Wednesday, 22 November, 2017, 10:10 PM
Home স্বাস্থ্য
ফাঁদের নাম হাসপাতাল
মোস্তফা কামাল লিখেছেন কালেরকন্ঠে
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 6:09 PM, Update: 08.05.2017 9:05:12 AM, Count : 39
আবদুল আউয়ালের মাথা খারাপ অবস্থা। তিনি হাসপাতালের বারান্দায় ছোটাছুটি করছেন। আর বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। সামনে যাকে পাচ্ছেন তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কেউ তাঁর কথা শুনতে চাচ্ছে না। সবাই আছে রোগী নিয়ে টেনশনে। কে শোনে তাঁর কথা!

আমিও রোগী দেখার জন্য হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেই রোগীও অচেনা-অজানা এক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাঁর হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছিল। কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। শরীরের ব্যথায় অস্থির হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। টেনশন আমারও ছিল। রোগীর যদি কিছু হয়ে যায়। ডাক্তার সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার রোগী এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত। কোটিতে একজন লোক এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। রোগীর অবস্থা খারাপ। তাই তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হলো। ডাক্তার সাহেবরা যা বলেন তা-ই তো শুনতে হয়।

আইসিইউয়ের সামনে যখন অপেক্ষা করছিলাম তখন সেই লোক আবার এলেন। আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বলা শুরু করলেন। ভাই, আমার একটা কথা শোনেন। আমি বড় বিপদে পড়েছি। আমি খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছি স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে। তার মাথা ব্যথা। কিছুতেই সেই ব্যথা কমছে না। অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েছি। ডাক্তার-কবিরাজ বেটে খাওয়াইছি। কোনো কাজ হয় নাই। এই হাসপাতালের (নাম বলা নিষেধ!) এক প্রতিনিধি আমাকে বললেন, এখানে ২০ হাজার টাকার প্যাকেজ আছে। এটা নিলে আপনার আর কোনো খরচ করতে হবে না। আমি তাঁর কথায় রাজি হয়ে গেলাম। কারণ প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যে পরিমাণ খরচ! ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে যদি স্ত্রী ভালো হয়ে যায় তাহলে ক্ষতি কী!

আউয়াল সাহেব খুলনায় তরকারির ব্যবসা করেন। অল্প পুঁজি। সেই পুঁজি থেকেই তিনি চিকিৎসা প্যাকেজের ২০ হাজার টাকা আর যাতায়াতের জন্য কিছু টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। হাসপাতালে আসার পর তাঁর হাতে একটি ফরম দেওয়া হলো। সেটি পূরণ করার পর বলা হলো, আপনি টাকাটা ক্যাশ শাখায় জমা দেন।

আবদুল আউয়াল দেরি করলেন না। তখনই ২০ হাজার টাকা ক্যাশ শাখায় জমা দিলেন। এরপর তাঁর স্ত্রীকে ডাক্তার সাহেব দেখলেন। দেখার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিশাল এক ফর্দ ধরিয়ে দিলেন। আউয়াল সাহেবের চোখেমুখে বিস্ময়; আবার হতাশাও। তিনি হতাশার সুরে বললেন, আপনারা যে বললেন, আমার আর কোনো খরচ হবে না!

পরীক্ষা-নিরীক্ষা তো আপনারই করতে হবে। ওগুলো আমাদের প্যাকেজের মধ্যে নাই।

হাসপাতালের লোকটির কথা শুনে আউয়াল সাহেব চোখে শুধু অন্ধকার দেখছেন। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। মেয়েদের সঙ্গে কথা বললেন। তারা তো রেগে আগুন! তাদের একের পর এক প্রশ্ন, না জানিয়ে কেন তাদের মাকে ঢাকায় নেওয়া হলো?

আউয়াল সাহেব নিজের পকেট হাতালেন। তাঁর কাছে যে টাকা আছে তা দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হবে না। মেয়েরাও টাকা পাঠাতে রাজি হলো না। অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনার পর তিনি হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকদের বললেন, আমার স্ত্রীর চিকিৎসার দরকার নাই! আমার টাকা ফেরত দেন। আমি বাড়ি চলে যাই।

এ কথা শোনার পরপরই দেখলেন, কয়েকজন লোক আউয়াল সাহেবের স্ত্রীকে ট্রলিতে করে আইসিইউতে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি জানতে চাইলেন, কী ভাই, কী হয়েছে? তাকে কোথায় নিচ্ছেন?

হাসপাতালের লোকগুলো বলল, আপনার স্ত্রীর অবস্থা খুব খারাপ। তাকে আইসিইউতে নিতে হবে। তার হার্টবিট পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি আর কিছুই বলতে পারলেন না। এর মধ্যেই তাকে আইসিইউতে নিয়ে গেছে। তাঁকে আর সেখানে ঢুকতে দিচ্ছে না। তাঁকে বলা হয়েছে, ডাক্তার, নার্স আর রোগী ছাড়া আর কারো ঢোকার অনুমতি নেই। খুবই স্পর্শকাতর জায়গা!

আউয়াল সাহেব উদ্বিগ্ন, চিন্তিতও। তিনি কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেল। সব কিছুই এলোমেলো লাগছে। মেয়েরা কোনো বুদ্ধি দেবে তো দূরের কথা, উল্টো তাঁকে বকাবাজি করেছে। তাই তিনি তাদের টাকা পাঠানোর কথাও বলতে সাহস পাচ্ছেন না।

এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে আউয়াল সাহেব আইসিইউয়ের সামনে দাঁড়িয়ে যখন হতাশায় হাবুডুবু খাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আইসিইউ থেকে একজন লোক এসে বলল, কোহিনূর বেগমের সঙ্গে কে এসেছেন?

আউয়াল সাহেব পড়িমরি করে লোকটার সামনে গিয়ে বললেন—জি, আমি!

উনি আপনার কে হন?

আমার স্ত্রী।

ওনার এখনই অপারেশন করাতে হবে।

কেন, অপারেশন কেন করাতে হবে?

তার মাথায় টিউমার আছে। এখনই অপারেশন না করালে রোগীকে বাঁচানো যাবে না।

আউয়াল সাহেব আর কথা বলতে পারলেন না। লোকটার কথা শুনে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন। তারপর লোকটির ভাগ্যে কী ঘটল তা আর জানা গেল না।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

 





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com