Sunday, 19 November, 2017, 3:26 AM
Home সারাদেশ
হাওরের দুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ জরুরি
ইসহাক খান
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 6:08 PM, Count : 26
বিপদ যখন আসে তখন চারদিক থেকে আসে। এটি একটি প্রচলিত প্রবাদ। কিন্তু বাস্তবে আমরা তা-ই দেখছি। দেখতে দেখতে সিলেট-সুনামগঞ্জে ১৪২টি হাওর পানিতে সয়লাব হয়ে গেল। আর তাতে হাওরের সব ফসল পানিতে তলিয়ে গেল। ফসল নয়, যেন হাওরবাসীর স্বপ্ন ডুবে গেল।

ব্যক্তিগতভাবে অনেকবার হাওর এলাকায় যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে গিয়েছি। দেখেছি হাওরের ভয়াল রূপ। সাগরের মতো কূলকিনারাহীন। সাগরের মতোই বিশাল বিশাল ঢেউ। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। টাঙ্গুয়ার হাওরে বজরা নৌকায় রাত যাপন করেছি। ঢেউয়ে যখন নৌকা দুলত মনে হতো এই বুঝি সব ওলটপালট হয়ে যাবে। মাঝিরা আমাদের সাহস জোগাতেন। বলতেন, ভয় পাবেন না, নৌকা ডুববে না। মাঝিদের অভয় বাণী পেয়ে আমরা হৈ-হুল্লোড়ে আর নৃত্য-গীত করে মাতিয়ে তুলেছি হাওরের বিশাল হৃদয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখেছি ভিন্ন রূপ। যত দূর চোখ যায় সবুজ আর সবুজ। চারদিকে সবুজের মহাসমারোহ। কচি ধানের চারাগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। কিছুদিন পরই পাকা ধানে ভরে উঠবে কৃষকের গোলা।

হাওরের জমি সব এক ফসলি। ছয় মাস পানির নিচে ডুবে থাকে হাওরের মাটি। শুকনো মৌসুমে আবার অন্য রূপ ধরে। কৃষকরা ফসল বোনে। সেই ফসল ঘরে তুলেই তারপর তারা আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে। হাওরের পানির টাটকা মাছ আর মোটা চালের ভাত তাদের নতুন আনন্দে তাড়িয়ে বেড়ায়। হাওরের ভাসা পানিতে অনেক বিখ্যাত গীতিকবির জন্ম। তাঁদের মধ্যে হাছন রাজা, শাহ আবদুল করিম, উকিল মুন্সী উল্লেখযোগ্য। হাওরবাসীর বর্ষার সময় নৌকাবাইচ আর গানের আসরে তাদের সময় বয়ে যায়। সেই হাওরের কান্না শুধু হাওরবাসীকে নয়, গোটা দেশবাসীকে বেদনার সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ধনী-গরিব আজ এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। সর্বত্র হাহাকার। কিভাবে চলবে তাদের জীবন। এদিকে তাদের আয়ের একটি বিরাট উৎস হাওরের মাছ, কাঁচা ধানের পচা অংশ খেয়ে মাছও মরে ভেসে উঠছে। সেই মাছ খেয়ে পানিতে ভাসা হাঁসও প্রাণ হারাচ্ছে। এক মরণে হাজার মরণ। মড়ার ওপর খাড়ার ঘা এসে জুটেছে হাওরে।

অভিযোগে প্রকাশ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি আর বাঁধ নির্মাণকারী ঠিকাদারদের দুর্নীতি ও ব্যর্থতার কারণে সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চলের তিন লাখ কৃষক পরিবার আজ পথে বসেছে। ঠিকাদাররা হাওরের বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতের দায়িত্ব পেয়ে তা সময়মতো ও সঠিকভাবে শেষ না করায় এ দুর্যোগ নেমে এসেছে হাওরবাসীর জীবনে। ফলে ফসল রক্ষা বাঁধগুলো একে একে ভেঙে ফসলহানির মতো বিপর্যয় ঘটে গেছে। এ ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা আগেই করেছিল হাওরবিষয়ক উন্নয়ন জোট ‘হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম’ ও নাগরিক সংগঠনগুলো। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে তারা পাঁচটি জেলার সাতটি হাওরের বাঁধ নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ করে তা জানিয়েছিল স্থানীয় প্রশাসনকে। এর দুই সপ্তাহ পরেই অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে ফসলহানি ঘটে।

হাওর অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম হাওরের বিপর্যয়ের কারণ এবং করণীয় বিষয়ে একটি প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। তাতে এ বিপর্যয়ের পেছনে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অনিয়মের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির গাফিলতিকে দায়ী করেছে। কারণ পিআইসির দায়িত্ব ছিল বাঁধ মেরামত করা। আর বাঁধ নির্মাণ ও উঁচু করার দায়িত্ব ছিল ঠিকাদারদের।

এরই মধ্যে কাজে গাফিলতির জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্য আরো কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি আছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তাতে কী এসে যায়। অপরাধীকে প্রত্যাহার করলেই কি তার অপরাধ মাফ হয়ে যায়? তার কাজের জবাবদিহি থাকাটাই মূল কথা। কিন্তু এ কাজটি আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। যার যা ইচ্ছা করে যাচ্ছে। কাউকে তার কাজের জবাবদিহি করতে হয় না।

ফসল ডুবে যাওয়ার পর এখন আর নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রত্যাহার করে কী হবে? সর্বনাশ যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। এখন এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। এখন প্রশাসন থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি যাঁরা আছেন, তাঁদের সবাইকে দুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এখন হাওরবাসীর জন্য জরুরি মানবিক সাহায্য দরকার।

এখন দোষ খোঁজার চেয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়ানো অতি জরুরি। কিন্তু বেদনার সঙ্গে আমরা লক্ষ করছি, কোনো এনজিও এ দুর্যোগে সেভাবে এগিয়ে আসছে না। সরকারি সাহায্য অত্যন্ত অপ্রতুল। যে সাহায্য দেওয়া হচ্ছে তা দিয়ে এসব মানুষের জীবন বাঁচানো কঠিন। দরকার পর্যাপ্ত ত্রাণ।

প্রায় চার সপ্তাহ ধরে নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে অকালবন্যায় তলিয়ে গেছে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর জমির ফসল। অথচ দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, জেলার কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত দুর্গত এলাকায় কেউ গিয়ে দুর্গতদের পাশে দাঁড়াননি। এ দুর্যোগ মোকাবেলার নেই কোনো কর্মপরিকল্পনা। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী দুর্গত এলাকায় গিয়ে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণভাণ্ডারে প্রচুর খাদ্যশস্য রয়েছে। কেউ না খেয়ে থাকবে না। তিনি এনজিওগুলোকে আগামী এক বছর ঋণের কিস্তি ও সুদ আদায়ের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে অনুরোধ করেছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছেন ঋণ আদায় বন্ধ রাখার জন্য। তিনি আগামী রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখার জন্য হাওরাঞ্চলে যাচ্ছেন। স্থানীয় লোকজন তাঁর আগমনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। তিনি দুর্গতদের পরম ভরসাস্থল। আর যাঁরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো আস্থা নেই। তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা ব্যর্থ না হলে এ দুর্যোগ হাওরবাসীদের এভাবে সর্বস্বান্ত করতে পারত না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিমত।

এরই মধ্যে গুজবে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, ভারত থেকে ইউরেনিয়াম পাঠিয়ে পানি দূষণ করা হয়েছে। এ কারণে মাছ ও হাঁস মারা যাচ্ছে। বাংলাদেশ হলো গুজবের দেশ। এ গুজব বিশ্বাস করে বেশির ভাগ পত্রপত্রিকায় নানা ধরনের লেখাও হচ্ছে। ভাবখানা যে আলুর কেজির মতো সস্তায় ইউরেনিয়াম পাওয়া যায়। নিরুপায় হয়ে সরকার আণবিক কমিশনের কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে পানি, মাটি ও পচা ধানের গোছা এনে পরীক্ষাগারে পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। সেই পরীক্ষায় ইউরেনিয়ামের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মাছের মড়কও বন্ধ হয়ে গেছে। এ গুজব যারা ছড়িয়েছিল, তাদেরও আর কোনো কথা নেই।

আমরা কি আমাদের চেতনাকে আরো শাণিত করতে পারি না? কেন আমরা নাই কথা থেকে একটি ধারণা তৈরি করে অযথা পরিবেশ দূষিত করি? জাতি হিসেবে দুঃসময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস আমাদের আছে। আছে প্রচুর প্রাণশক্তি। সেই প্রাণশক্তি দিয়ে এবারও আমরা এ দুর্যোগ মোকাবেলায় সফল হব। এ জন্য সবার সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। অন্যের কথায় তাল না দিয়ে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তবেই এ দুর্যোগ থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি।

দুর্গত মানুষরা কারো উদ্ভট কথা শুনতে চায় না। চায়না অযথা বিতর্ক। তারা এই দুঃসময়ে দুমুঠো ভাত আর একটু নুন চায়। তাদের এখন বেঁচে থাকার উপকরণ দরকার। আমরা কি অযথা কূটতর্ক বাদ দিয়ে দুর্গত মানুষদের পাশে যার যা আছে তা-ই নিয়ে দাঁড়াতে পারি না?

 

লেখক : গল্পকার, টিভি নাট্যকার

 





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com