Sunday, 19 November, 2017, 3:14 AM
Home বিশ্ব
ইউরোপের অস্থিরতার প্রতিফলন ফ্রান্সে
সাবি্বর আহমেদ
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 5:46 PM, Update: 30.04.2017 6:20:47 PM, Count : 20
গত ২৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম পর্ব। ১১ জন প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট (২৩.৭৫ শতাংশ) পেয়েছেন রাজনীতিতে নতুন এমানুয়েল মাক্রোন। ২১.৫৩ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন কট্টর ডানপন্থি দল ফ্রন্ট ন্যাশনাল নেত্রী মেরিন লি পেন। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারীদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্ধারণের জন্য রানঅফ ভোট হবে আগামী ৭ মে। এ দু'জন ছাড়াও প্রথম পর্বের নির্বাচনে অন্যতম প্রধান প্রার্থী ছিলেন ডানপন্থি লা রিপাবলিকান দল মনোনীত এবং দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফ্রঁাঁসোয়া ফিলন (১৯.৯১); কড়া বাম জঁ লুক মেলেনশন (১৯.৬৮) এবং ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী বেনৈত হ্যামন (৬.৩৫)। জনমত জরিপের তথ্যানুযায়ী, একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের প্রতি সর্বকালের সর্বনিম্ন সমর্থন দেখে প্রার্থী হননি ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। নিজ দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাই নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ফিলনের কাছে হেরে গেছেন সাবেক ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি।
নির্বাচনের প্রথম পর্ব শেষে বাদ পড়েছে প্রচলিত ধারার সব রাজনৈতিক দল। টিকে রয়েছে মাত্র গত বছর গঠন করা দল অ্যাঁ ম্যাসে দলের প্রার্থী মাক্রোন এবং কখনও ক্ষমতায় যেতে না পারা চরম ডানপন্থি দল ন্যাশনাল ফ্রন্টের লি পেন। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট এবং ট্রাম্পের নির্বাচন বদলে দিয়েছে পশ্চিমা রাজনীতির হিসাব-নিকাশ। সম্প্রতি জিততে জিততে হেরে গেছেন নেদারল্যান্ডসের পপুলিস্ট নেতা গ্রিট ওয়াইল্ডার্স; গত বছর ৪৬.২ শতাংশ ভোট পেয়ে হেরেছেন অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টি নেতা নর্বার্ট হফার। ইতালির পপুলিস্ট দল ফাইভ স্টার মুভমেন্ট এখন প্রধান বিরোধী দল। পপুলিস্ট দলগুলোর জনসমর্থন বেড়েছে ইতালি, স্পেন, ফিনল্যান্ড, জার্মানিসহ ইউরোপের সব দেশে।
২০০৮ সালের অর্থিক দুর্যোগের পর থেকে ইউরোপজুড়ে চলছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা; বেড়েছে বেকারের সংখ্যা, কমেছে খেটে খাওয়া মানুষের আয়। ফ্রান্সে এখন ১০ শতাংশ লোক বেকার। তরুণদের মধ্যে এই হার ২৫ শতাংশ। শুধু ফ্রান্স নয়; জার্মানি বাদ দিলে সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকার পরিস্থিতি কমবেশি একই রকম। দীর্ঘ দিন ধরে চলা অর্থনৈতিক দুর্দশার কারণে প্রচলিত রাজনৈতিক পদ্ধতি, শাসকগোষ্ঠী; অন্যকথায় কায়েমি স্বার্থবাদীদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে পশ্চিমের জনগণ। ভোট দেওয়ার জন্য তারা খুঁজছে নতুন কাউকে। পপুলিস্ট দলগুলোর মধ্যে চিন্তাধারা, নেতৃত্ব বা উৎপত্তিতে পার্থক্য থাকলেও মিল রয়েছে বেশ কয়েকটি ইস্যুতে। এরা সবাই বিশ্বায়নবিরোধী, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নবিরোধী, অভিবাসনবিরোধী, ইসলামী সন্ত্রাসবিরোধী, কায়েমি স্বার্থবাদীদের হটিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। এরা চরম জাতীয়তাবাদী।
আর্থিক মন্দার সময় পশ্চিমের সাধারণ মানুষ খুব ভালো করে বুঝে যায়, কীভাবে চলছে বিশ্বব্যবস্থা; আস্থা হারিয়ে ফেলে শাসক শ্রেণির ওপর। প্রচলিত ধারার রাজনীতির ওপর হয়ে ওঠে বীতশ্রদ্ধ; খুঁজে ফেরে নতুন নেতৃত্ব। ২০১৩ সালের শুরুতে ইতালিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে কোনোদিন রাজনীতি না করা অভিনেতা, বল্গগার বেপ্পে গ্রিল্লোর ফাইভ স্টার মুভমেন্ট জিতে নেয় ২৫ শতাংশ ভোট। পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে গ্রিল্লোর সমর্থকরা রোমের মেয়র পদসহ জিতে নেয় বহু স্থানীয় নির্বাচন। ফাইভ স্টার মুভমেন্টের প্রচারণার তোড়ে সবশেষে গণভোটে হেরে বিদায় নেন প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও রেঞ্জি। স্পেনের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ২০১৪ সালে গঠিত কড়া বাম পডেমো। ১৫ সালের নির্বাচনে তারা ২২.৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়। ১৫ সালের ব্রিটিশ নির্বাচনে পপুলিস্ট ইউকিপ দল ভোট পায় ১২.৬ শতাংশ। ২০১০ সালে এই পপুলিস্ট দলটি ভোট পেয়েছিল মাত্র ৩.১ শতাংশ।
বিশ্বায়নকে আটলান্টিকের দুই পাড়ের খেটে খাওয়া মানুষ সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইউরোপে একইভাবে দেখা হচ্ছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে। ইউ'র ফলে কাজের সুযোগ কমেছে বড় বড় অর্থনীতির দেশে; সার্বভৌমত্ব কমেছে; হারিয়েছে নিজেদের অহঙ্কার ফ্রাংক, লিরা; উপকৃত হয়েছে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলো এবং ধনী ব্যক্তিরা। তাই এই আমলা পরিচালিত সংস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে চায় আমজনতা। ফিরে পেতে চায় নিজের দেশকে নিজে পরিচালন করার অধিকার।
পপুলিস্ট দলগুলোর সবই অভিবাসনবিরোধী। বিশ্বায়ন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ফলে একদিকে বহু কারখানা চলে গেছে; অন্যদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ মানুষ এসে ভাগ বসিয়েছে অবশিষ্ট কাজের ওপর। এর ফল হয়েছে মজুরি কমে যাওয়া; বেড়েছে বেকারত্ব, কমেছে রাষ্ট্রীয় সুবিধাবলি। অভিবাসী বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী পশ্চিমের সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতি। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং সিরিয়ায় যুদ্ধ বাধানোর ফলে একদিকে খরচ করতে হয়েছে বিপুল অর্থ; অন্যদিকে সেসব দেশ থেকে চলে এসেছে লাখ লাখ অভিবাসী। এ অবস্থার জন্য খেটে খাওয়া মানুষ দায়ী করছে এতকাল ধরে নেতৃত্ব দেওয়া রাজনীতিবিদদের। তারা আস্থা হারিয়েছে আন্তর্জাতিকতাবাদী মধ্য ডান ও মধ্য বামদের ওপর।
পপুলিস্ট দলগুলোর আরেক কমন শত্রু_ ইসলাম। আমেরিকা ও ইউরোপের সাধারণ মানুষ জঙ্গিবাদের উত্থানে যেমন দায়ী করছে তাদের রাজনীতিবিদদের, তেমনি দায়ী করছে ইসলাম ধর্মকে। সুইজারল্যান্ড মসজিদের ওপর মিনার বানানোকে নিষিদ্ধ করেছে; ফ্রান্স সাধারণ স্থানে মুখ ঢেকে রাখা হিজাব নিষিদ্ধ করেছে। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মেরিন লি পেন বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করবেন হিজাব; বাড়তি কর ধার্য করবেন ধনী ও অভিবাসীদের ওপর। পপুলিস্ট দলগুলোর সমর্থকরা মনে করে, তাদের দল ক্ষমতায় গেলে শক্ত হাতে দমন করবে ইসলামী জঙ্গিবাদ।
ব্রিটেনের দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের সর্বশেষ জনমত জরিপ অনুযায়ী, ৭ মের নির্বাচনে জিতে আসবেন এমানুয়েল মাক্রোন। বর্তমানে তার পক্ষে জনমত রয়েছে ৬০.২ শতাংশ এবং পপুলিস্ট মেরিন লি পেনের পক্ষে রয়েছেন ৩৯.৮ শতাংশ ভোটার। তবে এই পার্থক্য প্রথম পর্ব নির্বাচনের পর কমতির দিকে। ৩৯ বছর বয়স্ক মধ্যপন্থি মাক্রোন প্রথম পর্বের নির্বাচনের পর সমর্থন পেয়েছেন ডান-বাম নির্বিশেষে সব প্রচলিত ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর; লি পেন একা। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোই নয়; মাক্রোনের সঙ্গে আছে বিগ বিজনেস, ব্যাংক, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, সুশীল সমাজ; সর্বোপরি মিডিয়া। বাংলাদেশে প্রচলিত ধারণায় এদের সবাইকে একসঙ্গে সুশীল সমাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রধান ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলো যেমন আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের বিপক্ষে ও হিলারির পক্ষে ছিল; এখানেও তেমনি তারা মধ্যপন্থি মাক্রোনের পক্ষে; লি পেনের বিপক্ষে। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তাদের একই অবস্থান। মূলধারার সংবাদমাধ্যম শুধু বিপক্ষেই নয়; যে কোনো মূল্যে তারা লি পেনের তথা খেটে খাওয়া মানুষের রাজনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে। সংবাদমাধ্যম সব সময় টাকাওয়ালাদের পক্ষে জনমত তৈরি করে। সুশীল সমাজ এদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক রসদ সরবরাহ করে। মিডিয়া ও সুশীল সমাজ শুধু টাকাওয়ালাদের পাহারাদার না হয়ে, খেটে খাওয়া মানুষের দিকে সামান্য খেয়াল রাখলে এতদিনে বদলে যেত ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র।
জনমত জরিপ মার্কিন নির্বাচনের মতো ভুল রিডিং না দিলে ৭ মে জিতে যাবেন নবাগত মাক্রোন। তার নেতৃত্বে ফ্রান্সের জনগণ সারকোজির ধনী তোষণের সার্কাস আর ওলাঁদের অক্ষম সমাজবাদের হাত থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাবে। ফ্রেঞ্চ রাজনীতিতে পুঁজিবাদের স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করে তিনি শ্রমিক শ্রেণির মন জোগানোর চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা যায়। লি পেন হয়তো তার বাবার মতো আবারও হেরে যাবেন দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে। তার হেরে যাওয়া মানে পপুলিজমের হেরে যাওয়া হবে না, বরং আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া হবে। তার নেতৃত্বে ধাপে ধাপে তার দলের সমর্থন বেড়েছে, যার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিগত সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরপর অনুষ্ঠিত হবে সেখানকার সংসদ নির্বাচন। সে নির্বাচনে বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি আসন পাবে তার দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট। শুধু ফ্রান্সেই নয়, ধাপে ধাপে ইউরোপ-আমেরিকায় এগিয়ে চলছে পপুলিজম। দিন ঘনিয়ে আসছে মূলধারার রাজনীতির।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com