Sunday, 19 November, 2017, 3:15 AM
Home বিশ্ব
স্মৃতির ইন্দিরা
বাংলায় অন্ধকারের সূচনা
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 08.05.2017 2:01:48 PM, Count : 15

 ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে
 প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর চতুর্থ কিস্তি

ভোটের ফল বেরোলে দেখা গেল, অন্য সব রাজ্যে ভোট বাড়লেও পশ্চিমবঙ্গে কমেছে। বরকত রেকর্ড ভোটে (৪২০০০) জিতলেও অন্য নেতাদের অবস্থা শোচনীয়। ভোট হ্রাস নিয়ে প্রিয়রঞ্জন বললেন, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-বিরোধী ভোট জনতা ও কংগ্রেস দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে। জনতা ও সিপিএমের মধ্যে নির্বাচনী আঁতাত থাকলে কংগ্রেস আরো ভালো ফল করত।

জনতা ও কংগ্রেসের ৫৬ শতাংশ, বামপন্থিরা ৪৪ শতাংশ; কিন্তু জনতা-বামপন্থি আঁতাত হলে কী করে কংগ্রেস ভালো ফল করত কে জানে? লোকসভা নির্বাচনের ফল তো দেখা গেছে। জনতা যে ভোট পেয়েছিল সেটা কংগ্রেস-বিরোধী ভোটই। আসলে ভোটযুদ্ধের আগেই তো আমরা হেরে বসেছিলাম। অন্তর্দলীয় বিরোধ তখন তুঙ্গে উঠেছে। যুব কংগ্রেস থেকেই জাতীয় স্তরে ভাঙনের প্রথম চিহ্ন দেখা গেল। আমার ১১ অশোক রোডের বাড়িতে দেবকান্ত বরুয়া প্রিয়রঞ্জনকে পদত্যাগ করতে বলেছিলেন। সঞ্জয় যুব কংগ্রেস দখল করতে চাইছিল, তাকে সন্তুষ্ট করতেই প্রিয়কে সরিয়েছিলেন বরুয়া। আবার সঞ্চয়ের সুদিন ফুরিয়ে যেতে তিনিই প্রিয়কে ফের ডেকে এনে ওই পদে বসালেন। যুব কংগ্রেসের সব কমিটি ভেঙে দেওয়া হলো। ততদিনে ইন্দিরা ১২ উইলিংডন ক্রিসেন্টের বাড়িতে চলে গেছেন। আমি রোজ তার কাছে যেতাম। ইন্দিরা-সঞ্জয়ের সঙ্গে আলোচনা হতো। ‘কিসসা কুর্সিং কা’ মামলাসহ বেশ কিছু ফৌজদারি মামলা তখন সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে। সে অবশ্য আগাম জামিন নিয়েছিল। সঞ্জয় খুব ব্যস্ত থাকত তদন্তকারী দল ও কর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে। আমি মানেকার সঙ্গে ভবিষ্যত্ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতাম। সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করা হয় যুব ফোরাম গঠন করা প্রয়োজন। বিঠলভাই প্যাটেল হাউসে আমি সভা ডাকলাম। রামচন্দ্র রথ, তারিক আনোয়ার, গোলাম নবি আজাদ, ললিত মাকেনরা উপস্থিত ছিলেন। রথকে আহ্বায়ক করে গঠিত হলো যুব ফোরাম। সারা দেশে অসংখ্য যুব কংগ্রেসি ফোরামে যোগ দিলেন। সব রাজ্যে এর শাখা গড়ে উঠল। সোমেন ছিল পশ্চিমবঙ্গে যুব ফোরামের দায়িত্বে।

কয়েক মাসের স্বেচ্ছা নির্বাচন ভেঙে ইন্দিরাজি তখন আবার বেরোতে শুরু করেছেন। পাউনারে দেখা করলেন বিনোবাজির সঙ্গে, বিনোবাজি ওকে আশীর্বাদ করে বললেন, ‘চলতে রহো’। হরিদ্বার, কানপুর, মোরাদাবাদ, বেলচি যেখানেই গেছেন সেখানেই বাঁধভাঙা ভিড়। বোঝা গেল লোক টানার ক্ষমতা তাঁর আগের মতোই অপ্রতিহত। আমরা সবাই বুঝতে পারলাম, একমাত্র তাঁর নেতৃত্বেই দল সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। দলে তাঁর ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার গ্রাউন্ডওয়ার্ক শুরু হলো। কিন্তু জনতা পার্টি কংগ্রেসের একাংশ ও সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতায় তাঁর প্রতি কুত্সা ও মিথ্যা প্রচার নিরন্তর চালিয়ে যাচ্ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষে জরুরি অবস্থার সময় সরকারের ক্ষমতা অপব্যবহার নিয়ে তদন্তের জন্য জনতা পার্টি গঠন করল শাহ কমিশন। শাহ কমিশন কুত্সাকে নিয়ে গেল চরম সীমায়—সঙ্গে চলতে থাকল সংবাদমাধ্যমের গুজব ও গালগল্প।

বিপি মৌর্য, খুরশিদ আলম খান, ভগবত্ ঝা আজাদ, সরোজ খাপার্দে, মার্গারেট আলভা, প্রতিভা সিং, ভেঙ্কটস্বামী, শঙ্করানন্দ প্রমুখ নেতাদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখতাম। রাজ্যসভায় কল্পনাথ রাই, লোকসভায় বসন্ত শাঠে শ্রীমতী গান্ধীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে লাগলেন। যুব ফোরাম গঠন করে উচ্ছ্বসিত সাড়া মিলল, সংগঠনের নেতারা প্রায় অসাধ্যসাধন করতে থাকলেন। পরে এরাই যুব কংগ্রেসের নেতা হয়ে ওঠেন।

বেলচিতে হরিজনদের পাশে

নালন্দা জেলার অপরিচিত গ্রাম বেলচি তখন খবরের শিরোনামে। কুর্মি জোতদারদের আক্রমণে ১১ হরিজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিল বেলচিতে। মৃতদেহগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অসহায় প্রান্তিক মানুষগুলোর পাশে কেউ দাঁড়ায়নি। সেখানে ইন্দিরা যাবেন। ১৩ আগস্ট ১৯৭৭। ভোরবেলা যাত্রা শুরু। বিমান ছাড়ল ৬টা ৫০ মিনিটে। ইন্দিরাজি বাইরে তাকিয়ে রইলেন। উইনডো গ্লাস ভেদ করে, সাদা মেঘপুঞ্জ চিরে, অনেক নিচে যে শস্যশ্যামলা উত্তরপ্রদেশ, সেদিকে তাকিয়ে কী ভাবছিলেন তিনি? এয়ার হোস্টেস মৃদু ও কোমল স্বরে জানতে চাইলেন, স্ন্যাকস বা সফট ড্রিংকস দেব কি? ইন্দিরা মাথা নাড়লেন। ভীস্ম নারায়ণ সিং উঠে গিয়ে একটি চকচকে আপেল অফার করলেন, ইন্দিরা বললেন, না। লক্ষেৗ বিমান বন্দরে বিপুল জনতা ঘিরে ধরল তাঁদের নেত্রীকে।

ওখান থেকে পাটনা। একটানা বৃষ্টি সত্ত্বেও পাটনায় প্রচণ্ড ভিড়। কংগ্রেস কর্মীরা তো ছিলেনই, কিছু লোক কৌতূহলী হয়ে পরাজিত ইন্দিরাকে দেখতে এল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকলেন সেবাদলের স্বেচ্ছাসেবীরা। রাজ্য কংগ্রেস নেতারা ছুটে এলেন মালা নিয়ে। একদম শেষে নামলেন তিনি। জয়প্রকাশের হোমল্যান্ডে ওই অভ্যর্থনা তাঁর আশাতীত। শ্রীমতী গান্ধীর দীর্ঘ কনভয় চলতে শুরু করল বেলচির পথে। পথপার্শ্বে অসংখ্য মানুষ এসে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। কোথাও কোথাও বাজছে ফিল্মি গান। একটি মোড়ে শোনা গেল—‘যো শহিদ হুয়ে হ্যায় উনকি জারা ইয়াদ করো কুরবানি’—লতাজির কণ্ঠে।

মোটর মিছিল গিয়ে থামল বিহার শরিফের ইন্সপেকশন বাংলোয়। একটু ফ্রেশ হলেন শ্রীমতী গান্ধী। কংগ্রেস নেতারা বলতে লাগলেন, ইন্দিরাজির বেলচি যাওয়া অসম্ভব। রাস্তা বেহাল, কর্দমাক্ত। গাড়ি চলবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্থানীয় লোকরা তাঁকে দেখার জন্য ভিড় করল।

বাচ্চা ছেলেরা গাছে চড়তে লাগল। বিহার কংগ্রেসের নবনিযুক্ত প্রধান কেদার পান্ডে বক্তৃতা দিলেন। সমবেত জনতার চাপে ইন্দিরাও সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। তারপর মধাহ্নভোজ। জনৈক কংগ্রেস নেতা এক রিপোর্টারকে বললেন, আপনাদের দারুণ লাঞ্চ খাওয়াব। কয়েকশো মুরগি রান্না করা হয়েছে। শ্রীমতী গান্ধী দৃঢ়স্বরে বলে উঠলেন, নো লাঞ্চ। এখনই আমরা বেরিয়ে পড়ব। কেদার পান্ডে ইতস্তত করে বললেন, রাস্তা খুব খারাপ, গাড়ি যাবে না। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ইন্দিরা বললেন, হেঁটে যাব, প্রয়োজনে সারা রাত হাঁটব।

গাড়ির মিছিল আরও কিছুক্ষণ চলল। পথে পড়ল হজরত শেখ সরফুদ্দিনের স্মৃতিসৌধ। ইন্দিরাজি চোখ বন্ধ করে সেখানে প্রার্থনা করলেন। এরপর বেলচির কর্দমাক্ত রাস্তায় জিপ আটকে গেল কাদায়। খেত থেকে ট্রাক্টর নিয়ে জিপ টেনে তোলার চেষ্টা হলো। ট্রাক্টরও কাদায় আটকা পড়ল। একজন ক্যামেরাম্যান বললেন, ব্যস্, বেলচি ট্রিপের এখানেই সমাপ্তি। শ্রীমতী গান্ধী ততক্ষণে জিপ থেকে নেমে পড়েছেন। একজন কংগ্রেস নেতা তাঁকে জানালেন, বুক জল ভেঙে যেতে হবে, অসম্ভব। ইন্দিরাজি গোড়ালির ওপর শাড়ি গুটিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। প্রতিভা সিংয়ের শুষ্ক, উদ্বিগ্ন মুখ দেখে ইন্দিরা বললেন, বুক জল ভেঙে যাওয়া খুব একটা অসম্ভব নয়, আমরা পারব।

পথ তখন প্রতি পদক্ষেপে আরও খারাপ হচ্ছে। হাঁটু পর্যন্ত জলকাদায় ডুবে গেছে। অঞ্চলের জনৈক সহূদয় বাবুসাহেব তখন ইন্দিরাজির জন্য একটি হাতি পাঠিয়ে দিলেন। কেদার পান্ডে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন, কিন্তু আপনি হাতিতে চড়বেন কী করে? অসহিষ্ণু ইন্দিরাজির উত্তর: আমি খুব পারব। হাতিতে আমি এই প্রথম চড়ছি না। পরমুহূর্তেই অনায়াসে হাতির পিঠে চড়ে বসলেন। প্রতিভা সিং তখন ইস্টনাম জপ করতে করতে ইন্দিরাজিকে পেছন থেকে আঁকড়ে আছেন। একজন চিত্কার করে উঠল, লং লিভ ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরাজি তার দিকে তাকিয়ে স্মিত ভুবনমোহিনী হাসি ছড়িয়ে দিলেন।

হাতির পিঠে চেপে বেলচি পৌঁছাতে পাক্কা সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগল। প্রচণ্ড পথশ্রম আর প্রতিরোধ ইন্দিরাজির প্রতিজ্ঞাকে ভাঙতে পারল না। প্রতিরোধকেই তিনি ভেঙে দিলেন। কেউ কি কল্পনা করতে পারে, ওয়াইবি চ্যবন বা ব্রহ্মানন্দ রেড্ডি কাদা ভেঙে, হাতিতে চেপে হরিজন গ্রামে যাচ্ছেন? ফেরার পরে নিশুতি রাতে ইন্দিরাজি পথপার্শ্বের একটি কলেজে ভাষণ দিলেন। পরদিন সকালে দেখা করলেন জয়প্রকাশ নারায়ণের সঙ্গে। ইন্দিরাজিকে তরতাজা দেখাচ্ছিল। ৫০ মিনিট জেপি-র সঙ্গে কথা বলে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। বৃদ্ধ জননেতা তাঁকে এগিয়ে দিয়ে গেলেন। আবেগাপ্লুত ভাষায় আশীর্বাদ করলেন, তোমার সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যত্, যা তোমার অতীতের চেয়েও উজ্জ্বলতর।

বাংলায় অন্ধকারের সূচনা

বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর পশ্চিমবঙ্গে দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব চরম আকার নিল। নির্বাচনের সময় আমি সবপক্ষকে নিয়ে চলার চেষ্টা শুরু করি। ম্যানিফেস্টো তৈরি ও তহবিল সংগ্রহে নেমে পড়ি একক উদ্যোগে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সহযোগের জন্য বার বার আলোচনায় বসি দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, অরুণ মৈত্র, ডা. গোপাল দাস নাগ, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, প্রফুল্লকান্তি ঘোষ ও সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সঙ্গে। ডা. নাগ ও অরুণ মৈত্র ছাড়া কেউ আমার উদ্যোগকে পাত্তাই দেননি। এরই মধ্যে এসে পড়ল প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতির নির্বাচন। বিধানসভা নির্বাচনে ব্যর্থতার দায় নিয়ে ইতোমধ্যেই অরুণ মৈত্র পদত্যাগ করেছেন সভাপতির পদ থেকে। অরুণবাবুর অবশ্য কিছু করার ছিল না, ব্যর্থতার আসল কারণ ছিল দলের গোষ্ঠী কোন্দল। তাঁর পদত্যাগের পর রউফ আনসারি অন্তর্বর্তী সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব সব রেকর্ড ভেঙে দিল।

(চলবে)









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com