্তোষ চেপে রাখতে পারেননি।

সে সময় আমরা রোজ বসতাম। বুটা সিং, ভগত্, ললিত মাকেন ও জগদীশ টাইটলারকে প্রতিনিধিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা ও প্যান্ডেল বানানোর ভার দেওয়া হলো। তদারকির দায়িত্বে আমি, আনতুলে এবং আরও কয়েকজন। নরসিংহ রাও, আজাদ, মৌর্য আর বিহারের ভিকে সিং-এর সঙ্গে কথা বলে আমাকে সমস্ত প্রস্তাবের খসড়া প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হলো। চাঁদা সংগ্রহের কাজও আমার কাঁধে। এ ব্যাপারে দেবরাজ আরস ও আরও কয়েকজন সাহায্য করতেন। ঠিক হলো, নরসিংহ রাও, বুটা সিং, এপি শর্মা ও এম চন্দ্রশেখরের স্বাক্ষরিত আমন্ত্রণপত্র পাঠানা হবে সিডব্লুসিসহ সব জায়গায়। উদ্বোধন করবেন মীর কাশিম, সভাপতি কমলাপতি, ত্রিপাঠী আর মূল বক্তা ইন্দিরা গান্ধী। দিন স্থির হলো ১-২ জানুয়ারি, ১৯৭৮। সভাস্থল বিঠলভাই প্যাটেল হাউসের লনে।

এআইসিসি-র অধিবেশনের সব নিয়মরীতি মেনে সেই সম্মেলন হয়েছিল। সারা দেশ থেকে সমাগত পাঁচ হাজার প্রতিনিধি ইন্দিরা গান্ধীকে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত করলেন। দলের সমস্ত শাখা কমিটি পুনর্গঠিত করার অধিকারও তাকে দেওয়া হলো। উদ্বোধনী ভাষণে সৈয়দ মীরকাশিম, ইন্দিরাজি তার ভাষণে সম্মেলন ডাকা ও দল ভাঙার কারণগুলোর ব্যাখ্যা করলেন। রাজনৈতিক প্রস্তাবেও বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁর ভাষণে ইন্দিরাজি জনতা পার্টির রাজনীতি ও কর্মসূচি নিয়ে বলতে গিয়ে দেখালেন, তাদের ভূমিকা কতটা জনবিরুদ্ধ ও পশ্চাত্মুখী। তিনি সর্বস্তরের কংগ্রেস কর্মী ও নেতাদের এক হবার ডাক দিলেন। জরুরি অবস্থার সময় বিভিন্ন ব্যক্তির ‘বাড়াবাড়ি’ নিয়ে তিনি বললেন, তিনি জানেন না ঠিক কী ধরনের কাজ তাঁরা করেছেন, কিন্তু যাঁরা এমন কাজ করে জনতার কাছে ভর্ত্সিত তাদের কংগ্রেসের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অধিকার নেই।

স্বভাবত প্রশ্ন উঠল এভাবে কংগ্রেসের বর্তমান প্রেসিডেন্টকে হটিয়ে দেওয়া যায় কি? দলের গণতন্ত্রে রয়েছে একমাত্র এআইসিসি-এর সম্মেলন প্রতিনিধিরা কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচন করতে পারেন। এই যুক্তিতেই নির্বাচন কমিশন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস নাম ও নির্বাচনী প্রতীক গরু-বাছুর থেকে ইন্দিরাপন্থিদের বঞ্চিত করে। ভাঙনের পর আমাদের দলের নাম হলো কংগ্রেস (আই), আর প্রতীক চিহ্ন করতল। ১৯৮০ সালে নির্বাচন কমিশন ও সুপ্রিম কোর্ট দুবছর ধরে বিচারবিবেচনা করে আমাদের দলকে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস বলে ঘোষণা করে এবং ওই কনভেনশনকে কংগ্রেসের ৭৬তম সম্মেলন বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

পার্টি ভাগ হওয়ার পর সবচেয়ে সরেস মন্তব্য এল চ্যবনের কাছ থেকে। ঠাট্টা করে বললেন, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, ওঁরা ইন্দিরাকে কংগ্রেস সভাপতি করেই সন্তুষ্ট। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলে ঘোষণা করেনি। ইন্দিরা ক্যাবিনেটের একদা অর্থমন্ত্রী সি সুব্রহ্মণ্যম বললেন, কংগ্রেসের ভাঙন মতাদর্শগত দ্বন্দ্বপ্রসূত এবং তাঁর শিকড় জরুরি অবস্থার বাড়াবাড়িতে প্রোথিত। অবশ্যই দ্বন্দ্বটা ছিল মতাদর্শগত। শ্রীমতী গান্ধী ২১ জানুয়ারি সিডব্লুসি-এর মিটিংয়ে এর জবাব দিলেন—শ্রী সুব্রহ্মণ্যম যে মতাদর্শগত তফাতের কথা বলেছেন, সেটাই এই ভাঙনের মূল কারণ। বলেন, সংকটপূর্ণ সময়ের দাবিতেই জরুরি অবস্থার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—কংগ্রেসের ঘোষিত মতাদর্শ আর দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা এবং যে ভয়ানক অরাজকতা দেশের ওপর নেমে এসেছিল, তাকে প্রতিহত করে দেশে আইন-শৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা।

দল ভাঙার পর ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসে ফিরে এল পুনর্জীবনের উচ্ছ্বাস। কেবল কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে নয়, জনতার প্রাণেও আবার আশার আলো জাগল। ইন্দিরার অনমনীয় ব্যক্তিত্বের পাশে জড়ো হতে লাগল সর্বস্তরের মানুষের আকাঙ্ক্ষা-প্রত্যাশা।

কিন্তু কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতারা আর সংবাদমাধ্যম মন্তব্য করতে থাকল, কংগ্রেস ভাগ আসলে ইন্দিরার কংগ্রেসকে কুক্ষিগত করার বাসনা থেকে উদ্ভূত এবং এই পদক্ষেপ তাকে ভারতীয় রাজনীতি থেকে চিরতরে মুছে দেবে। মাত্র দুমাসের মধ্যে প্রমাণিত হয়ে গেল তাঁদের বক্তব্যের অসারতা।

ঘোষিত হলো অন্ধ্র, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র, অসম ও অরুণাচলের নির্বাচন। আমরা অরুণাচল ছাড়া বাকি ৪ রাজ্যেই লড়ব ঠিক করলাম। ইতোমধ্যে একটা মজার ঘটনা ঘটে।

শাহ কমিশনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় শ্রীমতী গান্ধী ও আমি শপথ নিতে অস্বীকার করি, তারপর কমিশন ভারতীয় পেনাল কোডের ১৭৮-১৭৯ ধারা মোতাবেক আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। দিল্লির তিস হাজারি কোর্টে আমাদের হাজিরা দেওয়ার ডাক পড়ল।

দুজনেই বললাম, ভুল করিনি, আমরা নির্দোষ, একথা জানানোর পর পার্সোনাল বন্ডে জামিন পাই। আমাদের আইনজীবী প্রয়াত ফ্রাঙ্ক অ্যান্টনি বিচারককে অনুরোধ করেছিলেন পরবর্তী শুনানির দিন যেন মার্চে রাখা হয়, কারণ আমরা দুজনেই কংগ্রেস (্আই)-এর নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত থাকব। সে কথা শুনে শাহ কমিশনের আইনজীবী খান্ডেলওয়ালা তীর্যক ভাষায় বলেছিলেন, কংগ্রেস (আই) বলে আবার কোনো পার্টি আছে নাকি? অ্যান্টনি তত্ক্ষণাত্ জানিয়েছেন, অচিরেই সেটা বুঝতে পারবেন।

জানুয়ারির শেষে শ্রীমতী গান্ধী এআইসিসি ও সিডব্লুসি-এর কার্যনির্বাহী সমিতি গঠন করলেন। জানুয়ারির শেষদিকে দুজন সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হলেন—বুটা সিং ও এআর আনতুলে। এআইসিসি-এর কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করে আমার কাজ বাড়িয়ে দিলেন ইন্দিরা। এছাড়া আমাকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হলো। প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে ১৫ দিন জেলা সফর করলাম। এবিএ গনিখান চৌধুরী নির্বাচিত হলেন প্রদেশ কংগ্রেস (আই) সভাপতি। সে সময় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কংগ্রেসের বিধায়ক মাত্র ২০ জন। এদের ৯ জন আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। গুয়াহাটিতে ঘাঁটি করে নাগাল্যান্ড, মণিপুর, মেঘালয়, অরুণাচল প্রদেশ ও মিজোরাম সফর করলাম। তিলক গগৈ তখন অসমের কংগ্রেস (আই) সভাপতি। কিন্তু উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোনো উল্লেখযোগ্য কংগ্রেস নেতা আমাদের সঙ্গে ছিলেন না। মেঘালয়ের ক্যাপ্টেন উইলিয়াম সাংমা, নাগাল্যান্ডের হোকিসে সেমা, মণিপুরের আরকে দোরেন্দ্র সিং ১৯৭৮-এর শেষদিকে আমাদের দলে যোগ দেন। অরুণাচল প্রদেশ ও সিকিমের মুখ্যমন্ত্রীসহ গোটা দলই জনতা পার্টিতে চলে গিয়েছিল। ত্রিপুরার অনেক নেতা-কর্মী কংগ্রেস ফর ডেমোক্রেসি ও জনতা পার্টিতে ভিড়ে যান।

কাজটা কঠিন ছিল, তবু অরুণাচল প্রদেশ ছাড়া অন্য ৬ রাজ্যে কংগ্রেস (আই)-এর শাখা গঠিত হল। প্রদেশ সভাপতি নির্বাচিত হলেন এডোয়ার্ড পি গায়েন (মেঘালয়), লাল থানওয়ালা (মিজোরাম), চিতেন জামির (নাগাল্যান্ড), প্রফেসর এন তোম্বি সিং/রিসাং কেইসিং (মণিপুর)।

এরপর অসমের সব জেলায় ঘুরতে শুরু করলাম। বিশিষ্ট যেসব নেতারা আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন, তারা হলেন: তিলক গগৈ (রাজ্যসভা সাংসদ), হরেন্দ্রনাথ তালুকদার, বিষ্ণুপ্রসাদ (উভয়েই প্রাক্তন মন্ত্রী), আনোয়ারা তৈমুর, ধরণীধর বসুমাতারি (প্রাক্তন সাংসদ) ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি ধ্রুব বরুয়া। দেবকান্ত বরুয়ার চোখের মণি হিতেশ্বর শইকিয়ার সঙ্গে তখন ছাত্র ও যুবাদের বড়ো অংশ। ১৯৭৭-এ ১৪টি আসনের যে ১০ জন কংগ্রেস সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাদের কেউ কংগ্রেস (আই)-এর সঙ্গে এলেন না।

ঠিক করলাম, বিধানসভা নির্বাচনে ৫০ আসনে প্রার্থী দেব। কিন্তু নির্বাচনের দিন ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের মধ্যে প্রবল উত্সাহ দেখে ১২৬টির মধ্যে ১১৫ আসনে প্রার্থী দেওয়া হয়। নির্বাচনে লড়তে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। কলকাতা ও অসম থেকে আমি যত্সামান্য সংগ্রহ করলাম। দিল্লির কেন্দ্রীয় অফিসও যতটা সম্ভব সাহায্য করল।

(চলবে)









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com