Sunday, 19 November, 2017, 3:12 AM
Home বিশ্ব
স্মৃতির ইন্দিরা
বললেন মাঠে নামো এই তো সময়
প্র ণ ব মু খো পা ধ্যা য়
Published : Monday, 8 May, 2017 at 12:00 AM, Update: 08.05.2017 2:03:24 PM, Count : 11

 ২০ মার্চ, ১৯৭৭। সন্ধ্যার মধ্যে লোকসভা নির্বাচনের সব ফল বেরিয়ে গেল। কংগ্রেস পর্যুদস্ত। পরাজিত স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী। রাতভর জেগে থাকল ভারত, ইন্দিরাও বিনিদ্র। থমথম করছে ১ নম্বর সফদরজং রোড। রাত ৯টায় নিস্তব্ধ বাসভবনে প্রবেশ করলেন পুপুল জয়কার, সোজা চলে গেলেন বসার ঘরে, প্রিয় বান্ধবীকে দেখেই নড়েচড়ে বসলেন বিষাদ-প্রতিমা—ম্লান হেসে বললেন, পুপুল আমি হেরে গেছি।

পরাজয়ের ওই ধাক্কা সামলাতে কংগ্রেসের বেশ কিছুটা সময় লাগল। হেরে গিয়ে সবাই বিস্ময়বিমূঢ়। ২২ মার্চ ইন্দিরা-মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করল, ২৪ মার্চ শপথ নিলেন মোরারজি দেশাই। আস্তে আস্তে ফের শুরু হলো অন্তর্দলীয় রাজনৈতিক তত্পরতা। কংগ্রেস সভাপতি দেবকান্ত বরুয়ার পদত্যাগ দাবি করে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু হলো। ওয়ার্কিং কমিটির পদত্যাগও দাবি করল কেউ কেউ। সুযোগসন্ধানীরা বলতে লাগল, দলের পতনের জন্য ইন্দিরা-সঞ্জয়ই দায়ী। কারণ তাদের সংবিধান বহির্ভূতভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার।

একদিন ইন্দিরাজি আমাকে ডেকে পাঠালেন। বিস্তর আলোচনা শেষে জিজ্ঞেস করলাম, এবার কি মাঠে নামব আমরা? জানালেন, এই তো সময়, এখনই এপি শর্মা, সিএম স্টিফেন, বিপি মৌর্য, এআর আনতুলে প্রমুখ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করো। যোগাযোগ করলাম, কেননা পাল্টা শিবিরে তখন সক্রিয়তা বাড়ছে। দেবকান্ত বরুয়া রীতিমতো জোরজার করে ওয়াইবি চ্যবনকে কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত করিয়ে নিলেন। সিএম স্টিফেনকে করার একটি চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হলো। দেখা গেল দুর্দিনে ইন্দিরাজির পাশে দাঁড়ানোর সদিচ্ছা অনেকের নেই। এই দেবকান্তই বলেছিলেন, ‘ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া ইজ ইন্দিরা’। তিনিই প্রথম পাল্টা গোষ্ঠী গড়ার কাজে নামলেন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন জরুরি অবস্থার সময়ের ইন্দিরা-ঘনিষ্ঠ চ্যবন, শরণ সিং, চন্দ্রজিত্ যাদব, রজনী প্যাটেল, পূরবী মুখোপাধ্যায়, প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। আর সবাইকে বিস্মিত করে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় গড়ে তুললেন ইন্দিরা-বিরোধী এক শক্তিশালী গোষ্ঠী। সঞ্জয়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ওম মেহেতা, বংশীলাল, ভিসি শুক্লরা একদম বসে গেলেন।

শ্রীমতী গান্ধীর বৃত্তে সে মুহূর্তে শুধু সঞ্জয়, স্টিফেন, আনতুলে, এপি শর্মা, বসন্ত শাঠে আর আমি। নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরেই আবার প্রিয়রঞ্জনকে ফিরিয়ে আনা হলো সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি পদে, অম্বিকা সোনিকে সরিয়ে দিয়ে। দুবছর আগে প্রিয়কে সরিয়ে এ পদে এসেছিলেন সোনি। যাইহোক, ১২-১৫ এপ্রিল দিল্লিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক বসল, নির্বাচনী বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে এবং তত্কালীন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে। সিডব্লুসি-র সদস্য ও স্থায়ী আমন্ত্রিত সদস্য ছাড়াও সম্মেলনে আহ্বান করা হলো প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি, বিধানসভার দলীয় নেতা এবং আগের কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীকে। সঙ্গে ছিলেন এআইসিসি-র দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা। বৈঠকে শ্রীমতী গান্ধীকে দেখতে না পেয়ে শংকরদয়াল শর্মা, সীতারাম কেশরি, মীর কাশিম বললেন, এ কী কথা! বরুয়াজির উচিত এখনই ওঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে আসা। বরুয়া, কমলাপতি ত্রিপাঠী আর চ্যবন গেলেন ইন্দিরাজির কাছে। সঙ্গে করে নিয়ে এলেন তাঁকে। বৈঠক শুরু হলো ৪৫ মিনিট পর। বরুয়ার ছোট্ট ভাষণের পরই বলতে উঠলেন ইন্দিরাজি। তাঁর গলায় সেদিন স্বভাবজাত আবেগদীপ্ত তেজ দেখা গেল না। বললেন, পরাজয়ের সমস্ত দায়দায়িত্ব আমার, আমি তা মাথা পেতে নিচ্ছি। কংগ্রেসিদের এজন্য হতাশ, নিরুদ্যম হয়ে পড়া চলবে না। এখন সময় জোট বাঁধার, ঐক্যবদ্ধতার, শক্তি সংগ্রহের।

বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই ইন্দিরা গান্ধীর লেখা একটি চিঠির কপি সবাইকে বিলি করা হলো—যাতে তিনি লিখলেন, সরকারের প্রধান হিসেবে নিঃসংকোচে আমি এই পরাজয়ের দায় নিজের কাঁধে নিচ্ছি...।

বৈঠকে বিরাট হাঙ্গামার আশঙ্কা ছিল। তেমন কিছু হলো না অবশ্য। তবে তিনদিন জুড়ে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ইন্দিরাজি, সঞ্জয়, বংশীলাল, ভিসি শুক্লার প্রতি বহু শ্লেষাত্মক কটূক্তি বর্ষিত হতে থাকল। বরুয়া, অ্যান্টনি, প্রিয়, চন্দ্রজিত্ সিদ্ধার্থ প্রকাশ্যে ইন্দিরা-সঞ্জয়ের সমালোচনা করলেন। সংবিধানবহির্ভূত ক্ষমতা, ককাস, গ্যাং অব ফোর বা দুষ্ট চতুষ্টয়—এসব টার্ম শোনা গেল। জাতীয় স্তরে ইন্দিরা-সঞ্জয় ছিলেন এসব আক্রমণের মূল লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গ, আসামের নেতারা আক্রমণ করলেন আমাকেও। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, কালো টাকা ধরতে যেসব রেড আমি করিয়েছি, তাতে নাকি বড্ড বাড়াবাড়ি করা হয়েছে। জয়পুরের রাজমাতা গায়ত্রী দেবীকে আটক করাটাও ক্ষমতার অপব্যবহার, এও বলা হলো।

১৫ এপ্রিল বিকাল পাঁচটায় আবার সিডব্লুসি-র বৈঠক বসল। বৈঠকে শুধু সদস্যরাই হাজির, বিশেষ প্রতিনিধি বা অন্য কেউ নয়। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করলেন দেবকান্ত বরুয়া। সঙ্গে পুরো ওয়ার্কিং কমিটি। ইন্দিরাজি অবশ্য এ বৈঠকে আসেননি। সেদিনই বংশীলালের প্রাথমিক সদস্যপদ কেড়ে নেওয়া হলো, দল থেকে বহিষ্কার করা হলো ৬ বছরের জন্যে। সঞ্চয় তার কয়েকদিন আগেই দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। বরুয়া জানালেন, ও যখন দল ছেড়ে দিয়েছে, তখন ওকে আর শাস্তি দেওয়ার কোনো প্রশ্ন ওঠে না।

বংশীলালের শাস্তির সিদ্ধান্ত ছিল পূর্বনির্দিষ্ট, সিডব্লুসিতে অনুমোদন করানোর ব্যাপারটা শুধু নিয়মরক্ষা। বিচারকরা অপরাধীকে ফাঁসি দিতে এতই আগ্রহী ও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন যে, তাঁরা ভুলে গেলেন অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেওয়া হয়নি।

কংগ্রেসের ওই সিদ্ধান্তে জনতা সরকার কতটা উত্ফুল্ল হয়ে উঠেছিল, তা বোঝা গেল দুমাস পর। ভিওয়ানিতে হাতকড়া পরিয়ে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বংশীলালকে রাস্তায় প্যারেড করানো হলো। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে তুচ্ছ কারণে গ্রেপ্তার করা হলো ইন্দিরাজিকে, বেশকিছু পদস্থ অফিসারকেও। ভোটে হেরে যাওয়ার পরে অনেকেই গণতন্ত্রের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠতে চাইলেন। যাঁরা ক্ষমতায় থাকার সময় সঞ্জয়ের তথাকথিত ‘ককাস’ নিয়ে একটাও কথা বলার সাহস দেখাতে পারেননি, তাঁরাই এবার সোচ্চার হয়ে উঠলেন গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে। আমার প্রশ্ন, গণতন্ত্র যদি এই নেতাদের এত আদরের বস্তুই হবে, বংশীলালকে এভাবে তাড়ানোর সময় সে গণতন্ত্র গেল কোথায়? অদ্ভুত কাণ্ডটার মধ্যেই নিহিত ছিল দলে ভাঙনের বীজ, যা পরে অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল।

বিপর্যয়ের অনিবার্য পরিণাম

আমি গোড়া থেকে ইন্দিরাজির সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নেই। আমার বাবা বলতেন, বিপদে কারও পাশ থেকে সরে আসতে নেই। আমি কখনো সরিনি। খবরের কাগজে তখন ছাপা হচ্ছে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়, ওসবের পরোয়া করিনি। ছাপা হলো, আমার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও তখন আমার কোনো পাসপোর্ট ছিল না। বোম্বাইয়ের ব্লিটজ পত্রিকা লিখল, স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার টাকায় কোপেনহেগেনে নাকি আমার স্ত্রী বেড়াতে গেছেন। অথচ ডেনমার্কের রাজধানীতে তখনও আমাদের যাওয়া হয়নি। যে সময়ের এই অভিযোগ, তখন আমি ব্যাংকিং ও রাজস্ব মন্ত্রী ঠিকই, কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে আমার প্রথম বিদেশ সফর ১৯৮০-তে। ওই কাগজই ছাপল, স্টেট ব্যাংকের চেয়ারম্যান বরদাচারি নাকি টিনের বাক্সে মোট ৯ কোটি টাকা ভরতি করে ভোট কেনার জন্য নিজে নিয়ে গেলেন ইন্দিরাজির রায়বেরিলি, সঞ্জয়ের আমেথি আর আমার কেন্দ্র মালদায়। মালদায় সিপিএম-এর ছেলেরা টাকা ভরতি টিনের বাক্স নাকি ধরেও ফেলেছে! ভাবা যায়! কল্পনাকে কতদূর উসেক দিলে এসব লেখা যায়! সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক একবারও ভাবলেন না ৯ কোটি টাকা ভরতে কতগুলো টিনের বাক্স লাগবে, আর অত বাক্স মাত্র একজন লোকের পক্ষে বহন করা কী সম্ভব! হিসেব করে দেখলাম, ১০০ টাকার নোট হলেও অন্তত ৯০টা বাক্স লাগবে, প্রতি বাক্সে ১০ লাখ টাকা করে ধরলেও। কতবার যে আমি এইভাবে পত্র-পত্রিকার টার্গেট হয়েছি, অসত্য-প্রচারের শিকার হয়েছি।

৩১ ডিসেম্বর, ১৯৮৪। রাজীব গান্ধীর মন্ত্রিসভা থেকে আমি বাদ পড়ার পরেও এরকম হয়েছে। ১৯৮৫-র জানুয়ারিতে প্রথম সারির একটি ইংরেজি দৈনিকে ছাপা হলো আমি নাকি বাড়িতে অন্তরীণ। খবরটা দেখিওনি। যথারীতি সেদিন রাজ্যসভায় গেছি, সিপিএম-এর এক সদস্য সভায় খবরটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। এরকম কত যে কাল্পনিক অভিযোগ আছে রিলায়েন্স গোষ্ঠী, স্বরাজ পলের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে! পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ, আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ নেওয়া! একজন বিখ্যাত সাংবাদিক আর ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক লিখে দিলেন যে, আমি নাকি আইএমএফ-এর ঋণ গ্রহণের স্থপতি। আশ্চর্যের বিষয়, অর্থমন্ত্রী হওয়ার পরে ওই ভদ্রলোককেই আমি প্রথম সাক্ষাত্কার দিই। আইএমএফ-এর ঋণ নিয়ে বহু প্রশ্ন তিনি করেছিলেন। কাজেই, তার অজানা ছিল না, এই ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৮১ সালের নভেম্বরে আর আমি অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব গ্রহণ করি ১৯৮২-র জানুয়ারিতে। এসব দেখে বাইবেলের সেই বিখ্যাত প্রশ্নটি আমার মনে জাগে, ‘আমি কেন ঈশ্বর’? সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাঙ্গাত্মক উত্তরও পেয়ে যাই, ‘কেনই বা আমি নই’? পত্রিকাগুলো আমার কাঁধটাকে বোধহয় খুব শক্ত ভাবত। তাই আমিই তখন তাদের প্রিয় টার্গেট। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি এসব বিশ্বাস করল? মনে হয় না।

(চলবে)








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com