Monday, 18 November, 2019, 7:40 AM
Home জাতীয়
সক্ষমতা অক্ষমতা
অজয় দাশগুপ্ত লিখেছেন সমকালে
Published : Friday, 28 April, 2017 at 3:10 PM, Update: 08.05.2017 9:14:33 AM, Count : 42
১৯৬৮ সালের ১৪ জুলাই ঢাকার নিউমার্কেটের কাছে ছাত্র ইউনিয়নের একটি মিছিলে অকস্মাৎ পুলিশের চড়াও এবং ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক শেখর দত্তকে গ্রেফতার করা হয়। এ মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা জনসাধারণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছিল বন্যার্তদের সহায়তার জন্য। যে যা পারছে, স্বেচ্ছায় ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দিচ্ছিল। সে সময় টেলিভিশন ছিল সরকার নিয়ন্ত্রিত। তারা বিরোধীদের খবর দেয় না। সরকারবিরোধী যে রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি, তাদের খবর প্রকাশ করত দৈনিক সংবাদ, পাকিস্তান অবজারভার ও আজাদ। তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার জনপ্রিয় পত্রিকা ইত্তেফাক আইয়ুব খানের রোষে বন্ধ। পরদিন সংবাদ-এ ছবিসহ ত্রাণ সংগ্রহের মিছিলে পুলিশের হামলার খবর প্রকাশ হয়। এ ধরনের নির্যাতনের খবরে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল করে। সরকার নতিস্বীকারে বাধ্য হয়। আটক ছাত্রনেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
পাকিস্তান আমলে ঝড়-বন্যায় ত্রাণকাজে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন ও অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মীরা দ্রুত এগিয়ে যেতেন। ১৯৬৯ সালের ১৪ এপ্রিল ডেমরার ঘূর্ণিঝড়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত ছাত্রছাত্রী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণকাজ চালিয়েছেন। বড় ধরনের ঝড়-বন্যা হলেই সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে নগদ অর্থ, পুরনো কাপড় এমনকি স্কুল শিক্ষার্থীদের পুরনো বই সংগ্রহ করা ছিল রেওয়াজ। ১৯৭৪ সালের বন্যার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের একাধিক ত্রাণ দল রিলিফসামগ্রী নিয়ে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাটে ট্রেন থেকে নেমে জানতে পারে- নদী উত্তাল, তাই ফেরি ছাড়বে না। ছাত্ররা ঢাকা ফিরে না এসে ছোট ছোট নৌকায় প্রমত্ত যমুনা পাড়ি দিয়ে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় পেঁৗছে যায়। ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের বন্যার সময় ছিল এইচএম এরশাদের দুঃশাসনের আমল। যুব ইউনিয়ন নামের একটি সংগঠন ওই সময়ে ১০ লাখ প্যাকেট খাবার স্যালাইন তৈরি করে বিনামূল্যে বিতরণ করেছিল। এ উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে এগিয়ে এসেছিল পাঁচ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৮৭ সালে ছিলেন সংসদে বিরোধী দলের নেতা ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। তিনি ছাত্রলীগের একদল কর্মীকে যুব ইউনিয়নের খাবার স্যালাইন তৈরির প্রকল্পে স্বেচ্ছাশ্রম দিতে পাঠিয়েছিলেন। পরের বছর বন্যার সময় ছাত্রলীগ কর্মীরা নিজেরাই এ ধরনের প্রকল্প চালু করেছিল। ১৯৯৮ সালের প্রবল বন্যার সময়েও আমরা এ ধরনের অনেক মানবিক উদ্যোগ দেখেছি।
অতীতে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় ছিল- বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে সরকার বিশ্ববাসীর কাছে রিলিফের জন্য আবেদন জানাত। তাতে সাড়াও মিলত। বিমানবন্দরে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ত্রাণ সাহায্য গ্রহণ করার জন্য মন্ত্রী ও পদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতেন। ১৯৮৮ সালের বন্যার পরপর রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদ ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁকে ঢাকা নিয়ে এসে জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল- বন্যা নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সের কাছ থেকে ঋণ-অনুদান লাভ।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে ঝড়-বন্যায় বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিওগুলোর ত্রাণ তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো কোনো সংস্থা সে সময়ে সরকারের সমান্তরাল ত্রাণকাজ পরিচালনা করত। তাদের অভিযোগ ছিল, সরকারি ত্রাণকাজে প্রচুর দুর্নীতি-অনিয়ম। কিন্তু এনজিওগুলো ফুলের মতো পবিত্র। এসব সংস্থার হাতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ত্রাণকাজের জন্য নগদ অর্থ ও বিভিন্ন সামগ্রী তুলে দিত। সরকার বিষয়টিকে যে খুব পছন্দ করত তা নয়। কিন্তু অসহায়ের মতো সহ্য করা ছাড়া তাদের কিছু করার ছিল না। 'সাহায্যদাতা' বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য সংস্থা এবং আমেরিকা ও অন্যান্য প্রভাবশালী দেশ যে এটাই চাইছে- এনজিওগুলোর কাজে সরকারকে সব ধরনের সহায়তা দিতে হবে।
কিন্তু সময় পাল্টে গেছে। এখন ঝড়-বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে সরকার বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে রিলিফের জন্য আবেদন জানায় না। আমাদের নিজেদের সক্ষমতা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ধনবান ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নগদ অর্থ ও বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী হস্তান্তর করেন। এতে সরকারের ত্রাণকাজ সহজ হয়, তাতে সন্দেহ নেই। তবে এখন আর এনজিওদের ঢাকঢোল পেটানো ত্রাণ তৎপরতা নেই। এ ধরনের সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরা সংবাদ সম্মেলন ডেকে সরকারের ত্রাণকাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে। সন্দেহ নেই যে, সরকারের ত্রাণকাজে অনিয়ম-দুর্নীতি-দায়িত্বহীনতা থাকে এবং তা তুলে ধরাও প্রয়োজন। কিন্তু বিশ্বব্যাপী পরিচিত বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় এনজিওগুলো কেন ত্রাণকাজ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিল, সেটা নিয়ে কিন্তু ভালো গবেষণা হতে পারে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের ত্রাণ তৎপরতাতেও দারুণ ভাটা। এখন আর ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহের জন্য ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যায় না। রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও তেমন দেখা যায় না দুর্গত এলাকায়। যখন যে দল ক্ষমতায়, তারা ত্রাণকাজে যায় মন্ত্রীদের সঙ্গে। সরকারি ত্রাণকাজে শরিক হওয়াই তাদের প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। এ ধরনের ত্রাণকাজের আরেকটি সুবিধা- টেলিভিশনে প্রচার।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হচ্ছে। এটা অগ্রগতি। কিন্তু নাগরিক সমাজ, এনজিও এবং রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ত্রাণকাজে কেন ভাটা? কেন এ ক্ষেত্রে এত নিরুৎসাহ বা উদাসীনতা?
[email protected]









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: [email protected], বার্তা বিভাগ: [email protected]