Monday, 18 November, 2019, 6:56 AM
Home জাতীয়
প্রতিষ্ঠার ২০ বছর
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়
অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 5:09 PM, Update: 08.05.2017 9:14:37 AM, Count : 28
৩১ জুলাই ১৯৯৭, রাতের বিটিভি’র ৮টার খবর দেখছিলাম, হঠাত্ ঘোষণা— ‘সরকার আইপিজিএমআর’ -কে রূপান্তর করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।  চিকিত্সকরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল।

পরেরদিন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্রেণির নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারী এর বিরোধিতা শুরু করে। তাদের বক্তব্য ছিল, এতে তারা চাকরিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও এর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে সকল শিক্ষক ঐক্যবদ্ধ ছিল- সঙ্গে ছিল কিছুসংখ্যক নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ। প্রতিদিন ক্যাম্পাসে পাল্টা-পাল্টি সভা-সমাবেশ, মিছিল এমনকি বিরোধীদের পক্ষে ঘেরাও কর্মসূচীও পালন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তত্কালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়াত সালাহ উদ্দীন ইউসুফ সাহেব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি প্রায় প্রতিদিনই আমাদের সঙ্গে বসতেন। গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বিএমএ’র তত্কালীন মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। দীর্ঘ প্রায় সাত/আট মাস এ আন্দোলন আমাদের প্রতিহত করতে হয়েছিল।

একদিকে আন্দোলন ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে দিনরাত, অন্যদিকে বিএমএ’র পক্ষ থেকে খসড়া আইন প্রস্তুতির বিশাল কর্মযজ্ঞ। বিএমএ’র পক্ষ থেকে ৭৩ এর বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশকে অনুসরণ করে একটা সুন্দর “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯৮ খসড়া” সরকারের কাছে উপস্থাপন করা হয়। এ প্রস্তাবসহ অন্যান্য আরো কয়েকটি আইন দেখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯৮ মহান সংসদে অনুমোদিত হয়ে ৫ এপ্রিল ১৯৯৮ তারিখে গেজেট হিসেবে প্রকাশিত হয়। এখানেও আমার একটি বিশেষ অনুভূতির বিষয় রয়েছে, সংসদে যে খসড়াটি বিতরণ করা হয় তার মুখবন্ধটি আমার লেখার সুযোগ হয়েছিল।

অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে ১৯৯৮ সনের ৩০ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু হয় প্রথম ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক এম এ কাদেরী’র মাধ্যমে।

 কেন আমরা বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছিলাম? দেশে মেডিক্যাল শিক্ষা ত্রয়ী প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের ভর্তি নীতিমালা ও পরীক্ষা, ছাত্র ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ ও বদলি এবং শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ ইত্যাদি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত। কোর্স কারিকুলাম তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল। একাডেমিক কারিকুলাম, পরীক্ষা পরিচালনা ও সনদ প্রদান করে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। উপরের ত্রয়ী নিয়ন্ত্রণে যে সকল কাজ সম্পাদিত হচ্ছে তা বিশ্বে প্রচলিত ধারা অনুযায়ী একা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। সে কারণে আমরা চেয়েছিলাম দেশের সকল মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা। তখন সবটা হয়নি কিন্তু এখন ধাপে ধাপে সবই হচ্ছে। আরো দুটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে, সেখানে আমাদের লক্ষ্য আরো এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিত্সক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আবার উত্সাহ-উদ্দীপনা নিয়ে নিয়োজিত হলো উন্নতমানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনির্মাণে। কাদেরী স্যারের পরে বিভিন্ন সময়ে অধ্যাপক মাহমুদ হাসান, অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এবং অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত তাঁদের সাধ্যমতো বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। নজরুল স্যারের সময় Phase II প্রকল্পটি চূড়ান্ত রূপ লাভ করে যা প্রায় বাতিল হওয়ার উপক্রম ছিল (সূত্রঃ অধ্যাপক রুহুল আমিন মিয়া, সাবেক প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর) যেটি অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্তের সময় একনেকে অনুমোদিত হয়ে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সাবেক মাননীয় উপাচার্য প্রাণ গোপাল দত্ত তাঁর শেষ দু’বছরে অনেকের যথার্থ সহযোগিতা পাননি বরং অনেকের কাছে পেয়েছেন প্রচণ্ড বিরোধিতা যে কারণে অনেক কাজ বিঘ্নিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনায় প্রো-ভিসি, কোষাধ্যক্ষসহ সকল কর্মকর্তা, নার্স, কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস জরুরি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সুদৃষ্টি এবং সার্বিক সহযোগিতা উন্নয়নের প্রধান প্রেরণা।

আমি ২০১৫ এর ২৪ মার্চ উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। প্রশাসনের পরিবর্তনের সময় স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের স্থবিরতা থাকে। উপর্যুপরি আমার প্রশাসনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি রেজিস্ট্রার এবং প্রো-ভাইস-চ্যান্সেলর (প্রশাসন) ছিল না। এক ধরনের সমন্বয়হীনতা বিরাজ করছিল। জীবনের শ্রেষ্ঠ দায়িত্ব মনে করে আমার ব্যক্তিগত জীবন উপেক্ষা করে সবাইকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের ধারাবাহিকতা এবং ঐতিহ্য ধারণ করে রাত-দিন পরিশ্রম করে সকল ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসি আমি দ্রুততম সময়ের মধ্যে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বন্ধুত্বপূর্ণ কর্মপরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে সকল সেবা, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় উদ্বুদ্ধ হয় সকল শিক্ষক, চিকিত্সক, নার্স, কর্মকর্তা, কর্মচারী ফলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের একটি জায়গা তৈরি হয়। চব্বিশ ঘণ্টা চিকিত্সক উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, সন্ধ্যাকালীন রাউন্ড ও ক্লাসের মাধ্যমে নতুন করে মুখরিত হয় ক্যাম্পাস। টিএসসি-এর সংযোজন শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। দীর্ঘ সময় শিক্ষক চিকিত্সকদের ক্যাম্পাসে থাকা মানেই অধিক চিকিত্সা, অধিক লেখাপড়া।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, চিকিত্সক, কর্মকর্তা, নার্স ও কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আজ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় দেশে-বিদেশে সমাদৃত, মানুষের আস্থা ভরসার স্থল। এ কারণেই গত ডিসেম্বরে বিশ্ব সেরা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত চিকিত্সা এবং গবেষণা কার্যক্রমের জন্য। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে স্পেনের সিমাগো রিসার্চ গ্রুপ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্কপাস পরিচালিত জরিপে দেশে ৫ম এবং বিশ্বে ৬৪০তম অবস্থানে স্থান পায় দেশের একমাত্র এই মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। জরিপে দেখা যায়, ভারতের একটি ইনস্টিটিউট এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে আছে অন্যান্য সকল চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সমগ্র জীবন, ব্যক্তিগত আকাঙ্খা, পারিবারিক জীবন ত্যাগ করে শুধু চেয়েছেন বাঙালির স্বাধীনতা এবং সুখীসমৃদ্ধ জীবন। আমরা যারা তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি আমাদের কোনো ত্যাগ করতে হবে না শুধু আমাদের নিজ নিজ দায়িত্বটুকু যথাযথভাবে পালন করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি। আমরা সবাই মিলে জাতির  পিতার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের মানুষের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানে এবং বিশ্বমানের উচ্চ শিক্ষিত চিকিত্সক তৈরিতে বদ্ধপরিকর- এটাই হোক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২০তম দিবসের অঙ্গীকার।

লেখক :উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]