Saturday, 22 July, 2017, 2:34 AM
Home আন্তর্জাতিক
রক্তনখর ঈগল, না শান্তির পায়রা— ট্রাম্প কোন্টা হতে চান?
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Sunday, 30 April, 2017 at 4:54 PM, Update: 30.04.2017 5:09:02 PM, Count : 24
পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল— এই তিনটি দেশ একযোগে মিসর আক্রমণ করেছিল। জামাল নাসের তখন মিসরের প্রেসিডেন্ট। তার অপরাধ ছিল তিনি সুয়েজ খালের উপর মিসরের হারানো অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই যুদ্ধের ফলাফল সকলেরই জানা, মিসরের প্রতিরোধ এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা নিকিতা ক্রুশ্চভের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করার চরমপত্র পেয়ে আক্রমণকারী তিনটি দেশই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লেজ গুটায় এবং যুদ্ধ বন্ধ করে।

এই সময় একটি ব্রিটিশ দৈনিকেই একটা কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে দেখানো হয়েছিল নখর-দন্তবিহীন বৃদ্ধ ব্রিটিশ সিংহ রণক্ষেত্র থেকে পালাচ্ছে। মিসরে নাসেরের পতন হয়নি। পতন হয়েছিল তত্কালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এন্থনি ইডেনের। সুয়েজ যুদ্ধের আগে কোরিয়া যুদ্ধ। তার মহানায়ক ছিল আমেরিকা। জাতিসংঘের নাম ভাঙিয়ে (কোনো পূর্ব অনুমোদন না নিয়ে) প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের নির্দেশে জেনারেল ম্যাক আর্থার কোরিয়ায় হামলা চালান এবং গর্ব করে বলেছিলেন বড়দিনের ছুটির আগেই কোরিয়াকে শায়েস্তা করে টোকিওর মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ফিরবেন। কিন্তু যুদ্ধে নেমে মার্কিন বাহিনী যখন অনিবার্য পরাজয়ের সম্মুখীন হয় তখন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান হুংকার দিয়েছিলেন, তিনি কোরিয়ার বিরুদ্ধে পরমাণু বোমা ব্যবহার করবেন।

এ কাজটি তিনি জাপানের নাগাসাকি ও হিরোশিমায় করেছিলেন। তখন বিশ্ববাসী আণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ ধ্বংসশক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিল না। কিন্তু প্রথম কোরিয়া যুদ্ধের সময় বিশ্ববাসী সচেতন এবং কোরিয়ায় বোমা হামলা চালাতে গেলে আমেরিকাকে বিশ্বজনমত এবং রাশিয়া ও চীনের যুক্ত প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হতো। ফলে ভারতের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘটিয়ে এবং পালমুনজন চুক্তি করে ট্রুম্যান প্রশাসনকে পরাজয়ের লজ্জা এড়াতে হয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ আমেরিকার জন্য আরো লজ্জাকর। লক্ষ লক্ষ সৈন্য পাঠিয়ে নাপাম বোমা থেকে ভয়াবহ কেমিক্যাল উইপন ব্যবহার করে দেশটিকে গোরস্থানে পরিণত করার পরও আমেরিকা যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি। পরাজয় মেনে ভিয়েতনাম ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। ভিয়েতকঙ গেরিলাদের আক্রমণের ভয়ে দলে দলে মার্কিন সৈন্য হেলিকপ্টারে উঠে পালাচ্ছে— এই ছবি তখন মার্কিন পত্র-পত্রিকাতেই প্রকাশিত হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে, তত্কালীন প্রেসিডেন্ট কেনেডির একটি ভুল সিদ্ধান্তের জন্য আমেরিকাকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িত হয়ে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া হয় না, একজন প্রেসিডেন্টের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য যদি আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িত হয়ে থাকে, তাহলে বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ চলাকালে ভুল সিদ্ধান্তটি পাল্টানো হয়নি কেন?

ভিয়েতনাম যুদ্ধে পরাজয়ের গ্লানি আমেরিকা দীর্ঘকাল ভুলতে পারেনি। মার্কিন প্রশাসন ও জনগণ “ভিয়েতনাম সিনড্রোমে” ভুগছিল। আফগান-যুদ্ধে তাই তারা সরাসরি যুক্ত হয়নি। তালেবান, আলকায়দা ইত্যাদি জঙ্গি ইসলামি গোষ্ঠী তৈরি করে প্রক্সিওয়ার চালিয়েছে। তাতে একটি সেক্যুলার আফগান গভরমেন্টের পতন ঘটানো গেছে, সোভিয়েত লাল ফৌজকেও আফগানিস্তান থেকে হটানো গেছে। কিন্তু আমেরিকা যুদ্ধে জয়ী হয়নি। এখন তাকে যুদ্ধ চালাতে হচ্ছে নিজেদের সৃষ্ট জঙ্গি ইসলামি গোষ্ঠীর সঙ্গে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের দীর্ঘকাল পর জর্জ বুশ সিনিয়রের প্রশাসনের আমলে গালফ যুদ্ধ বাঁধিয়ে প্রেসিডেন্ট সাদ্দামকে শেষ পর্যন্ত হত্যা করা গেছে; কিন্তু সেখানেও ইসলামিক স্টেট নামে এক ভয়ঙ্কর অপশক্তিকে মদদ দিয়ে ঘাঁটি গাড়ার ব্যবস্থা করে দিয়ে সেই অপশক্তির সঙ্গেই আমেরিকা এখন যুদ্ধে লিপ্ত। এই যুদ্ধ সিরিয়া পর্যন্ত ছড়িয়েছে এবং ইউরোপসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে সন্ত্রাসী হামলা ভয়াবহ আকারে দেখা দিয়েছে। হনুমানের লেজে আগুন দেওয়া হয়েছিল তাকে পুড়িয়ে মারার জন্য। সেই আগুনে এখন স্বর্ণলঙ্কাই (ইউরোপ আমেরিকাই) পুড়ছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি আমেরিকাকে বহির্বিশ্ব থেকে সরিয়ে আনবেন। কিন্তু তিনি আফগানিস্তান, সিরিয়া থেকে কোরিয়া পর্যন্ত প্রত্যেকটি যুদ্ধে আরো বেশি করে জড়াতে চলেছেন মনে হয়। কিন্তু জয়ের আশা আছে কি?

ডোনাল্ড ট্রাম্প বর্তমান আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েই তিনি কতো বড় মরদ তা প্রমাণ করার জন্য আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় আকস্মিকভাবে মিসাইল হামলা চালিয়েছেন ও উত্তর-কোরিয়াকে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন এবং মিসাইলবাহী জাহাজ পাঠিয়েছেন। তার কণ্ঠে কড়া হুমকির চড়া সুর শুনে মনে হয়েছিল আরেকটি কোরিয়ান যুদ্ধ এবং একটি পারমাণবিক যুদ্ধ বুঝি আসন্ন। সারা বিশ্বেই একটা ভয়ানক উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। অন্যদিকে চীন এবং রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখায়নি। বরং চীনের প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় সমস্যাটি মোকাবিলা করেছেন এবং দু’পক্ষকেই যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য চাপ দিয়েছেন। প্রমাণ করেছেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মতো তিনি হঠকারী প্রেসিডেন্ট নন। তিনি বর্তমান বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ স্টেটসম্যান।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে বসে তিনি এই পদের উপযুক্ত তা এখনো প্রমাণ করতে পারেননি। বরং তিনি কখন কী করেন, কখন কী বলেন তা নিয়ে আমেরিকার মানুষও উদ্বিগ্ন। কিন্তু তিনি যত কড়া সুরেই কথা বলুন ঠেকায় পড়লে যে তার নরম হতে বেশি সময় লাগে না তার প্রমাণ দিয়েছেন সাম্প্রতিক কোরিয়া সমস্যায়। দু’দিন আগে তিনি যতটা কড়া সুরে ধমক দিয়েছেন, এখন ততটাই নরম সুরে কথা বলছেন। যে চীনকে তিনি দু’দিন আগেও সতর্ক করেছেন, এখন সেই চীনের প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

কথায় বলে ইস্পাত যত তাড়াতাড়ি গরম হয়, তত তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়। কোরিয়া সমস্যায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থা এখন অনেকটা উত্তপ্ত ইস্পাতের মতোই। কেউ কেউ বলছেন, সিরিয়া ও আফগানিস্তানের হাতে পরমাণু অস্ত্র নেই। তাই তিনি সেখানে মিসাইল হামলা চালিয়ে এবং নিরীহ লোকজন হত্যা করে বাহাদুরি দেখাতে পেরেছেন। উত্তর কোরিয়ার হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে, যার একটার পর একটা পরীক্ষা তারা চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে ট্রাম্প সাহেবকেও ঢোক গিলে কথা বলতে হয়।

উত্তর কোরিয়া একটি বিভক্ত দেশ। জন্মাবধি এই কম্যুনিস্ট দেশটিকে আমেরিকার সামরিক হুমকির মুখে থাকতে হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে চলছে অর্থনৈতিক অবরোধ। এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় আমেরিকা সামরিক ঘাঁটি, মিসাইল ঘাঁটি বসিয়ে অতি কাছে গিয়ে সামরিক মহড়া চালিয়ে দেশটিকে মার্কিন আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে। একটি সুপার পাওয়ারের অনবরত হুমকির মুখে উত্তর কোরিয়া যদি আণবিক প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে চায়, তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে কি?

আমেরিকার এই যুদ্ধ চক্রান্ত সম্পর্কে দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষও ক্ষুব্ধ। মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বিরুদ্ধে সিওলে চলছে রাতদিন বিক্ষোভ। তথাপি আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়াকে উত্তর কোরিয়ার কল্পিত আক্রমণ থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার নামে অনবরত দেশটির মাটিতে তার যুদ্ধের ঘাঁটি সম্প্রসারিত করে চলছে। পিয়ংইয়ং এই হুমকির মুখে মাথা নোয়ায়নি। ডোনাল্ড সাহেব এতদিন না জানলেও এই সত্যটা এখন জানেন (কারণ, এখন তিনি প্রতিরক্ষা বিভাগ থেকে ব্রিফিং পান) যে, উত্তর কোরিয়ার হাতে আমেরিকার মতো শক্তিশালী পরমাণু অস্ত্র না থাকলেও যে অস্ত্র আছে তা দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় এমনকি জাপানের মার্কিন ঘাঁটিতেও প্রত্যাঘাত হানতে সে সক্ষম। আর এই প্রত্যাঘাত আমেরিকার জন্য কম বিপর্যয় ঘটাবে না।

তাই তপ্ত মেজাজের মানুষ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মাথা এখন একটু শান্ত হয়েছে। হোয়াইট হাউসে তার একশ দিন পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে তিনি যেসব কথাবার্তা বলেছেন, তাতে যুদ্ধের হুমকি থাকলেও আগের উগ্রতা নেই। তিনি বলেছেন, আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা নিয়ে একটি ‘মেজর ওয়ার’ বেঁধে যেতে পারে। তার পরই বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তিনি সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ সমাধান চান। আরো বলেছেন, আমরা কূটনৈতিক পন্থায় সমস্যা সমাধান করা ভালোবাসি। তবে তা করা কষ্টকর।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখানেই থামেননি। উত্তর কোরিয়ায় ২৭ বছর বয়স্ক নেতা কিম জং-আন সম্পর্কে বলেছেন, ‘তার আশা কিম যুক্তিবাদী হবেন’। দু’দিন আগেও যে চীন সম্পর্কে তিনি কঠোর সমালোচক ছিলেন, এখন সেই চীনের প্রেসিডেন্টের প্রশংসায় তিনি পঞ্চমুখ। বলেছেন, ‘চীনের প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে চেষ্টা করছেন। আমার বিশ্বাস তিনি এই ব্যাপারে আন্তরিক এবং তিনি একটি যুদ্ধ ও মৃত্যু দেখতে চান না। আমি তাকে ভালোভাবে জানতে পেরেছি এবং তিনি একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। তিনি চীনকে এবং চীনের মানুষকে ভালোবাসেন।’

শুধু চীনের প্রেসিডেন্টের প্রশংসা নয়, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ট্রাম্পের মন্ত্রী রেক্স টিলারসন। আগামী সপ্তাহে কংগ্রেসের যে বৈঠক হবে তাতে উত্তর কোরিয়ার উপর শিপিং ও ফাইনান্স সংক্রান্ত নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে অনুমোদন দেওয়া সম্পর্কেও ভোটাভুটি হবে। এককথায় যুদ্ধ দ্বারা নয়, কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি শান্তিপূর্ণ পন্থায় উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বিবাদ মেটাতে ট্রাম্প প্রশাসন এগুবে বলে মনে হয়। যদি এগোয় তাহলে বিশ্ব আরেকটি বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে মুক্ত হবে।

তবে ট্রাম্পের যে বহুমুখী চরিত্র, তাতে একজন শান্তিবাদীর মুখোশ ধারণ করে তিনি একটি যুদ্ধের দিকেই এগুচ্ছেন কিনা তা বলা মুশকিল। যদি তিনি যুদ্ধের দিকে আগান, তাহলে তার পরিণতি কী ঘটবে অতীতের ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। সুয়েজ যুদ্ধে বৃদ্ধ ব্রিটিশ সিংহের পরিণতি সম্পর্কে গল্পটি দিয়ে এই লেখাটা শুরু করেছিলাম। আরেকটি কোরিয়ান যুদ্ধে ভোঁতা নখর মার্কিন ঈগলের ভাগ্যেও তা ঘটতে পারে।

[ লন্ডন, ২৯ এপ্রিল, শনিবার, ২০১৭ ]





« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com