Friday, 22 September, 2017, 2:12 PM
Home স্বাস্থ্য
সীমার মাঝে অসীম
মো. আখতার হোসেন
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 6:00 PM, Count : 21
ইদানীং অটিজম শব্দটি দেশে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষ করে এপ্রিল মাস এলেই অটিজম নিয়ে অনেক লেখা, সভা-সেমিনার টকশোসহ বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন নজরে পড়ে। ২ এপ্রিল বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ পালন করা হয়। বোধকরি অটিজম শব্দটির বাহ্যিক দিক বা বিষয়টির সঙ্গে সাধারণ মানুষ যতটা পরিচিত, অটিজমের সীমাবদ্ধতা ও ব্যাপকতা সম্পর্কে ততটা পরিচিত নয়। অটিজমে আক্রান্ত অটিস্টিক শিশু বা ব্যক্তির সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি তার মেধার স্বাক্ষর প্রমাণ করে, অটিজমে আক্রান্ত শিশু বা ব্যক্তি অক্ষম নয়, বরং ভিন্নভাবে সক্ষম; কখনও কখনও অতি সক্ষম- যেন সীমার মাঝে অসীম। এমন বাস্তব উদাহরণের প্রমাণ পাওয়া যায় বিখ্যাত বিজ্ঞানী, সাহিত্যিকসহ বিশ্ববরণ্যে ব্যক্তির জীবন, আবিষ্কার ও অবদান পর্যালোচনা করলে। কিন্তু অটিজমে আক্রান্ত কোনো শিশু বা ব্যক্তি ভিন্নভাবে সক্ষম কিংবা অতি সক্ষম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব নিজে নিতে পারে না। দায়িত্ব নিতে হয় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে।
অদ্যাবধি অটিজমের কারণ যেমন নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি, তেমনি এমন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সন্তানের পিতামাতা কে হবেন সেটাও কোনোভাবেই জানা যায়নি। তবে একজন অটিস্টিক সন্তানের গর্বিত পিতা হিসেবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, এমন সন্তানের পিতামাতা হওয়ার জন্য কেউ প্রস্তুত থাকে না। সন্তানটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর শিগগিরই জানতে না পারলেও কিছুদিন পর আকস্মিকভাবে পিতামাতাকে সেই চরম সত্যটি শুনতে হয়- তাদের সন্তান অটিস্টিক। সব স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা নিভে যায়, পরিবারটি চিহ্নিত হয় একটি যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে, সেখানে বিরামহীনভাবে যুদ্ধ চলতে থাকে সন্তানের অস্তিত্বের জন্য। একজন মা’কে তার ক্যারিয়ার কিংবা স্বপ্নের দরজায় তালা লাগিয়ে বিশেষ সন্তানটির লালন-পালনের জন্য নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে হয় সেই যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যেই। যুদ্ধক্ষেত্র আর কর্মক্ষেত্র এ দুটিকেই সমানভাবে সামলে চলতে হয় বিশেষ সন্তানের পিতাকেও। কষ্ট-হতাশা-দ্বিধা-অসহায়ত্বের কালো মেঘ আচ্ছন্ন করে রাখে গোটা পরিবারটিকে। এ এক অন্যরকম চ্যালেঞ্জ। এত যুদ্ধ, এত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানটির মেধার বিকাশ ঘটিয়ে তাকে বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা কোনো এক বরেণ্য ব্যক্তির স্থানে দেখার মতো সাহস(!) করতে পারেন ক’জন পিতামাতা? সন্তানের সীমাবদ্ধতাকে জয় করে তাকে তার যোগ্য স্থানে পৌঁছে দেয়ার সাহসিকতা দেখানো অবশ্যই সম্ভব যদি সমাজ এবং রাষ্ট্র তাদের দিকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসে।
আমাদের সন্তানদের নিয়ে সরকার তথা রাষ্ট্রের ভাবনা, ভূমিকা এবং পদক্ষেপ যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে বলে বিশ্বাস করি। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদের ভূমিকা আমাদের শুধু সচেতন করে না, সাহসীও করে। আমরা সম্মানিত এবং গর্ববোধ করি, যখন প্রধানমন্ত্রী তার শুভেচ্ছা কার্ডে অটিস্টিক সন্তানদের আঁকা ছবি ব্যবহার করেন। আমরা অতি উচ্ছ্বসিত হই, যখন তিনি আমাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং ব্যক্তিদের খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত মাঠ হিসেবে বিশেষ সংরক্ষিত এলাকা মহান জাতীয় সংসদ ভবনসংলগ্ন স্থানটিকে বরাদ্দ দেন। এটি সত্যিই এক অতুলনীয় দৃষ্টান্ত; অবর্ণনীয় উদারতা এবং ভালোবাসার এক বাস্তব প্রতিফলন। আমরা কৃতজ্ঞ আমাদের সন্তানদের এমন মর্যাদা প্রদান করার জন্য। আমরা আশান্বিত হই, যখন প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান আমাদের সন্তানদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। আমাদের দেশে যেমন অতি দরিদ্র মানুষ আছে, ঠিক তেমনি অনেক উচ্চবিত্ত, অতি উচ্চবিত্ত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং শিল্পপতিও আছে। আমাদের সন্তানদের প্রতি তাদের একটু সুদৃষ্টি ইতিবাচক পরিবর্তনের এক বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। দান বা করুণা নয়, বরং দক্ষতা এবং সক্ষমতা অনুযায়ী কর্মক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করেই তাদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
পনেরো বছর বা ততোর্ধ্ব বয়সের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কিছু ইয়াংস্টার আছে, যারা পড়াশোনা অথবা ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ শেষ করেছে; কিন্তু কোনো কাজ না পাওয়ায় বাসার চার দেয়ালের মধ্যেই তাদের আবদ্ধ থাকতে হচ্ছে। যারা এতদিন কিছু নিয়মের মধ্য দিয়ে স্কুল বা প্রশিক্ষণ করে এসেছে, তারা বাসায় আবদ্ধ থাকতে চায় না। কারণ তারা কাজের মধ্যে থাকতেই পছন্দ করে। এ বয়সের সন্তানদের বাসায় ধরে রাখা পিতামাতার জন্য যেমন কষ্টসাধ্য, তেমন হতাশাজনকও বটে। সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সন্তানদের অক্ষমতাকে সক্ষমতায় রূপান্তরিত করার পরও যদি তাকে তার যোগ্য স্থানে পুনর্বাসিত করা না যায়, তাহলে আরও পিছিয়ে থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানটিকে এগিয়ে নিতে তার পিতামাতা কতটুকু উৎসাহী ও সচেষ্ট হবেন?
আমাদের দেশ যখন ব্যাপক উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট, তখন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে কর্মহীন বা পশ্চাতে রাখলে তার ফল কি শুভ হবে? জাতিসংঘের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল সেন্টারে আয়োজিত এক আলোচনার মূল প্রবন্ধে অটিজম বিশেষজ্ঞ ও গ্লোবাল অটিজম পাবলিক হেলথ ইনিশিয়েটিভ ইন বাংলাদেশের জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান সায়মা ওয়াজেদ বলেছিলেন, এদের বাদ দিয়ে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন হবে না। তারা আমাদের পরিবার, সমাজ ও দেশের একটি অংশ। শুধু বাবা-মা নয়, পুরো সমাজ ও দেশকে এদের এগিয়ে নিতে হবে। সুতরাং সমাজের সব বিত্তবান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই আপনারা এগিয়ে আসুন, আমাদের সন্তানদের গ্রহণ করুন এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনে এদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করুন। নিশ্চিত করে বলতে পারি তারা মিথ্যা বোঝে না, মিথ্যা বলে না; তারা দুর্নীতি বোঝে না, দুর্নীতি করে না; তারা অক্ষম নয়, ভিন্নভাবে সক্ষম।
মো. আখতার হোসেন : চেয়ারম্যান, ল্যাংগুয়েজ বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; সাধারণ সম্পাদক, প্যারেন্টস ফোরাম ফর ডিফারেন্টলি অ্যাবল
sunny7tauhid@yahoo.com







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com