Sunday, 19 November, 2017, 3:13 AM
Home বিশ্ব
স্মৃতির ইন্দিরা
প্রতিশোধের তামাশা—গ্রেফতার প্রিয়দর্শিনী
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 08.05.2017 2:01:09 PM, Count : 17

 আমি আর বরকত তখন ইন্দিরাপন্থীদের একত্রিত করছি। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় আর সুব্রত মুখোপাধ্যায় ইন্দিরা-বিরোধী শিবিরে চলে যাওয়ায় আমাদের অসুবিধা হয়ে গেল। ৮ জুলাই নিজাম প্যালেসে বৈঠক ডাকলাম। হাজির হলেন বরকত গনিখান, আবদুল সাত্তার, নুরুল ইসলাম, আনন্দমোহন বিশ্বাস, গোবিন্দ নস্কর, সোমেন মিত্র, বীরেন্দ্র মহান্তি আর দেবপ্রসাদ রায় (মিঠু)। আমরা সাত্তারকে প্রার্থী করব, মনস্থির করলাম। জেলায় জেলায় গিয়ে পিসিসি সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, ঠিক হলো। কেননা ইন্দিরা-বিরোধী গোষ্ঠী আমাদের রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

প্রচণ্ড রোদে, ঝড়জলে সোমেনের জিপে জেলায় জেলায় ঘুরেছি। তখনই দেখেছি সোমেনের পরিশ্রম ক্ষমতা, সোমেনের আত্মত্যাগ। দিনের পর দিন জিপ চালিয়েছে, গাড়িতেই ঘুমিয়েছে। সোমেনও বুঝতে পেরেছিল ইন্দিরা-বিরোধীরা আমাদের শেষ করে দিতে চাইছে। ইন্দিরা গান্ধী নিজে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় দুটি আসন চেয়েছিলেন, কেউ কর্ণপাত করেনি। কাজেই আমরা অনুভব করলাম শক্তি প্রদর্শন ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।

১২ আগস্ট, ১৯৭৭ ছিল প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচনের দিন। মধ্য কলকাতার লাহাবাড়িতে নির্বাচন হলো। এআইসিসি’র সাধারণ সম্পাদক কেসি পন্থ পর্যবেক্ষক হয়ে এলেন। সোমেন আমহার্স্টস্ট্রিটে বিশাল ব্যানার টাঙিয়েছিল, নো ইন্দিরা নো কংগ্রেস। লাহাবাড়িতে সে স্লোগানও তুলল—নো ইন্দিরা নো কংগ্রেস, মাইনাস ইন্দিরা নো কংগ্রেস। নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর সোমেনই ভারতে প্রথম এই স্লোগান তুলল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না, আমাদের পরিশ্রম পণ্ড। পূরবী মুখোপাধ্যায়ের কাছে ১০ ভোটে হেরে গেলেন সাত্তার।

রাতে নিজমা প্যালেসে আমার ঘরে এলেন বরকত ও অন্যরা। সবাই বিষণ্ন, বিধ্বস্ত। আমি ওদের বললাম, এর চেয়েও অনেক খারাপ দিন আসছে। সামনে দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ। মনোবল হারালে চলবে না। আমাদের চোয়াল শক্ত করে কাজ করে যেতে হবে। রেডিয়োয় খবর শুনলাম, আরকে ধাওয়ান, যশপাল কাপুরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ডেভিড কপারফিল্ডের মিকায়ারের বিখ্যাত সংলাপটি মনে পড়ল, দ্য ডাই ইজ কাস্ট অ্যান্ড অল ইজ ওভার। ভয় পাবার বা আতঙ্কিত হবার সময় ছিল না সেটা। জানতাম, সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে।

প্রতিশোধের তামাশা, গ্রেফতার প্রিয়দর্শিনী

১৯৭৭ সালের ৩ অক্টোবর। ১২ উইলিংডন ক্রিসেন্টের বাসভবন থেকে ইন্দিরাজিকে গ্রেফতার করল সিবিআই। ইউএনআই-এর এক প্রতিনিধি আমাকে টেলিফোন করে ঘটনাটা জানালেন। ইন্দিরার সঙ্গে গ্রেফতার দলের ৪ প্রাক্তন মন্ত্রী—কেসি মালব্য, এইচআর গোখেল, পিসি শেঠি ও দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। ওই প্রতিনিধি বললেন আমাকেও গ্রেফতার করা হতে পারে। বাড়িতে তখন আমি একা। ঠিক করলাম, গ্রেফতার করলে জামিনের আবেদন করব না। আমার স্ত্রী গীতা সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। একজন পারিবারিক বন্ধুকে সিনেমা হল থেকে গীতাকে নিয়ে আসতে বললাম। পাইপ, তামাক, দেশলাই আর ছোটো একটা সুইকেস গুছিয়ে লনে অপেক্ষা করতে থাকলাম। দেবপ্রসাদ ও বীরেন আমার বাড়িতে ছিল, তাদের বললাম, কলকাতায় যোগাযোগ করে বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশের আয়োজন করো, বরকতের সঙ্গে কথা বলো।

গীতা প্রায় ছুটতে ছুটতে চলে এল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কিন্তু পুলিশ এল না। রাত এগারোটার সময় বললাম, পুলিশের জন্য অপেক্ষা করার মানে হয় না। তার চেয়ে ১২ উইলিংডন ক্রিসেন্টে গিয়ে দেখা যাক সেখানে ঠিক কী ঘটেছে। বাড়িতে পুলিশের জন্য একটা চিরকুটও রেখে গেলাম, আমরা কোথায় যাচ্ছি সেটা জানিয়ে। ইন্দিরাজির বাড়িতে অনেককে দেখলাম, কিন্তু রাজীব-সঞ্জয় সেখানে নেই। কিছুক্ষণ পরে সঞ্জয় ফিরে এল, আমাকে দেখে সে অবাক। শুনেছিল আমিও আটক হয়েছি। আমি ওর কাছে শুনলাম কীভাবে ইন্দিরাজিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা পরের দিনের করণীয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম। ৪ অক্টোবর ভোরবেলা ফের ইন্দিরাজির বাড়িতে গেলাম। পুলিশ গোটা বাড়িটা ঘিরে রেখেছে। আমাকে ঢুকতেই দিচ্ছিল না। অনেক তদবির করে ঢোকার অনুমতি পেলাম। তারপর আমার গাড়িতেই আমি আর বসন্ত শাঠে গেলাম পুলিশ লাইনে। ওখানে শুনলাম ইন্দিরাজিকে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। গেলাম কোর্টে। পথে চোখে পড়ল ইন্দিরার পক্ষে ও বিপক্ষে বিক্ষোভ ও জমায়েত। জনতা কর্মীরা স্লোগান দিচ্ছে ইন্দিরাকে ফাঁসিতে ঝোলান হোক। সঙ্গে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ স্লোগান। ইন্দিরাপন্থিরা প্রতিবাদ করল। জনাকীর্ণ কোর্টরুমে ঢুকতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হলো। ইন্দিরাজির কাঁধে শান্তিনিকেতনি ঝোলা। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী ব্যাপার। তুমি এখানে? কিছুক্ষণ পরে বিচারক আর দয়াল রায় দিলেন। যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গেই ‘মুক্তি’ পেলেন ইন্দিরাজি। আমরা ফিরে এলাম ১২ উইলিংডন ক্রিসেন্টে। ওখানে বেশ ভিড়। সেবাদলের স্বেচ্ছাসেবীরাও মিষ্টি বিতরণ করছে। কমলাপতিজি, ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি এসে গেলেন। দেশ-বিদেশের সাংবাদিকরাও উপস্থিত। বিদেশি সাংবাদিকরা ইন্দিরাজির সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন। ইন্দিরাজি তাঁদের অনুরোধ রাখলেন। সামনের চত্বরে একটা মাইক্রোফোন বসান হলো। ইন্দিরাজি মই বেয়ে মঞ্চে উঠে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। ততক্ষণে ভিড় আরো বেড়েছে। ‘টু ফেসেস অফ ইন্দিরা গান্ধী’ বইয়ের লেখক, সাংবাদিক উমা বাসুদেবকে কিছু লোক তাড়া করে। পূরবী মুখোপাধ্যায় এলেও কেউ তাঁকে পাত্তাই দিল না। কংগ্রেস তীব্রভাবে ইন্দিরা গান্ধীর গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানাল। ঘটনার খবর শুনেই ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি ছুটে আসেন ইন্দিরার বাসভবনে। শহরের বাইরে থেকে দিল্লিতে ফিরে ওয়াইবি চ্যবন সাংবাদিক সম্মেলনে ইন্দিরার গ্রেফতারিকে জনতা পার্টির প্রতিহিংসাপরায়ণতা বলে নিন্দা করলেন। সে রাতেই সিডব্লুসি-র (৩ অক্টোবর) জরুরি মিটিং ডেকে ইন্দিরা ও অন্য চারজনের গ্রেফতারিকে নিন্দা করে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

আমাদের বিস্মিত করে ইন্দিরাজি বললেন, এখনই গুজরাট যাবেন। ওখানে এক আদিবাসী সমাবেশে তাঁকে যাওয়ার জন্য সংগঠকরা অনুরোধ করেছিলেন। ২৪ ঘণ্টায় শারীরিক ও মানসিক শ্রম ভদ্রমহিলাকে একটুও ক্লান্ত করেনি। তাঁর মুখে চিরাচরিত প্রশান্ত হাসি। আমরা বিমানবন্দরে তাঁকে তুলে দিয়ে এলাম। পরদিন, ৪ অক্টোবর, আবার কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভা বসল। জেনারেল সেক্রেটারি কেসি পন্থ জানালেন, সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন কংগ্রেস কর্মীরা। আর তাদের ভাগ্যে জুটছে পুলিশ ও জনতা পার্টি কর্মীদের আক্রমণ। গ্রেফতার করা হয়েছে অনেক কর্মীকে। বৈঠকে দেশজুড়ে সংঘবদ্ধ বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করার প্রস্তাব দেওয়া হলো। অন্য বিরোধী দলের কেউই ইন্দিরাজির গ্রেফতারের বিরুদ্ধে কিছু বললেন না। একমাত্র বর্ষীয়ান কমিউনিষ্ট নেতা এসএ ডাঙ্গে জনতা পার্টির প্রতিহিংসামূলক মনোভাবের সমালোচনা করেন এবং ইন্দিরার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভূমিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

ইন্দিরাজির গ্রেফতারের ঘটনা ছিল নাটকীয়তায় ভরা। পুলিশ আসে বেলা তিনটে নাগাদ, তাদের কাছে কিন্তু ওয়ারেন্ট নেই। পরে তারা ওয়ারেন্ট নিয়ে এল। ইতোমধ্যে উর্দি পরা ও সাদা পোশাকের পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলে। একমাত্র মানেকার ফোন লাইন কাটা হয়নি। তিনিই ফোন করে কয়েকজনকে খবর দেন। বহু কংগ্রেস নেতা ও কর্মী জড়ো হয়ে যান। আইনজীবীদের সঙ্গে এমনিতেই ইন্দিরাজির অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল, কাজেই তাঁরা সঙ্গে ছিলেন। সিবিআই অফিসার এনকে সিং-এর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন আইনজীবীরা। ইন্দিরা ছোট্ট প্রেস বিবৃতিতে তাঁর গ্রেফতারকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বললেন। তারপর সন্ধেবেলা তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো। সঞ্জয় সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও রাজীবের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। রাজীব বলেছিলেন, জনতা সরকার মা-র বিরুদ্ধে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ আনতে পারবে না। পার্টির জন্য জিপ জোগাড় করা জাতীয় তুচ্ছ অভিযোগে হয়রানি করবে।

আইনজীবীরা, রাজীব-সোনিয়া সঞ্জয়-মানেকা আর একদল সমর্থক ইন্দিরাজির সঙ্গে গেলেন। ঠিক হলো নির্মলা দেশপান্ডে ইন্দিরাজির সঙ্গে পুলিশ হেফাজতে যাবেন। পুলিশ ওঁকে হরিয়ানায় বাদখাল লেক গেস্ট হাউসে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু ফরিদাবাদে সেক্টর-২-তে একটা লেভেল ক্রসিং-এর সামনে কনভয়ের পথরোধ হলো। এই সুযোগে আইনজীবীরা সিবিআই আধিকারিকদের বোঝালেন, দিল্লির পরিসীমার বাইরে কোনো বন্দীকে নিয়ে যাওয়া আইনবিরুদ্ধ। এই সময় ইন্দিরাজি গাড়ি থেকে নেমে একটা কালভার্টের ওপর গিয়ে বসে পড়েন। পরে অবশ্য পুলিশ অফিসাররা আইনজীবীদের যুক্তি মেনে তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যান।

কয়েকজন সাংবাদিক গোটা কনভয়টাকে ফলো করছিলেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন প্যাট্রিয়ট-এর প্রতিনিধি। তিনি ওই সময় ইন্দিরাজির ইন্টারভিউ নিলেন। পরদিন দিল্লির বেশ কিছু কাগজে পথপার্শ্বের এই নাটক আর ইন্টারভিউ ফলাও করে ছাপা হয়।

প্যাট্রিয়ট-এ লেখা হয়: পুলিশ হেফাজতে যাওয়ার পথে শ্রীমতী গান্ধী জানালেন জনতা সরকারের পতন আসন্ন। যে সরকার (রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের) ভয় পায়, তারা দেশ চালাতে পারে না।

প্রশ্ন: সিবিআই অফিসারেরা আপনার কাছে কখন, কেন এসেছিলেন?

উত্তর: বেলা তিনটে নাগাদ। কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। আমি ওঁদের একটু অপেক্ষা করতে বলি।

প্রশ্ন: গত ক’মাসে আপনাকে কী ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে?

উত্তর: লোকজনের সঙ্গে আমাকে দেখা করতে দিচ্ছে না। চিঠিপত্রও সব পাচ্ছি না... কিছুদিন ধরে ওরা সবরকম চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে আমার স্নায়ুবিক বিপর্যয় ঘটে। তবে ওরা ব্যর্থ হবে। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, আমার স্নায়ু বরাবরই কঠিন।

প্রশ্ন: এখন আপনার কেমন লাগছে?

উত্তর: চমত্কার। কোনো অসুবিধে নেই।

প্রশ্ন: আপনাকে গ্রেফতার করা হলো। অভিযোগটা কি?

উত্তর: (বিরক্তিসহকারে): মনে হয়, জিপ-টিপ নিয়ে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ।

প্যাট্রিয়ট: ৪ অক্টোবর, ১৯৭৭)

(চলবে)










« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com