Sunday, 19 November, 2017, 3:14 AM
Home বিশ্ব
স্মৃতির ইন্দিরা
দ্বিতীয় ভাঙনের আগে এবং পরে
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 08.05.2017 2:01:26 PM, Count : 20

 ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর ষষ্ঠ কিস্তি

আমরা দল ভাঙতে চাইনি। বুঝেছিলাম একমাত্র ইন্দিরাজির নেতৃত্বে দল আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে। স্বাক্ষর সংগ্রহ যখন চলছে তখন একদিন গভীর রাতে ব্রহ্মানন্দের সঙ্গে দেখা করলেন ইন্দিরা। বললেন, জনতা পার্টি সরকার আমাদের নেতাদের গ্রেফতার করে হয়রানি করছে। দেশের প্রতিটি কোণ থেকে কংগ্রেস কর্মীদের অত্যাচারিত হওয়ার খবর আসছে। এ অবস্থায় কংগ্রেস চুপচাপ বসে থাকতে পারে না

ইন্দিরার গ্রেফতারি ও তার হাস্যকর পরিণতিতে জনতা পার্টির মধ্যেই বিভ্রান্তি দেখা দিল। ঘটনার জন্য পার্টির মধ্যে চরণ সিং-এর বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ির অভিযোগ উঠল। নেতৃবৃন্দের মধ্যে শুরু হলো বিশৃঙ্খলা আর জনসাধারণের কাছে মুখ পুড়ল। এই ঘটনা থেকে জনতা পার্টির প্রতিহিংসা প্রবৃত্তি যেমন প্রকট হলো, তেমনই চূড়ান্ত প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও অপদার্থতাও সামনে এল। লোকে বলতে লাগল—যে মহিলা শ’খানেক নেতাকে জেল খাটিয়েছেন, তাঁকে ১৯ ঘণ্টাও কয়েদে রাখার মুরোদ হলো না। দিল্লিতে গুজব ছড়াল, এই ঘটনায় অব্যাহতি চেয়েছিলেন বিচারপতি শাহ, প্রধানমন্ত্রী কোনোভাবে তা ঠেকিয়েছেন।

আমাদের সামনে তখন কঠিন লড়াই। জানতাম, আগামী কয়েকমাসে ইন্দিরা দলের অভ্যন্তরে ও বাইরে যুগপত্ আক্রান্ত হবেন। সেইসব আঘাতকে প্রতিহত করতে আমরা নিজেদের কৌশল ঠিক করতে লাগলাম।

গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গে সিডব্লুসি বৈঠক ডেকে নিন্দা করেছিল ঠিকই, কিন্তু ইন্দিরার গ্রেফতারিতে কংগ্রেসের সর্বস্তরের কর্মীদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ দেখে নেতাদের কেউ কেউ বিমূঢ় হয়ে পড়লেন—আর না এগিয়ে তাঁরা চাইলেন ইন্দিরা গান্ধীকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে দেওয়া হোক। যেখানে যাচ্ছিলেন, সেখানেই তাঁর বহাল জনপ্রিয়তা দেখে কেবল জনতা পার্টি নয়, কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতাদেরও দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল।

প্রেসিডেন্ট ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি চমত্কার মানুষ হলেও পার্টির অভ্যন্তরের ইন্দিরা-বিরোধী গোষ্ঠীর প্রভাবে ইন্দিরার সমর্থনে সেভাবে এগোতে সাহস করলেন না। বর্ষীয়ান নেতাদের বক্তব্য ইন্দিরাকে তাঁর ‘ককাসে’র বাইরে এসে তাঁদের নির্দেশ মতো চলতে হবে।

দ্বিতীয় ভাঙনের আগে এবং পরে

১৫ অক্টোবর জনতা পার্টির অত্যাচারের নিন্দা করতে এআইসিসি-র বৈঠক ডাকা হলো। কিন্তু বৈঠক ইন্দিরা-বিরোধী প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠল। শাহ কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে ইন্দিরাজির ও তাঁর তথাকথিত ‘ককাস’-এর সমালোচনা করলেন অনেকে। জরুরি অবস্থার বাড়াবাড়ি নিয়ে শাহ কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে শীর্ষ স্তরের বহু নেতা ও তাঁদের পছন্দের বক্তারা ইন্দিরা গান্ধীর সমালোচনায় ফেটে পড়লেন। বর্ষীয়ান নেতা শরণ সিং ইন্দিরাজির তুলনা করলেন বুরবোঁ সম্রাটের সঙ্গে, যিনি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে অপারগ। আমাদের অনেককে বলতে দেওয়া হলো না। আমি তিনবার স্লিপ পাঠিয়েও বলার জন্য ডাক পেলাম না। বসন্ত শাঠে বলার সুযোগ পেয়ে দারুণ আক্রমণাত্মক বিবৃতি দিয়ে বললেন, গতকালের চাটুকারের ভোল বদলে আজ বিপ্লবী হয়ে উঠেছে। তবে বৈঠকে ইন্দিরার কোনো সমর্থক ছিলেন না, এমন নয়। ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে বলতে উঠে সি সুব্রহ্মণ্যম এআইসিসি-র সদস্যদের তোপের মুখে পড়লেন। ১ অক্টোবর শাহ কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি ইন্দিরার বিরুদ্ধে জরুরি অবস্থার সব দায় চাপিয়েছিলেন। চিত্কার-চেঁচামেচি, আর স্লোগানে সভা ভেঙে যাবার উপক্রম। আমার মনে হলো, বৈঠকের বিষয়বস্তু কী তা মাননীয় বক্তারা পড়ে দেখেননি অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইন্দিরা-বিরোধিতার জন্যই তাঁরা মঞ্চটিকে ব্যবহার করছেন। সন্ধ্যাবেলা বৈঠকে এসে কোনোরকম প্ররোচনায় পা না দিয়ে ইন্দিরাজি কংগ্রেস কর্মীদের কর্তব্য নিয়ে তাঁর মতামত ব্যক্ত করলেন।

হতাশ, ব্যথিত, ক্ষুব্ধ আমরা ঠিক করলাম, এভাবে চলতে পারে না। ইন্দিরাকে ধ্বংস করতে উদ্যত নেতাদের বাদ দিয়ে আমাদের চলতে হবে। আনতুলের বাড়িতে ভগবত্ ঝা আজাদ, বসন্ত শাঠে, বিপি মৌর্য, এপি শর্মা, বুটা সিং, কল্পনাথ রাই ও কয়েকজন নেতার সঙ্গে নিয়মিত বসতে লাগলাম। অচলাবস্থা কাটানো নিয়ে আমাদের কৌশলের কথা আমরা ইন্দিরা গান্ধী ও কমলাপতি ত্রিপাঠীকে যথাপূর্ব জানিয়ে আসতাম। স্থির হলো দেশজুড়ে তৃণমূল স্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলা হবে। ইন্দিরা গান্ধীর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করতে হবে। কমলাপতিজি ও ইন্দিরাজির অনুমতি নিয়ে আমরা গোটা দেশের সমমনোভাবাপন্ন নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা আরম্ভ করলাম। এনডি তিওয়ারি, মহসিনা কিদোয়াই, রাজেন্দ্রকুমারী বাজপাই, বীরেন্দ্র ভার্মা, ভগবত্ ঝা আজাদ (উত্তরপ্রদেশ), প্রতিভা সিং (বিহার), জেবি পট্টনায়েক ও রামচন্দ্র রথ (ওড়িশা), জগন্নাথ পাহাড়িয়া, নওল কিশোর শর্মা, ও জিএল ব্যাস (রাজস্থান), এইচকেএল ভগত্ (দিল্লি), জৈল সিং ও দরবারা সিং (পাঞ্জাব), রামলাল (হিমাচল), বসন্ত শাঠে ও সরোজ খাপার্দে (মহারাষ্ট্র), শ্রীমতী এম চন্দ্রশেখর, মুপানর (তামিলনাড়ু), নরসিংহ রাও, বেঙ্কটস্বামী (অন্ধপ্রদেশ), আনোয়ারা তৈমুর (আসাম), অশোক ভট্টাচার্য (ত্রিপুরা), সোলাঙ্কি ও মাকোয়ান (গুজরাট) এবং কর্নাটকের পুরো রাজ্যশাখা আমাদের সঙ্গে এল। পশ্চিমবঙ্গে বরকত, সোমেন, নুরুল, সাত্তার, আনন্দ, গোবিন্দের কথা আগেই বলেছি। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিই, আমরা এআইসিসি বৈঠক ডাকার রিকুইজিশন নোটিস নিয়ে প্রথম শক্তিপরীক্ষা করব। সদস্যদের স্বাক্ষর সংগ্রহও শুরু হলো।

কলকাতায় প্রেস কনফারেন্স ডেকে আমি জানালাম, বাংলার ৫১ জন এআইসিসি সদস্যের মধ্যে ১৮ জনের স্বাক্ষর আমরা পেয়েছি। এরা হলেন গনিখান, সাত্তার, আবদুল গফুর, অজিত পাঁজা, দৌলত আলি, শান্তিমোহন রায়, আনন্দ বিশ্বাস, গোবিন্দ নস্কর, সুনীল মণ্ডল, সুভাস দত্তরায়, রাজকুমার মিশ্র, অজিত ব্যানার্জি, তুহিন সামন্ত, একেএম ইশাক, ফজলে হক, গৌতম চক্রবর্তী ও প্রণব মুখার্জি। পরে অবশ্য তুহিন-সুনীল-অজিত এ রকম আরো কয়েকজন সরে দাঁড়ালেন।

মজার ব্যাপার, এ সময় জনতা পার্টির মহাসচিব মধু লিমায়ে কংগ্রেস সভাপতি ব্রহ্মানন্দ রেড্ডিকে চিঠি লিখে সাবধান করলেন যে ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা ‘চক্রান্ত’ করছেন তাঁকে সভাপতির পদ থেকে হটাতে। তিনি পরামর্শ দিলেন, কংগ্রেসের মঙ্গল হবে যদি ইন্দিরা ও তাঁর পারিষদদের নিগড় থেকে দল মুক্ত হয়।

এ চিঠি কংগ্রেস নেতৃত্বের কাছে চরম লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াল। দলের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে একজন বহিরাগতের নাক গলানোর ঔদ্ধত্য দেখে সাধারণ কংগ্রেস কর্মীরা খেপে উঠলেন।

বলতে দ্বিধা নেই যে, ইন্দিরা গান্ধীকে নিঃসঙ্গ করে দিতে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের তত্পরতার কোনো ত্রুটি ছিল না। ইন্দিরাজির বদান্যতায় রেড্ডি সভাপতি হলেও তাঁরা তাঁকে ইন্দিরা-বিরোধী করে তুললেন। বিধানসভা নির্বাচনে শ্রীমতী গান্ধীকে প্রার্থী মনোনয়ন, প্রচারে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হলো না। শাহ কমিশনের বিরুদ্ধে নেওয়া হলো না কার্যকরী পদক্ষেপ। এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে শ্রীমতী গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা না করেই জনতা পার্টি প্রার্থী নীলম সঞ্জীব রেড্ডিকে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সমর্থন করলেন ওয়াইবি চ্যবন ও ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি।

ইতোমধ্যে কর্নাটকে দলীয় সংকট দেখা দিল। প্রদেশ সভাপতি কেএইচ প্যাটেল ও মুখ্যমন্ত্রী দেবরাজ আরস-এর বিরোধ চরমে পৌঁছেছে। চ্যবন আর কমলাপতিকে মধ্যস্থতার দায়িত্ব দেওয়া হলো। ইন্দিরাজির কট্টর অনুগামী এফএম খান, গুন্ডা রাওরা আরসের সঙ্গে ছিলেন। আরস চ্যবনের সঙ্গে দেখা করতেও রাজি হলেন না। কেএইচ পাটিল বিক্ষুব্ধদের নিয়ে সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করলেন, মন্ত্রিসভা বাতিল হয়ে গেল।

আমরা দল ভাঙতে চাইনি। বুঝেছিলাম একমাত্র ইন্দিরাজির নেতৃত্বে দল আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারে। স্বাক্ষর সংগ্রহ যখন চলছে তখন একদিন গভীর রাতে ব্রহ্মানন্দের সঙ্গে দেখা করলেন ইন্দিরা। বললেন, জনতা পার্টি সরকার আমাদের নেতাদের গ্রেফতার করে হয়রানি করছে। দেশের প্রতিটি কোণ থেকে কংগ্রেস কর্মীদের অত্যাচারিত হওয়ার খবর আসছে। এ অবস্থায় কংগ্রেস চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। রেড্ডি ইন্দিরার পরামর্শ অনুযায়ী চলতে রাজি হলেন। দুর্বলচিত্তের মানুষ, পরে ফের ইন্দিরাবিরোধীদের চাপে পড়ে মত বদলালেন। প্রেসকে বললেন, প্রয়োজনে আমি পদত্যাগ করতে রাজি আছি, যদি ইন্দিরা চান।

নরসিংহ রাও, আনতুলে, ত্রিপাঠী, মৌর্য, বুটা সিং, এম চন্দ্রশেখর, আজাদ, বসন্ত শাঠে ও আমি সিন্ধান্ত নিলাম এভাবে চলতে পারে না। যদিও আমাদের গোষ্ঠীর অনেকে এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। এর বাস্তব কারণ এই দলে ভাঙন এলে পুরো দলটাই ভেঙে পড়বে। গঠনশীল নেতারা ভাবলেন সবচেয়ে ভালো হয় শ্রীমতী গান্ধীকে নেতৃত্বে রেখে যদি দলের দখল নেওয়া যায়। কিন্তু তা হবার ছিল না। ইন্দিরা ঘনিষ্ঠদের অধিকাংশ তাঁকে ত্যাগ করেছেন। আমন্ত্রিত সদস্য-সহ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির ২১ জনের মধ্যে ইন্দিরার সমর্থক মাত্র পাঁচ জন। এআইসিসি বৈঠকে রিকুইজিশন নোটিস পাঠিয়ে ফায়দার সম্ভাবনা ছিল না। সিদ্ধান্ত বদলাতেই হলো।

(চলবে)








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com