Sunday, 19 November, 2017, 3:11 AM
Home শিক্ষা
এক আনন্দোজ্জ্বল সংবাদ
ড. রকিবুল হাসান লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 5:39 PM, Update: 08.05.2017 9:10:11 AM, Count : 23
অনেকদিন ধরেই মনের ওপর মেঘ জমে আছে। মেঘটা কিছুতেই সরছে না। কবে এ মেঘ যাবে! আলো ফুটবে! মন ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারবো! হীরকদ্যুতির উজ্জ্বলতায় বড় বড় অনুষ্ঠানে মধ্যমণি হয়ে আবার কবে আলো ছড়াবেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার! স্যার অনেকদিন অসুস্থ। তার অসুস্থতা আমাদের জাতীয় জীবনের মন-মননকেই তো ভারি করে তোলে, বেদনার এক মেঘ জমে ওঠে। অধ্যাপক ইমেরিটাস আনিসুজ্জামান। জীবন্ত কিংবদন্তি। দেশে-বিদেশে খ্যাতিমান। বাংলা সাহিত্যের মহীরুহ ব্যক্তিত্ব। সর্বজনশ্রদ্ধেয় তিনি। শিক্ষক হিসেবে, মানুষ হিসেবে তাঁর তুলনা তিনিই। বেশ কয়েক মাস ধরেই তিনি অসুস্থ। তাঁর অসুস্থতায় গোটা দেশটাই যেন এখন বিবর্ণ।

 সেই বিবর্ণতার ভেতর এক আনন্দোজ্জ্বল সংবাদ। আনিসুজ্জামান স্যার আবারো আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন। যা আমাদের জন্য এক বিরল সম্মান। অন্যবারের চেয়ে এবারের আনন্দ পুরস্কারের বিশেষত্ব অন্যরকম। অবশ্য এর আগেও ১৯৯৩ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কার লাভ করেছিলেন। ‘পদ্মভূষণ পদক’ পেয়েছেন ২০১৪ সালে। এছাড়াও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত তিনি। আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিক্ষা তথা গোটা বাংলাদেশের জন্য যা এক বিরল সম্মান।

আনিসুজ্জামান স্যার অসুস্থ। বিশ্রামে আছেন। অনেকদিন স্যারের সঙ্গে দেখা হয়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে স্যারের খবর জানার চেষ্টা করি। সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড.এএনএম মেশকাতউদ্দীন স্যার কথা প্রসঙ্গে আমার কাছে জানতে চাইলেন, ‘স্যার এখন কেমন আছেন? চলো একসময় স্যারকে দেখে আসি।’ স্যারের সঙ্গে কথা বলার আগে কথা-সাহিত্যিক আতা সরকারকে ফোন করলাম। স্যারের শারীরিক অবস্থার কথা জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘এখন বাসাতেই বিশ্রাম নিচ্ছেন। অপারেশন হয়েছে। এখন একটু ভালো আছেন।’

আমি স্যারের মোবাইলে ফোন দিই। স্যারের কন্যা ধরলেন। স্যারের শারীরিক অবস্থা নিয়ে অল্পখানিক কথা শেষেই যাওয়ার কথা জানালাম। পরেরদিন সন্ধ্যায় যেতে বললেন। অর্থাত্ ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায়।

স্যারের বাসায় যাওয়ার জন্য আমরা স্যারের জন্য লাল গোলাপের তোড়া নিলাম। মেশকাতউদ্দীন স্যারের গাড়িতেই গুলশান পথে বের হই, সন্ধ্যার একটু আগে আগে। যেতে যেতে স্যার বললেন, ‘রকিব, বাসাটা ঠিকমতো চেনো তো।’ বাসাটা আমি চিনি। তারপরও স্যার যখন একটু জোর দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার আস্তে করে বললাম, চিনি, স্যার।’ কিন্তু আমার কথার জোর আর অতোটা থাকে না। মনে মনে ভাবি, ‘বাসাটা ঠিকমতো চিনবো তো! কবে এক রাতে গিয়েছিলাম!’  শেষপর্যন্ত বাসাটা ঠিকঠাক মতোই চেনা গেলো।

আনিসুজ্জামান স্যার লুঙ্গি আর শাদা ফতুয়া পরে বসে আছেন। সামনে ম্যাডাম। পাশের সোফায় একজন ডাক্তার। ভাগ্নে সম্পর্কের। স্যারের বাম পাশের সোফায় বসলেন মেশকাতউদ্দীন স্যার। আনিসুজ্জামান স্যার অন্যদের সঙ্গে মেশকাতউদ্দীন স্যারের পরিচয় করিয়ে দিলেন। মেশকাতউদ্দীন স্যারের প্রতি আনিসুজ্জামান স্যারের আন্তরিকতার এক স্নেহশিশির মুহূর্তেই গোটা রুমে ফুটে উঠলো। যেখানে স্যারের খোঁজ-খবর আমাদেরই আগে নেয়ার কথা, কিন্তু আমাদের আগেই আনিসুজ্জামান স্যার মেশকাতউদ্দীন স্যারের খোঁজ-খবর নিলেন—কেমন আছেন জানতে চাইলেন— সাউথইস্ট  বিশ্ববিদ্যালয় নতুন কোনো কিছু করছে কী না—নানা বিষয়ে কথা বললেন। মেশকাতউদ্দীন স্যার বললেন, ‘আমরা নতুন একটি উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিবছর বাংলা সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকদের পুরস্কার দিতে চাই। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আরো বেশি করে লালন করতে চাই। আর আমাদের এখানে তো বাংলা বিভাগ আছেই। এটিও তো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিশেষ দিক।’ এরপর মেশকাতউদ্দীন স্যার আনিসুজ্জামান স্যারের কাছে দাবি নিয়ে বললেন, ‘এই পুরস্কার-কমিটিতে আপনাকে আমরা চাই। সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ আপনাকে পেতে অত্যন্ত আগ্রহী।’ এতোটা অসুস্থ শরীরেও স্যার প্রচণ্ড স্নেহবশত বিনাবাক্য ব্যয়ে মেশকাতউদ্দীন স্যারের প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করলেন। সম্মতি দিলেন। আনিসুজ্জামান স্যার সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগের কথা জেনে খুশি হলেন। মেশকাতউদ্দীন স্যারকে তিনি কতোটা স্নেহ করলে, এরকম অসুস্থ শরীরে ক্লান্ত মনে এই প্রস্তাব সানন্দে গ্রহণ করা যায়! স্নেহ-ভালোবাসার শক্তিটা যে কতো বড় তা আজ নিজের চোখেই দেখলাম।

আনিসুজ্জামান স্যারের শরীরে ক্লান্তির মেঘ। শরীরটা বেশ ভেঙে গেছে। তারপরও সবকিছুকে হারিয়ে স্যার যেন চির প্রাণবন্ত—কথা বলছেন— ছবি তুলছেন—স্নেহ-মমতা-ভালোবাসায় আমাদের হূদয়লতায় বেঁধে রাখছেন। কিছুতেই উঠতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় আরো কিছুটা সময় থাকি। কিন্তু স্যারের শরীরে ক্লান্তি যেন কুয়াশার মতো নেমে আসছে। মেশকাতউদ্দীন স্যার বললেন, ‘রকিব, চলো আমরা উঠি। স্যারের বিশ্রাম প্রয়োজন।’

বেরুনোর আগে আবারো স্যারের সঙ্গে ছবি তুলি। আমরা যখন বেরুচ্ছি, তখন ঢুকছেন দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান ও তাঁর স্ত্রী মালেকা বেগম।

বেরুতে বেরুতে ভাবছি, স্যার কী আদৌ বিশ্রাম নিতে পারবেন! ঠিক এ সময়ই মেশকাতউদ্দীন স্যার বললেন, ‘উনার বিশ্রাম খুব দরকার।’

যখন আমরা বেরুলাম—তখন সন্ধ্যা ডুবে গেছে। শহরের উজ্জ্বল আলোয় তা একটুও বোঝার উপায় নেই। মুগ্ধতার আলোয় জাগ্রত শহর। আনিসুজ্জামান স্যারের আলোটাও আমাদের দেশ-জাতি-জীবনের জন্য ঠিক এরকমই উজ্জ্বলতর।

স্যার, আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন—এই প্রার্থনা।

লেখক :চেয়ারম্যান, বাংলা ভাষা ও

সাহিত্য বিভাগ, সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com