Sunday, 19 November, 2017, 3:12 AM
Home বিশ্ব
মৃতির ইন্দিরা
ঘুরে দাঁড়াবার দিনগুলি
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 08.05.2017 2:02:21 PM, Count : 18

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে
 প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর তৃতীয় কিস্তি

সিদ্ধার্থ রায় তখন দারুণ ক্ষমতাশীল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা রদবদলেও তাঁর মতামতের মূল্য ছিল।

১৯৭৪-এর জুনে তিনি আমাকে বলেছিলেন—পরের রদবদলে মন্ত্রিসভায় তোমার পদোন্নতি ঘটবে। আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রদবদলের কথাও জানিয়েছিলেন।

আমি সেসব ডায়েরিতে টুকে রাখি। ১০ অক্টোবর যখন রদবদল হল, মিলিয়ে দেখলাম তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে এত সব বলা সম্ভব নয়। এ থেকে বোঝা যাবে, সিদ্ধার্থবাবুর ক্ষমতা কতদূর ছিল, কত গোপন খবরাখবর তাঁর কাছে থাকত। পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপারে তাঁর মতামতকে চূড়ান্ত বলে ভাবা হতো। তিনিই পরে জরুরি অবস্থার তথাকথিত বাড়াবাড়ি নিয়ে ইন্দিরাজির প্রতি অভিযোগের তর্জনী তুলে ধরলেন। কেন? আসলে ১৯৭৫ সালে ইন্দিরাজি এলাহাবাদ মামলায় হেরে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধার্থের দুঃসময় শুরু হয়। সঞ্জয়ের মনে তখনই সন্দেহ দানা বাঁধে যে, মামলাটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গেও তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা তখন তুঙ্গে উঠল। প্রশাসক হিসেবে তাঁর ব্যর্থতায় কংগ্রেসকর্মীরা ক্ষুব্ধ। রাজ্যকে অবহেলা করে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠবৃত্তে থাকাই তাঁর অভিপ্রায়, এরকম অভিযোগও উঠতে থাকে। একজন কেন্দ্রীয় নেতা মজা করে একদিন বললেন, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালীন সিদ্ধার্থবাবু পশ্চিমবঙ্গের সংগঠন দেখাশুনা করতেন, এখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে সারা ভারতের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিয়েছেন।

১৯৭৬ সালে তখন সঞ্জয় আস্তে আস্তে নিজস্ব ক্ষমতাচক্র গড়ে তুলছে, তখন অনেকেই সিদ্ধার্থকে সরাতে তত্পর হয়ে উঠলেন। উদ্যোগটা প্রথম নিয়েছিলেন কমলনাথ। বরকত, শত ঘোষ, সোমেন, নুরুলও সোচ্চার হয়ে উঠলেন। কেন্দ্রে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় তত্পর হলেন। আমি ওই মুহূর্তে সিদ্ধার্থবাবুকে সরানোর পক্ষপাতী ছিলাম না। কিন্তু যেভাবেই হোক সিদ্ধার্থ-বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে আমার নামও জড়িয়ে গেল। কিছুদিনের মধ্যে রাজ্য কংগ্রেসে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চরমে উঠল। কিন্তু তাঁর বিরোধীরা কিছুতেই বিকল্প নেতা নির্বাচনের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলেন না। ততদিনে রি-গ্রুপিং শুরু হয়ে গেছে। সৌগত সিদ্ধার্থের পক্ষে ছিল প্রিয়রঞ্জন, পরে দেবীপ্রসাদ, শত ঘোষ, অরুণ মৈত্র, লক্ষ্মীকান্তও তাঁদের শিবিরে যোগ দিলেন। সিদ্ধার্থের বিরুদ্ধে বরকতের সঙ্গে আনন্দ, গোবিন্দ, নুরুল, সোমেন তো ছিলই, সুব্রত, বারিদও শরিক হল। কিন্তু যাই হোক, ইন্দিরাজি বুঝতে পারলেন, বিকল্প নেতা নিয়ে ঐকমত্য নেই, তাছাড়া মন্ত্রিসভার মেয়াদও শেষ হয়ে আসছে। তাই সিদ্ধার্থবাবু নেতা থেকে গেলেন। কিন্তু ততদিনে তিনিই ইন্দিরাজির ওপর তাঁর প্রভাব হারিয়েছেন। কিছুতেই সেটা মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই ইন্দিরাজি ক্ষমতাচ্যুত হওয়া মাত্র সিদ্ধার্থবাবু আঘাত করলেন।

এটা স্বীকার করতেই হবে শাহ কমিশনে সিদ্ধার্থের সাক্ষ্য অবশ্য ইন্দিরাজির অন্য সহকর্মীদের তুলনায় সত্যের কাছাকাছি ছিল, শাহ কমিশনের রেকর্ড থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরছি—‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় জানিয়েছেন, ২৫ জুন সকালে তিনি ডাক পেয়ে ইন্দিরাগান্ধীর বাড়ি যান। ইন্দিরা তাঁকে কয়েকটি রিপোর্ট পড়ে শোনালেন। উত্তর ভারতে ক্রমবর্ধমান হিংসা, হানাহানি, আইনশৃঙ্খলার অবনতিই রিপোর্টগুলির বিষয়। এর আগে ইন্দিরা তাঁকে কয়েকবার বলেছেন, ভারতবর্ষ এক অদ্ভুত জ্বরে আক্রান্ত, ঘা সারাতে একটা শক ট্রিটমেন্ট জরুরি। তিনি ইন্দিরাকে বোঝালেন সাংবিধানিক ক্ষমতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব, এ জন্য নতুন আইন প্রণয়ন বা সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই। দুজনে যখন কথা বলছেন, তখন একজন বেয়ারা এসে একটি রিপোর্ট দিয়ে যায়। ওই রিপোর্টে সে দিন দিল্লিতে আয়োজিত জনসভায় জয়প্রকাশ নারায়ণ যা বলতে যাচ্ছেন তার সারমর্ম লিখিত। রিপোর্টে বলা হলো, তিনি পাল্টা প্রশাসন, পাল্টা আদালত গঠনের ডাক দেবেন। ছাত্রদের বলবেন কলেজ ইউনিভার্সিটি বয়কট করতে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাছে আবেদন জানালেন কোনো সরকারি নির্দেশ না মানতে। কেননা ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় অনুসারে ইন্দিরা গান্ধীর আর ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। ইন্দিরাজি ওই রিপোর্ট পড়ে বললেন, এ অবস্থায় কী করা যায়, আইনের বইপত্র ঘেঁটে তিনি তা দেখবেন। এই বলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে বেরিয়ে গেলেন। বিকেল সাড়ে চারটে কি পাঁচটা নাগাদ ফিরে এসে ইন্দিরাকে জানালেন, সংবিধানের ৩৫২ ধারা প্রয়োগ করে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা জারি করার ব্যাপারটা ভেবে দেখা যেতে পারে। সঙ্গে-সঙ্গেই ইন্দিরা তাকে বললেন, তার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কাছে যেতে হবে। রাষ্ট্রপতির কাছে তখনই অ্যাপায়েন্টমেন্ট চাওয়া হলো এবং সিদ্ধার্থবাবুকে সঙ্গে নিয়ে ইন্দিরা রাষ্ট্রপতির কাছে ছুটে গেলেন। তাঁর কাছে ইন্দিরা দেশের ঘনীভূত সংকটের কথা ব্যাখ্যা করলেন, ৩৫২ ধারা অনুসারে জরুরি অবস্থা জারি করার আর্জি জানালেন। রাষ্ট্রপতি সিদ্ধার্থবাবুর কাছে জানতে চাইলেন, সংবিধানের ওই ধারায় ঠিক কী বলা হয়েছে। সিদ্ধার্থবাবু তা বিশ্লেষণ করলেন। রাষ্ট্রপতি ইন্দিরার কাছে সরকারি সুপারিশ দাবি করলেন। সিদ্ধার্থবাবুর বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে গাড়িতে ফেরার পথে তিনি ইন্দিরাকে পরামর্শ দেন, এই গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করার আগে কংগ্রেস সভাপতি দেবকান্ত বরুয়াসহ শীর্ষনেতাদের সঙ্গে একবার আলোচনা করে নেওয়া উচিত। শ্রীমতী গান্ধী তাঁকে জানান, তিনি এখনই রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করতে চান। সিদ্ধার্থবাবু বললেন, বিজনেস রুলস অনুযায়ী তিনভাবে কাজটা করা যেতে পারে। এক. মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ। দুই. মন্ত্রিসভার বৈঠক না ডেকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিন. প্রধানমন্ত্রী সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে জরুরি অবস্থা জারির সুপারিশ করতে পারেন, পরে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। সিদ্ধার্থবাবু তৃতীয় পন্থা বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিলেন এবং সে অনুসারে রাষ্ট্রপতির কাছে ইন্দিরাজির সুপারিশের খসড়া তৈরি করলেন। তবে শ্রীমতী গান্ধী রাষ্ট্রপতিকে যে চিঠিটি দিয়েছিলেন, সেটি সিদ্ধার্থের খসড়া নয় বলে অস্বীকার করে সিদ্ধার্থ জানিয়েছেন, সে দিন সন্ধ্যায় দেবকান্ত বরুয়াকেও ডাকা হয়। বেতারে ইন্দিরা যে ভাষণ দেবেন, তার বক্তব্য নিয়ে বরুয়ার পরামর্শও চাওয়া হয়।

ঘুরে দাঁড়াবার দিনগুলি

এবার ৯ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন এসে গেল। ইন্দিরাজিকে প্রচারে ডাকা হলো না। কিছু কিছু বর্ষীয়ান নেতা বলতে লাগলেন, এখন দশ-বারোজন লোকও ওর কথা শুনতে জড়ো হবে না। সঞ্জয়ের সঙ্গে ন্যূনতম সম্পর্ক আছে, এমন কাউকে টিকিটও দেওয়া হয়নি। ফল প্রকাশিত হলে দেখা গেল, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া সব রাজ্যে লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় কংগ্রেসের ফল সামান্য হলেও ভালো হয়েছে।

এরপর সাতাত্তর সালের ২৩-২৪ জুন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে আমি আমন্ত্রিত হলাম। রামসুভগ সিং ওই বৈঠকে গায়ত্রী দেবীকে আটক করার ব্যাপারে আমাকে আক্রমণ করলেন। তাকে সমর্থন করলেন অনেকেই। আমি কারণ ব্যাখ্যা করলাম, কিন্তু তিনি কিছু বুঝতে রাজি ছিলেন না। আগে যারা সঞ্জয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন এখন তাদের অনেককেই দেখলাম সমালোচনা করতে। এদের চোখে সঞ্জয় ছিল হিরো, এখন এরাই তাকে ভিলেন বানাতে আগ্রহী।

সংসদের জুন অধিবেশনে আমি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়লাম। এসবিআই-এর চেয়ারম্যান নিয়োগ, গায়ত্রী দেবীর আটকাদেশ, বিভিন্ন শিল্প সংস্থাকে ব্যাংকের অর্থ সাহায্য, স্বেচ্ছা ঘোষণা প্রকল্প (কালো টাকা)— বহু বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ চলতে থাকল। মন্ত্রীদের দপ্তরে জরুরি ফাইলপত্র ছিল, তারা সেসব দেখে অভিযোগের যথার্থ উত্তর দিতে পারতেন; কিন্তু দিলেন না। ওরা আমার রাজনৈতিক বিরোধী, ওদের কাছ থেকে এই সততা আশাও করিনি। লোকসভায় জ্যোতির্ময় বসু (সিপিএম) কতই না অভিযোগ আনলেন, আমার দলীয় সতীর্থরাও তার জবাব দিতে এগিয়ে এলেন না। বুঝে গেলাম, আমরা কয়েকজন কোনো রকম প্রোটেকশন পাব না। সরকারের কাছ থেকে তো নয়ই, কংগ্রেস সদস্যরাও মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন। রাজ্যসভায় আমি নিজে অভিযোগের উত্তর দেবার চেষ্টা করেছি; কিন্তু তাতে তেমন কিছু হয়নি।

রাজ্যসভায় বা লবিতে কেউই প্রায় আমার সঙ্গে কথা বলত না; কিন্তু আমাদের দলের তিনজন—এ আর আনতুলে, সরোজ খাপার্দে, প্রতিভা সিং এবং সিপিআই-এর দুই রাজ্যসভা সদস্য—আমার ব্যক্তিগত বন্ধু, ভূপেশ গুপ্ত আর কল্যাণ রায় যোগাযোগ রাখতেন। দেখা হলেই কথা বলতেন। এরা দেখেছেন, লবিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি একাকী পাইপ মুখে বসে থাকছি আর মৃদু মৃদু ধোঁয়া ছাড়ছি—এটা প্রায় প্রতিদিনের দৃশ্য।

বিধানসভা নির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের ব্যাপারে ইন্দিরাজির কোনো কথা শোনা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের প্রার্থীদের ব্যাপারে তার নির্দেশে কেসি পন্থের সঙ্গে অনেকবার দেখা করেছি; কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। শ্রীমতী গান্ধীর পরামর্শে তারপর আমি আর বরকত গেলাম চ্যবন সাহেবের কাছে। বললাম, একটি গোষ্ঠী আধিপত্য কায়েম করে রেখেছে। উনি বললেন, দেখুন প্রিয় ওয়ার্কিং কমিটিতে এসেছে বিপুল ভোটে জিতে, আর আপনি হেরে গেছেন। আমি বললাম, প্রিয়র যোগ্যতা বা নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না; কিন্তু ওর পক্ষপাতিত্বমূলক আচরণের কথা বলছি। চ্যবন শুনতে রাজি হলেন না। ভোটের ফল বেরোলে দেখা গেল, অন্য সব রাজ্যে ভোট বাড়লেও পশ্চিমবঙ্গে কমেছে। বরকত রেকর্ড ভোটে (৪২০০০) জিতলেও অন্য নেতাদের অবস্থা শোচনীয়। ভোট হ্রাস নিয়ে প্রিয়রঞ্জন বললেন, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-বিরোধী ভোট জনতা ও কংগ্রেস দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গেছে। জনতা ও সিপিএমের মধ্যে নির্বাচনী আঁতাত থাকলে কংগ্রেস আরো ভালো ফল করত।

জনতা ও কংগ্রেসের ৫৬ শতাংশ, বামপন্থিরা ৪৪ শতাংশ; কিন্তু জনতা-বামপন্থি আঁতাত হলে কী করে কংগ্রেস ভালো ফল করত কে জানে? (চলবে)








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com