Sunday, 19 November, 2017, 3:27 AM
Home বিনোদন
একজন লাকীর আনলাকি ইনিংস
আফজাল হোসেন লিখেছেন প্রথমআলোয়
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 6:14 PM, Update: 08.05.2017 9:04:22 AM, Count : 55
আমাদের দুস্থ তৈরির কারখানায় উৎপাদিত আরেকটি উপযোগী পণ্য মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেল। ক্রিকেটের ভাষায়, একটা ভালো ইনিংসের দুর্ভাগ্যজনক পরিসমাপ্তি। চলে গেলেন সুরকার, শিল্পী লাকী আখান্দ্‌। চলে গেলেন প্রিয়জনদের কাঁদিয়ে, ভক্ত-অনুরাগীদের শোকসাগরে ভাসিয়ে দিয়ে।

হঠাৎ কাছের ও দূরের মানুষেরা বড়সড় একটা আঘাতে কেঁপে উঠেছে। প্রতিভাধর মানুষটা নেই। যার সুরারোপ করা গানে ছিল মুগ্ধতা। ছিল বিস্ময়, নতুনত্ব। ছিল, নেই। গৌরবের মাইলফলক শাঁই করে পেছনে চলে গেল। একটা রুচি, শিক্ষা, সৌন্দর্যের কাল, সৃজনশীলতার মান চলে গেল মেঘের আড়ালে। চিরকালের জন্য আড়ালে চলে যাওয়ার আগে বহুকাল তিনি অলক্ষ্যে অবহেলায় ছিলেন; তা আমাদের খুব বেশি ভাবায়নি। তাঁর অসুস্থতার কথা জানাজানি হলে আমরা উদ্বিগ্ন হয়েছি।

কেউ যখন বাঁচা-মরার টানাটানিতে থাকে, আমরা উদ্বিগ্ন হই। উৎকণ্ঠা জাগে। আমাদের সে রকমই অভ্যাস। শ্বাস নিতে পারা, ফেলতে পারাকে আমরা বলি বেঁচে থাকা। কীভাবে বেঁচে থাকতে পারলে তাকে বেঁচে থাকা বলে, অর্থবহ বেঁচে থাকা ও আয়ুক্ষয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? আজকাল অত ভারী ভাবনায় সময় নষ্ট করে না কেউ। এখনকার ধারণা, জীবন মানে ছলে-বলে-কৌশলে উন্নতি। জোর খাটিয়ে যারা নিজের চাওয়া, শুধু নিজের পাওনা বুঝে নিতে জানে, তাদেরই সময়ের উপযুক্ত বলে ভাবা হয়। তারা কেমন দামি, কতটা সম্মানীয়, তা ঠিক করে দেয় ক্ষমতা ও অর্থবিত্ত । সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না, তারা ভালো করেই জানে। আঙুল বাঁকাতে বাঁকাতে তাদের ধ্যানজ্ঞানও আর সোজা থাকে না।

উল্টো হয় সৃজনশীল মানুষেরা, স্বভাবে তারা ভোগী নয়। নেওয়ার বদলে দেওয়াতে তাদের আগ্রহ। কঠিন বাস্তবতা বুঝতে আগ্রহহীন বলে তাদের নিয়ে হাস্যকৌতুক কম হয় না। তবু শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নিজের আগ্রহ, ভালোবাসার পথেই
তারা নিবিষ্ট পথিক হয়ে হাঁটে, হেঁটে চলে যত দিন বাঁচে। সেই নিবিষ্ট থাকায় হয়তো অনেকের অর্থবহ জীবন মেলে, কিন্তু সাধারণত সেসব জীবন অর্থকরী হয়ে ওঠে না। অনেক দুর্ভোগ সয়ে শেষ পর্যন্ত এমন স্বভাবের মানুষদের দীনহীনের মতো মৃত্যুবরণ করতে হয়।

সব রকম মানুষে রঙিন এই দুনিয়া। এখানে ভাগ্যে বিশ্বাস করে অনেকে, অনেকে মনোযোগী কর্মে। কর্মই ভাগ্যোন্নয়ন ঘটিয়ে দেবে মনে করলেও উন্নয়ন ঘটে আবার ঘটেও না। মানুষ ভাগ্যগণনাকারীর কাছে যায়, কত কী সলা গ্রহণ করে। লাভ হয়, হয় না। জগৎ এ রকমই। আছে ও নেইয়ের। সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, আশা-নিরাশারও। মানুষ আশা করে ভালোর। সন্তান জন্ম নেয়, মাতা-পিতা নাম রাখে আকাশ, আলো, লাকি। সবই আসলে ইচ্ছার প্রকাশ। স্বপ্নরূপ। সত্য হয়, হয় না। আকাশ আকাশজয়ের মতো সাফল্য পেতে পারে আবার আলোর জীবনে হয়তো নামের সার্থকতা মেলেই না। লাকি মানে সৌভাগ্যবান। নাম পাওয়া মানে সৌভাগ্যপ্রাপ্তি নয়। সৌভাগ্য অর্জনে সাধ্য লাগে। সেই সাধ্য কারও কারও মধ্যে থাকে অপরিসীম। যে মানুষের চিন্তাচেতনা, ভাবনার পরিধি অসংখ্যের মতো নয়, সেই মানুষ বিশেষ। বিশেষভাবে স্বীকৃত যদি না হয়, তা দুর্ভাগ্যজনক।

লাকী আখান্দ্‌, সৌভাগ্যবানই ছিলেন। যে সময়টাতে তাঁর আবির্ভাব, তখন সব মানুষ প্রাণ খুলে সবকিছু করতে চায়। আত্মা দিয়ে সবই অনুভবের চেষ্টা করে। একটা দেশ, পতাকা পাওয়ার গৌরব প্রাণে প্রাণে। সবাই নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী সেরাটা নিবেদন করতে চেয়েছে। তখনকার ইচ্ছার মধ্যে সীমাহীন নিষ্ঠা, প্রবল সততা ছিল। স্বার্থপরতা তখন তিমি মাছের মতো বিরাটাকায় হয়ে ওঠেনি। সময় বদলায়। মানুষ বদলে যায়। যা যেমন ছিল, থাকল না তেমন, থাকেনি। কেন থাকেনি, নিজ নিজ স্বার্থ অনুযায়ী দায়িত্ববান পরিচয়ের মানুষের যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সব মন্দের কারণ সবার জানা, ব্যাখ্যাদানও অব্যাহত, তবু মন্দ থেমে থাকে না। আমরা দেখতে পাই, শুনি এই অন্যায় কর্ম অমুক বা তমুকেরা করেছে। বলা মানুষেরা রগ ফুলিয়ে বলে, সেই একই অন্যায় করে বুক ফুলিয়ে।

শিল্পীর মর্যাদা, গুণের কদর, মূল্য দেওয়ার কতটা সাধ্য আছে আমাদের? আমরা বলি, আছি ভালোর পক্ষে। ভালোকে মজবুত রাখার চেষ্টা চোখে পড়ে কম। অন্যের ভালোকে রক্ষার আগে নিজের ভালোটা বুঝে নিতে ভুল হয় না। আমরা ভালোকে বাজারে তুলে ঠিক করে নিই, কতটা ভালো। শিক্ষিত দাবি করি। সংস্কৃতিমান পরিচয়ে গর্ববোধ করি। হাতে শক্ত করে ধরা আদর্শের ধ্বজা। একই মানুষেরা লাভের লালসায় ভালো বাজারদরওয়ালার পায়ের নিচে মই এগিয়ে দিই—উঠুন আপনি। তার সব দুর্বলতা, অক্ষমতাকে না দেখার ভান করি। উপযুক্ততা না থাকলেও বিকোয় বলে তাকে বিক্রির চেষ্টায় নিজেদের লাভ, সে হিসেবে উন্নত মানের পণ্য প্রমাণের চেষ্টাও করা হয়। এমন চেষ্টা বা লাই দেওয়ার অভ্যাসে বহু গুণীর উপযুক্ত কদর মেলেনি, মেলে না।

নগদ পাওয়া মানুষেরা কড়ায়-গন্ডায় নিজের হিসাব বুঝে নিতে সর্বদা ব্যস্ত থাকে। হঠাৎ যদি বাতাসে খবর ছড়িয়ে
পড়ে, অমুকে খুবই অসুস্থ, অসুস্থতার কারণে সে মানুষ সহসা হয়ে ওঠে প্রধান। হঠাৎ তার প্রতি মনোযোগ ফেরে। অবহেলা পাওয়া মানুষ আদর পাওয়ার উপযুক্ত হয়ে যায়। মানুষটার বর্ণাঢ্য অতীত তুলে আনা হয়। গুরুত্ব বাড়িয়ে দিতে দুস্থতাও জুড়ে দেওয়া হয় নাম-পরিচয়ে। যে মানুষ নিজের প্রতিভাবলে বিশেষ, সে মানুষটা বা তেমন মানুষেরা দুস্থ বনে যায় নিজের দোষে নয়, অসংখ্যজনের সামাজিক দায়হীনতা, স্বার্থপরতায়। কোটি কোটি মানুষের মধ্যে যেসব মানুষ গুণপনায় বিশেষ, তাদের সেই বিশেষত্ব অটুট থাকে না। থাকতে দেওয়া হয় না। শিল্পমনস্কতার সঙ্গে অনৈতিকতা, শঠতায় সবার মধ্যে থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অর্থপূর্ণ জীবন আর অর্থে পূর্ণ জীবন এক নয়। অর্থপূর্ণ জীবনের চেয়ে অর্থে পূর্ণ জীবনের প্রতি আমাদের অধিক আগ্রহ। সেই আগ্রহ সীমা-পরিসীমা মেনে চলে না। তা সমষ্টির জন্য অনর্থ আমদানি করলেও ভ্রুক্ষেপ নেই। ‘কম্প্রোমাইজ একটা আর্টে’র খপ্পরে পড়েছে জীবন, সংস্কৃতিচর্চা। ছবি আঁকা, গান, লেখালেখি, সিনেমা, নাটক, নৃত্যকলা—সবই কোনো রকমে টিকে আছে। সগৌরবে টিকে নেই। সগৌরবে টিকে থাকার জন্য উপযুক্তের প্রতি সমীহ দরকার। উপযুক্ত পরিবেশ, মানুষ, ইচ্ছা, নিষ্ঠা দরকার। দরকার সংস্কৃতি ও সমষ্টির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। শিল্প, শিল্পীর প্রতি দয়ামায়া যতটা, শ্রদ্ধাবোধ ততখানি রয়েছে মনে হয় না। আমরা মহত্ত্বের প্রকাশ ঘটাতে চাই অনুরাগ প্রকাশ করে নয়, সাহায্যকারীর ভূমিকা গ্রহণ করে, সাহায্য দান করে।

একজন মানুষ নৌকা বেয়ে জীবন চালায়। ঝড়-জল-বন্যা তাকে অসহায় করে, কিন্তু মানুষটা আবারও তার জীবনসংগ্রাম ফিরে পায়। প্রকৃতির এই খেয়ালখুশি মেনে নেয় মানুষ। মানুষের খেয়ালখুশিতে যদি কোনো জীবনের গতি বাধাগ্রস্ত হয়, তা মেনে নেওয়ার মতো না হলেও সবলের দাপট মেনে নিতে হয়। মানুষই যদি মানুষকে উপায়হীন করার ভূমিকায় থাকে, দোষ ভাগ্যের ওপর চাপানো চলে না।

একজন কৃতীর মৃত্যুসংবাদে শোকগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু মানুষটা জগতে বেঁচে থেকেও যখন নেই হয়ে থাকে, আমাদের মনোযোগ মোটেও সেদিকে ফেরে না। প্রশ্ন জাগে না, কোথায় কেমন আছে মানুষটা? প্রশ্ন জাগে না, বিস্ময় সৃষ্টি করার যোগ্যতা থাকলেও মানুষটা সক্রিয় কেন নয়? সাধ্য, সামর্থ্যের যথেষ্ট প্রমাণ রেখেও গুণবান মানুষকে অস্তিত্বের সংকটে ভুগতে হয়। কর্মক্ষেত্রের ব্যাপ্তি দশ গুণ বেড়ে গেলেও দিনের পর দিন যোগ্যতর মানুষকে থাকতে হয় সুবিধাবঞ্চিত।

প্রতিটি জীবন একেকটি ইনিংস। কুশলী খেলোয়াড়ের চাই মাঠ, খেলা, প্রতিযোগিতা। মানুষের রোগগ্রস্ত মতিগতির কাছে সুস্থ ও কুশলীরা হেরে যায়। বসে থাকতে হয় মাঠের বাইরে, অতিরিক্তের আসনে। নিজ ঘরে পরবাসীর মতো। বেঁচে থাকলেও সেই হেরে যাওয়া মৃত্যুসম। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এভাবেই সুস্থতার ঘাড়ে উড়ে এসে জুড়ে বসে দুস্থতা।

মৃত্যুসংবাদ আমাদের শোকাভিভূত করেছে। শোক আত্মসমালোচনার ইচ্ছাও জাগ্রত করুক। নিজেদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজেরাই প্রশ্ন করি, কী আমাদের করণীয় ছিল? কী করে চলেছি আমরা? জীবনের প্রতি সম্মানবোধ অটুট রাখা ছিল দায়িত্ব। মানুষের সামর্থ্যকে মর্যাদা দেওয়া সভ্যতা। সেসবের চেয়ে মৃতকে আমরা অনেক বেশি সম্মানদানে আগ্রহী। কৃতী মানুষদের বেঁচে থাকাকালীন অবহেলা করলেও দাফন-কাফনের বেলায় আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে সমবেত হই। তা মৃত্যু উদ্‌যাপন হয়ে ওঠে। টের পাওয়া হয় না, জীবন উদ্‌যাপন আমাদের কর্তব্য ছিল। কর্তব্যে অবহেলা করে করে আর কতকাল কত লাকী ইনিংসকে আনলাকিতে পরিণত করব আমরা?

আফজাল হোসেন: লেখক, অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রশিল্পী।







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com