Sunday, 19 November, 2017, 3:15 AM
Home বিশ্ব
স্মৃতির ইন্দিরা
নাটকীয় মধ্যরাতের নেপথ্যে
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 08.05.2017 2:02:49 PM, Count : 14

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেসনেত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা দৈনিক ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। আজ প্রকাশিত হলো এর দ্বিতীয় কিস্তি

দে বকান্ত বরুয়ার সঙ্গে ওয়ার্কিং কমিটিও পদত্যাগ করলে স্মরণ সিং অন্তর্বর্তী দলপ্রধান হিসেবে কাজ চালাতে লাগলেন। সিদ্ধান্ত হলো, এআইসিসি-র অধিবেশন ডেকে সভাপতি নির্বাচন করা হবে। এছাড়াও নির্বাচন হবে ওয়ার্কিং কমিটির ১০ জন এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ৭ সদস্যের। দেবকান্ত বরুয়া ততদিনে বিদ্রোহীর ভূমিকায় অবতীর্ণ। সঙ্গে সিদ্ধার্থ, প্রিয়, অ্যান্টনিরা।

প্রিয়রঞ্জন প্রচণ্ড পরিশ্রমী, দক্ষ সংগঠক। ১৯৭১-এ পশ্চিমবঙ্গে ও-ই কংগ্রেসকে পুনরুজ্জীবিত করেছিল। ১৯৭৫ সালে প্রিয়কে অন্যায়ভাবে যুব কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই অবিচার না করলেও কখনোই ইন্দিরা বিরোধী শিবিরে শামিল হতো না। সিদ্ধার্থবাবুর বিষয়টা একেবারেই উলটো, সামারসল্ট। যাইহোক, কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচন নিয়ে তখন দু’পক্ষের যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকল।

অনেক নাম উঠতে শুরু করেছে। শরণ সিং, সিদ্ধার্থ রায়, করণ সিং, ওয়াইবি চ্যবন, মীরকাশিম, পিভি নরসিংহ রাও, সি সুব্রহ্মণ্যম প্রমুখ। বরুয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ভেঙে দেওয়ার জন্য আমরাও তত্পর। আমি, এপি শর্মা, সিএম স্টিফেন, গুন্ডু রাও, বসন্ত শাঠে এরকম কয়েকজন দলবদ্ধভাবে কাজ করছি। কমলাপতিজি ও ইন্দিরাজির কাছ থেকে নির্দেশ-পরামর্শ নিচ্ছি। শ্রীমতি গান্ধী ব্রহ্মানন্দ রেড্ডির নামে সম্মতি জানালেন। লোকসভার তত্কালীন সাংসদ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রক পরিচালনায় রেড্ডির দক্ষতা, অভিজ্ঞতা প্রশ্নহীন। লোকসভায় তখন কংগ্রেসের ১৫১ সাংসদের প্রায় ১০০ জন দক্ষিণ ভারত থেকে নির্বাচিত, এ কারণে দক্ষিণ ভারতীয় নেতাকেই প্রধানে পদে নিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত বলে ভাবা হলো। চ্যাবন, কমলাপতি, মীরকাশিম, সুব্রহ্মণ্যাম প্রমুখ শীর্ষ নেতাসহ দলের সবাই রেড্ডির ব্যাপারে একমত। কিন্তু বলুয়া-চন্দ্রজিত্-সিদ্ধার্থ-প্রিয় অ্যান্টনির নিও র্যাডিকাল গোষ্ঠী এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধী। তারা সিদ্ধার্থ রায়কে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করালেন। ড. করণ সিং এতদিন একজন সর্বসম্মত প্রার্থী খুঁজে ঐক্যের প্রয়াস চালাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সবাইকে বিস্মিত করে তিনিও হয়ে গেলেন অন্যতম প্রার্থী। চতুর্থজন নেকরাম শর্মা। দেবরাজ আরসও দাঁড়িয়ে ছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। ফলাফল প্রকাশ হতে দেখা গেল রেড্ডি সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের চেয়ে ১৫৭ ভোট বেশি পেয়েছেন। অন্য দুইজনের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা যথাক্রমে ১৬ এবং ৩।

ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচনে চ্যাবন বা শ্রীমতি গান্ধী হস্তক্ষেপ করতে চাননি। কমলাপতিজিও চাইলেন না অনুগামীদের কোনো নির্দেশ দিতে। আমার মতো প্রার্থীরা মুশকিলে পড়লাম। ইন্দিরা অনুগামী গোষ্ঠীর মধ্যে আমি আর জৈল সিং বিশ্রীভাবে হারলাম। অন্য ক্যাম্পের দাপুটে নেত্রী পূরবী মুখোপাধ্যায়ও হেরে গেলেন। পরে আমাকে ইন্দিরাজি বলেছিলেন, সাংগঠনিক নির্বাচনকে তখন এত হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হয়নি। তার কথাই সত্য হলো, পরে আমাদের বিস্তর অসুবিধে হয়েছে। সিডব্লুসি’র দশ নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে ইন্দিরা অনুগামী ছিলেন মাত্র তিনজন—নরসিংহ রাও, এপি শর্মা, শ্রীমতি এম চন্দ্রশেখর। অন্য সদস্যরা হলেন শংকরদয়াল শর্মা, ভিপি নায়েক, কেসি পন্থ, প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, চন্দ্রজিত্ যাদব, সিএম স্টিফেন, মহম্মদ আলি। আর কংগ্রেস সভাপতির মনোনীত দশ ওয়ার্কিং কমিটি সদস্যের মধ্যে আমাদের চারজন। ইন্দিরা স্বয়ং কমলাপতিজি, সৈয়দ মীরকাশিম, বুটা সিং। ১৯৭৮-এর মার্চে অন্ধ্র, কর্নাটক, মহারাষ্ট্রের নির্বাচনের পর শংকরদয়াল শর্মা আর বীরেন্দ্র ভার্মাও যোগ দিলেন এ শিবিরে।

দিল্লিতে ক্ষমতা হারানোর পরে কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোর ভবিষ্যত্ ঘোর অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। কয়েকজন মুখ্যমন্ত্রী গদি বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় সিদ্ধার্থ রায় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে টেলিগ্রাম করলেন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে। সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী কাজী লেনডুপ দোরজি কংগ্রেসের রাজ্যশাখাসহ সদলবলে যোগ দিলেন জনতা পার্টিতে। এই নিয়ে খবরের কাগজে শোরগোল উঠল। ইমার্জেন্সির বাড়াবাড়িতে সিদ্ধার্থ বাবু দুঃখ প্রকাশ করেছেন, এ রকম খবরও ছাপা হলো। ৬ এপ্রিল ১৯৭৭ এই নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠল বিধানসভায়। সিদ্ধার্থ বাবু অভিযোগ খণ্ডন করলেন, বিধানসভায় পড়ে শোনালেন টেলিগ্রামের ভাষা। তাতে লেখা ছিল, আপনি পশ্চিমবঙ্গবাসী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার অভিনন্দন গ্রহণ করুন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, সমস্ত গঠনমূলক কাজে আমার সরকার কেন্দ্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। আগের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের যে সম্পর্ক ছিল, আগামী দিনেও তার পরিবর্তন ঘটবে না এ ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ।

এমনিতে শুনলে খটকা লাগার কোনো কারণ নেই, সাধারণ সৌজন্যবোধের নমুনা বলেই মনে হবে। কিন্তু প্রেস ব্যাপারটাকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল, আপাত সরল ওই কয়েকটি লাইনের মধ্যে অনেক অলিখিত ইঙ্গিত বুঝতে পারল।

নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চরণ সিং, লোকসভা ভোটে বিপর্যস্ত কংগ্রেস শাসিত ৯ রাজ্যে বার্তা পাঠালেন। রাজ্যগুলো হলো উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, বিহার, রাজস্থান, পাঞ্জাব, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ, ওড়িশা। বার্তায় রাজ্য সরকারগুলোকে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। সঙ্গে এ আশ্বাসও দেওয়া হলো, বিধানসভা ভেঙে দিলে ভোট হওয়া পর্যন্ত তদারকি সরকার হিসেবে তাদেরই রাখা হবে। চরণ সিং-এর ফাঁদে অবশ্য কংগ্রেস পা দেয়নি। জনতা পার্টির দাবি ছিল যেহেতু ওইসব রাজ্যে লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়েছে, অতএব তাদের আর ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। হাস্যকর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এ সব অচল। তামিলনাড়ু, অন্ধ্র, কর্ণাটক ও কেরলে জনতা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। তার মানে কি এই যে, ওইসব রাজ্য থেকে জনতার নির্বাচিত স্বল্প কয়েকজন এমপির সংসদে বসার বা মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার অধিকার নেই? চরণ সিং-এর আবেদনে কর্ণপাত না করার নির্দেশ দেওয়া হলো কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রীদের। শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে ওই ৯ রাজ্যে বিধানসভা ভেঙে দিল কেন্দ্র। উপরাষ্ট্রপতি বিডি জাত্তি তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। তিনি প্রথমে ৯ বিধানসভা বাতিলের নির্দেশে সই করতে চাননি। জনতা পার্টি তাঁকে ঘেরাও করার হুমকি দিয়ে চাপ সৃষ্টি করে। নিরুপায় জাত্তি সই করে দিলেন। ক্ষমতায় আসার অল্প কিছুদিনের মধ্যে গণতন্ত্রপ্রেমী জনতা সরকার দারুণ গণতান্ত্রিক নজির সৃষ্টি করলেন।

শুরু হলো ৯ রাজ্যে ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতি। ইন্দিরাজি তখন কোণঠাসা। সর্বত্র ইন্দিরাকে মুছে ফেলার তোড়জোড় চলছে। আমাদের কাছে সে এক বিচিত্র পরিস্থিতি, শত্রু তখন ঘরে-বাইরে। রেড্ডিকে চ্যবন বললেন, আপনি সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এটা আপনার কাছে নির্বাচনী জয়, আমাদের কাছে গণতন্ত্রের জয়। সিদ্ধার্থবাবু এক ধাপ এগিয়ে বললেন, যারা দলকে ভ্রান্ত পথে নিয়ে গেছে, ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

এতদিন এ ভদ্রলোকরা কী করেছিলেন? চ্যবন তো ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে কংগ্রেস হাইকমান্ডের সদস্য। ১৯৬৯ সালে দল ভাঙার পর থেকে সিদ্ধার্থ রায় ইন্দিরাজির ঘনিষ্ঠ বৃত্তের অন্তর্গত, একান্ত উপদেষ্টাও। এদের আচমকা ভোলবদল দেখে সাধারণ কর্মীরাও ব্যথিত হলেন। ইন্দিরাজি ক্ষমতায় থাকাকালীন এঁরাই ছিলেন তাঁর ইয়েসম্যান। যে মুহূর্তে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলেন, সঙ্গে সঙ্গেই সৌজন্যবোধের তোয়াক্কা না করে ইন্দিরা-নিন্দায় সোচ্চার হয়ে উঠলেন। এখানে আমাকে একটু পিছিয়ে যেতে হচ্ছে।

জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় কী ঘটেছিল তা প্রত্যেকের জানা প্রয়োজন। ২৫ জুন, ১৯৭৫ মধ্যরাত্রে জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়। আমি তখন কলকাতায়, ২৬ জুন রাজ্যসভা নির্বাচনে আমিও প্রার্থী। ২৬ জুন সকালে আমি শ্রীমতী গান্ধীর টেলিফোন পেলাম। তিনি বললেন, দ্রুত দিল্লি চলে এসে আমার সঙ্গে দেখা করো। সাড়ে ৯টা নাগাদ আমি বিধানসভায় গেলাম। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হলো, তিনিও বললেন দিল্লি যাওয়ার ডাক পেয়েছেন। তখন বিধানসভায় যে যা খুশি আষাঢ়ে গল্প শোনাচ্ছে। একজন বললেন, ইন্দিরা সংবিধান বাতিল করে সেনাবাহিনীর সাহায্যে সম্পূর্ণ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নিয়েছেন। আমি হেসে বললাম, সংবিধানই যদি না থাকে, তো আপনারা ভোট দিতে এলেন কীভাবে এবং কেন? সিদ্ধার্থবাবু ১১টা নাগাদ এলেন, আমাকে আর দেবীবাবুকে তাঁর চেম্বারে ডাকলেন। তাঁর কাছেই শুনলাম, দিল্লিতে ঠিক কী ঘটেছে। পরে ইন্দিরাজির কাছেও শুনেছি জরুরি অবস্থা ঘোষণার পেছনে সিদ্ধার্থবাবুর ভূমিকা কী ছিল। ইন্দিরাজি জানতেনই না অভ্যন্তরীণ গোলযোগের প্রেক্ষিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা সম্ভব। সংবিধানের এই পরিচ্ছেদটি সিদ্ধার্থই ইন্দিরাকে প্রথম দেখিয়েছিলেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ইন্দিরা স্পষ্টত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। সিদ্ধার্ন্ত রায় তখন দারুণ ক্ষমতাশীল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা রদবদলেও তাঁর মতামতের মূল্য ছিল।

১৯৭৪-এর জুনে তিনি আমাকে বলেছিলেন—পরের রদবদলে মন্ত্রিসভায় তোমার পদোন্নতি ঘটবে। আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রদবদলের কথাও জানিয়েছিলেন।

আমি সেসব ডায়েরিতে টুকে রাখি। ১০ অক্টোবর যখন রদবদল হল, মিলিয়ে দেখলাম তাঁর কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে এত সব বলা সম্ভব নয়।

(চলবে)










« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com