Sunday, 19 November, 2017, 3:29 AM
Home
প্রশাসন ‘ফেসলেস’ হবে, ‘হার্টলেস’ নয়
মোফাজ্জল করিম লিখেছেন কালেরকন্ঠে
Published : Friday, 28 April, 2017 at 3:10 PM, Count : 58
২৩ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ—এই চার দিন হাকালুকিপারে আমাদের গ্রামের বাড়িতে কাটিয়ে এসে ‘গ্রাম থেকে ফিরে’ শিরোনামে এই কলামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। নিবন্ধটি ছাপা হয় ৩১ মার্চ শুক্রবার। শুরুতেই বিশবর্গমাইল আয়তনের হাকালুকি হাওরের সামান্য বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছিলাম : এই শুকনো মওসুমে আমাদের বাড়ির মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে পুব দিকে তাকালে ওপরে সীমাহীন আকাশ আর নিচে শুধু মাঠ আর মাঠ। মাঠের বুকজুড়ে মাইলের পর মাইল বোরো ধানের ক্ষেত। যেন ধূসর আকাশের গম্বুজটির প্রান্তছোঁয়া এক দিগন্তবিস্তৃত সবুজ গালিচা। এই ধানের কাব্য গানের কাব্য শেষ হলে বর্ষায় হাকালুকির আরেক রূপ। সে তখন প্রমত্ত এক মিনি বঙ্গোপসাগর। উথাল-পাথাল তার ঢেউ। তখন যে দিকে চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। যে পানি থেকে আহরণ করা হয় লক্ষ-কোটি টাকার মত্স্যসম্পদ। ...

হায়, জানি না কী কুক্ষণে না এই ধানের কাব্যের কথা পাঠকদের শুনিয়েছিলাম। লেখাটি পত্রিকায় পাঠানোর পরে পরেই বাড়ি থেকে আমার প্রবাসী ভাতিজা—যার বিয়ে উপলক্ষে গ্রামে গিয়েছিলাম—ফোন করে জানাল : চাচা, দুঃসংবাদ। এক রাতে পাহাড়ি পানির ঢল নেমে সমস্ত হাওর ডুবে গেছে। কোথাও ধানের একটা পাতাও দেখা যায় না। আগে যেখানে শুধু সবুজ ধান আর ধান দেখে গেছেন, সেখানে এখন শুধু সাদা পানি আর পানি। পানি বাড়ির সামনের পুকুর ডুবিয়ে মসজিদের প্রটেকশন ওয়ালে এসে লেগে গেছে। শুনে কিছুতেই নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এবার সমস্ত হাওর এলাকায় নাকি বাম্পার ফলন হয়েছিল। যখন বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই তখন মনে হচ্ছিল, সবুজ ধানের গাছগুলো যেন পড়ন্ত বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাসে দুলে দুলে আমাকে বিদায় সম্ভাষণ জানাচ্ছে। ওরা যেন ধানগাছ নয়, যেন আমার বেরকুড়ি-খামাউরা-শশারকান্দি-শাহমীর-নয়াগাঁওয়ের সব শিশু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হেসে হেসে হাত নেড়ে তাদের দাদাকে/চাচাকে বিদায় জানাচ্ছে : খোদা হাফেজ। আবার আসবেন কিন্তু শিগগির। ... এক কালরাত্রির করাল ছায়া অকস্মাৎ নেমে এসে তাদের মুখের হাসিটুকু কেড়ে নিয়ে এঁকে দিল দুঃস্বপ্নের বিভীষিকাময় ছবি।

এরপর পত্র-পত্রিকায়, টেলিভিশনের পর্দায় গত কয়েক দিন ধরে আমরা রোজ দেখছি সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বন্যা উপদ্রুত এলাকার সচিত্র বিবরণ। হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, মরে সাফ হয়ে গেছে গৃহপালিত হাঁস, হাওরের মাছ। হাওরাঞ্চলের মানুষের বলতে গেলে একমাত্র ফসল বোরো ধান। আবহমানকাল ধরে এই বোরো ধান এলাকার মানুষের অন্ন জোগায়। সেই ধান হারিয়ে মানুষগুলো মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে সর্বগ্রাসী বন্যার অথৈ পানির দিকে শূন্য দৃষ্টি মেলে—এই দৃশ্য এখন টিভির পর্দায় ভেসে উঠছে প্রতিদিন।

২.

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। বন্যায় ফসলহানি ভাটি অঞ্চলে নতুন কোনো বিষয় নয়। উত্তরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে প্রতি বছরই পানি এসে ডুবিয়ে দেয় সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের হাওরাঞ্চল। তখন চারদিকে শুধু পানি আর পানি। যতদিন পানি শুকিয়ে গিয়ে রাস্তাঘাট ভেসে না ওঠে ততদিন ওইসব এলাকার প্রধান বাহন নৌকা। কৃষকের তখন এক প্রকার কর্মহীন বেকার জীবন। তবে পাহাড় থেকে পানি নেমে এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হবার আগেই বোরো ধান পেকে যায়। চাষীর মুখে হাসি ফোটে। পাকা ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যায় সে। ক্বচিৎ কোনো কোনো বছর ধান কাটা শুরু হতে না হতেই এসে পড়ে পানি। তবে তা হঠাৎ বাড়িতে ডাকাত পড়ার মত নয়। পানি বাড়তে থাকে আস্তে আস্তে। আর পানি বাড়ার সাথে পাল্লা দিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করে পাকা ধান ঘরে তোলে কৃষক। কিন্তু এবারের মত অকাল বন্যা, বিশেষ করে রাতের অন্ধকারে সন্ত্রাসী দখলদারের মত হুড়মুড় করে এসে শতকরা এক শ ভাগ ফসল গ্রাস করে নেওয়া নিকট অতীতে কেউ দেখেছে বলে মনে হয় না।

ধান বিনষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবার আরেকটি নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। পানি দূষিত হয়ে পড়েছে মারাত্মকভাবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সেই দূষিত পানিতে মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া ইত্যাদি জলজ প্রাণী ঝাঁকে ঝাঁকে মরে ভেসে উঠছে। হাওরের পারের প্রায় প্রতিটি পরিবারের আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উত্স হাঁসপালন। অনেকে আজকাল হাঁসের খামারও গড়ে তুলেছেন। এসব হাঁস যখন ঝাঁক বেঁধে হাওরের পানিতে ভেসে বেড়ায় তখন দেখতে ভারি সুন্দর লাগে। এবারের বন্যার দূষিত পানির কারণে মাছের মড়কের পাশাপাশি হাঁসের মড়ক লেগে হাজার হাজার হাঁস মারা গেছে। আর দূষিত পানি, মৃত মাছ, হাঁস, পচা লতাগুল্ম ও জলজ উদ্ভিদ, দুর্গন্ধময় ভারি বাতাস হাওরাঞ্চলের শত শত গ্রামের পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। একে ঘরে নেই খাবার, হাতে নেই টাকা-পয়সা, সেই সঙ্গে পরিবার-পরিজনের রোগবালাই, হতদরিদ্র ভাটি অঞ্চলের কৃষককে, অনুমান করতে পারি, পাগল করে তুলেছে।

৩.

এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলার আবহমানকালের সংস্কৃতি হচ্ছে একের বিপদে অপরের এগিয়ে আসা। কেউ দেয় এক কাঠা ধান, কেউ দু’টো শাকসব্জি, কেউ বা দশটা টাকা। দুর্যোগের সময় ক্ষুধার্ত, অভাবী মানুষের কাছে সেটা বিরাট কিছু। এ ছাড়া বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ইত্যাদিও দল বেঁধে নেমে পড়ে ত্রাণ তত্পরতায়। এভাবে দুর্যোগ মোকাবেলা ও ত্রাণ তত্পরতায় অন্যান্য দেশের জন্য বাংলাদেশ তো এখন একটি অনুকরণীয় মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু? কিন্তু এবার আমরা কী দেখতে পেলাম? আজ (২৫.০৪.১৭) পর্যন্ত একজন মন্ত্রী-মিনিস্টারেরও পদধূলি (থুক্কু, পাদুকাধূলি। খালি পায়ে ওসব নোংরার মাঝে গিয়ে নামবেন নাকি তাঁরা!) পড়েনি উপদ্রুত এলাকায়। বিশ্বাস হয়? এলাকার তথাকথিত কোনো জনপ্রতিনিধি, কোনো আতি নেতা-পাতি নেতাকেও বড় একটা দেখা যায়নি ওই এলাকার মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে। (আমার এক বন্ধু গুমর ফাঁক করার মত করে বললেন, ‘হয়ত টিভি ক্যামেরা ম্যানেজ করা যাচ্ছে না’!) এ ব্যাপারে শেষ পর্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন উপদ্রুত এলাকায় যেতে। অন্য মন্ত্রী ও এমপিরা আশা করা যায় এবার ছোটাছুটি শুরু করবেন। তবে আমাদের কথা হলো, সব ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে নির্দেশ দিতে হবে কেন? তাঁকে কেন বারবার আপনাদের কানে পানি দিয়ে সজাগ করতে হবে? আপনারা কি আপনাদের মৌলিক দায়িত্বটুকু পালনের জন্যও সব সময় ‘বসের’ নির্দেশের অপেক্ষায় থাকবেন? আর হাওরের গার্জিয়ান যে হাওর উন্নয়ন বোর্ড, তার মহাপরিচালক-পরিচালকগণসহ ১২/১৪ জনের একটি দল এখন নাকি সরকারি সফরে কানাডায়। তারা কি ওই দেশের বন্যাপরিস্থিতি সামাল দিতে ‘হায়ারে’ খেলতে গেছেন? দেশবাসী জানতে চায়।

কিন্তু বলুন তো, সুনামগঞ্জের সেই অখ্যাত অবজ্ঞাত পল্লী এলাকার একটি ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা মেম্বার মনেছা বেগমকে কে নির্দেশ দিয়েছিল শত শত গ্রামবাসীকে সংগঠিত করে রাতদিন অমানুষিক পরিশ্রম করে বাঁধের ভাঙ্গন ঠেকানোর চেষ্টা করতে? ওই সামান্য মহিলাটি যে অসামান্য দায়িত্ববোধ ও জনসেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, আসুন, তাঁর থেকে আমরা সবাই শিক্ষা গ্রহণ করি। তিনি অবশ্যই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিদার। ইংরেজিতে ‘দ্য রিয়েল হিরো’ বা সত্যিকারের বীর বলে যে একটা কথা আছে, মনেছা বেগমরা সেই ‘রিয়েল হিরো’। স্যালুট তোমাকে বোন।

হ্যাঁ, আরেক সোজা-সাপ্টা মানুষও তাঁর রাষ্ট্রীয় অবস্থান, প্রটোকল, নিরাপত্তা ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে ছুটে গেছেন বন্যাকবলিত এলাকায়। তিনি আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ। তিনি তো আগামী নির্বাচনে ভোটে দাঁড়াবেন না, ত্রাণ কাজে নেমে পড়াও তাঁর দায়িত্ব নয়, তবুও তিনি গেছেন। গিয়ে হাজার হাজার গরিব-গুর্বো মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তাঁকে আমাদের সকৃতজ্ঞ সালাম।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, এনজিও, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-উপদলের তত্পরতাও এবার চোখে পড়ছে না। কেইসটা কী? তাহলে কি স্বেচ্ছাসেবাদানের কালচার দেশ থেকে উঠে যাচ্ছে?

আচ্ছা, আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, ঢাকা থেকে যে ভিআইপি সুনামগঞ্জ গিয়ে আসর গরম করেছেন এবং যাঁর কথা উল্লেখ না করলে এবারের দুর্যোগের কোনো আলোচনাই পূর্ণতা পায় না, আমি এখনো তাঁর কথা বলিনি। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, আমি আমাদের মাননীয় ত্রাণসচিব জনাব শাহ কামালের কথাই বলছি। তাঁর কাছে উপদ্রুত এলাকাবাসীর দাবি ছিল তাদের এলাকাকে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হোক। জবাবে জনাব সচিব যা বললেন তার সারমর্ম হচ্ছে, বর্তমান প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উপদ্রুত এলাকায় যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে তাতে এলাকাটিকে ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণা করা যায় না। একটি এলাকার কমপক্ষে অর্ধেক লোক মারা গেলে নাকি সেই এলাকাকে দুর্গত এলাকা বলে ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ সুনামগঞ্জ জেলার ২৫ লক্ষ লোকের, আল্লাহ না করুন, সাড়ে ১২ লক্ষ মারা গেলে সুনামগঞ্জের কপালে ‘দুর্গত এলাকার’ তকমা জুটবে। অতএব, হে কাদম্বিনীগণ, শুধু আপনাদের শুধু মাছ-হাঁসই নয়, আপনারাও লাখে লাখে মরে প্রমাণ করুন আপনাদের এলাকা দুর্গত এলাকা। (মরি, মরি!) হ্যাঁ, সচিব সাহেব হয়ত ব্রিটিশ আমলের প্রণীত ‘ফেমিন কোড’ (দুর্ভিক্ষ সংহিতা বা নীতিমালা)-এর নিরিখে এরূপ উক্তি করেছেন, কিন্তু তাতে যে ওই এলাকার মানুষের কলজে ছিঁড়ে গেল তা কি তিনি ভেবে দেখেছেন? আপনি ওখানে গিয়েছেন মানুষকে সমবেদনা জানাতে, শক্তি-সাহস জোগাতে, সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়াতে, দুর্গত এলাকা কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী, সে বিষয়ে ক্লাস নিতে নয়। নিঃসন্দেহে ওই মুহূর্তে এলাকাবাসীর কাছে এটা একটা নির্মম রসিকতাই মনে হয়েছে। সরকার দুর্গত এলাকা ঘোষণা করবে না, না করুক, সরকারের ক্ষমতা আছে সাদাকে কালো, কালোকে সাদা বলার; কিন্তু তাই বলে মরণোন্মুখ মানুষগুলোর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেবার ক্ষমতা আপনাকে কে দিল?

১৯৬৬ সালে সিলেট শহরে একবার ১২/১৪ দিন লাগাতার বৃষ্টি হওয়ার পর (ক্যাটস্ অ্যান্ড ডগস্ নয়, একেবারে এলিফেন্টস অ্যান্ড লায়নস) হঠাৎ একদিন শেষ রাতে শহরে পানি ঢুকল সুরমা নদী উথলে উঠে। শহরের বিভিন্ন এলাকার ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ল। গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধিদল একটা কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাতে গেল তত্কালীন ডিসি সাহেবের কাছে। ডিসি ছাত্রজীবনে ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। মাঠ প্রশাসনেও সেই পাণ্ডিত্য ফলাতে তিনি ইতস্তত করতেন না। তিনি বিপন্ন নগরবাসীকে বললেন, এটা ফ্লাড নয়, ‘ইনানডেশন’। ভয়ের কিছু নেই। বাড়ি যান। এ পানি শিগগিরই নেমে যাবে। প্রতিনিধিদল নাকি বিফলমনোরথ হয়ে সোজা যান টেলিগ্রাম অফিসে সরকারের কাছে ডজন ডজন তারবার্তা পাঠাতে এই ‘পণ্ডিত’ ডিসির হাত থেকে তাঁদের রক্ষা করার জন্য। এরপর পানি ঠিকই নেমে গেল শিগগিরই, সেই সঙ্গে ডিসিও!

প্রশাসকদের শেখানো হয়, কাজে-কর্মে ‘ফেসলেস’ থেকো, অর্থাৎ কোনো কাজে নিজেকে জাহির করতে যেয়ো না, নিজের আত্মপরিচয়টাকে বড় করে তুলে ধোরো না। কোনো দল, গোষ্ঠী বা মতকে মনে মনে সমর্থন করলেও প্রকাশ্যে ঘুণাক্ষরেও তা বুঝতে দেবে না। কোনো ভালো কাজে কেউ তোমার ভূমিকার প্রশংসা করলে শুধু বলো—‘আই হ্যাভ অনলি ডান মাই ডিউটি’, আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করেছি, ব্যস, ওই পর্যন্তই। এটাই ‘ফেসলেসনেস অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’। এ কারণেই সরকারি সিদ্ধান্ত কোন পর্যায়ে গৃহীত হয়, তা-ও বাইরের লোককে জানতে দেওয়া হয় না। সরকারি চিঠির ভাষাও তা-ই হয় এ রকম : নিম্নস্বাক্ষরকারী আদিষ্ট হয়ে জানাইতেছেন যে ...।

কিন্তু ‘ফেসলেস’ মানে ‘হার্টলেস’ নয়। সরকারি কর্মচারী/কর্মকর্তার যদি মানবিক গুণই না থাকে, একটি সংবেদনশীল মনই না থাকে, তবে তিনি কাকে সেবা দেবেন, কিভাবে দেবেন? (অবশ্য আদৌ যদি সেবা দেবার ইচ্ছা থাকে তাঁর!)

৪.

যে কোনো দুর্যোগ মোকাবেলা বা রাষ্ট্রীয় বিপর্যয়ের কালে (জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের উত্থান উল্লেখ্য) দলমত-নির্বিশেষে সবার সঙ্গে আলোচনায় না বসাটাই যেন সরকারের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার হয়ত মনে করে এতে তাদের এক ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। অথবা এও হয়ত ভাবে, অন্য কেউ কৃতিত্ব নিয়ে নেবে। কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এতে সত্যতা যদি থাকেও, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এটা ক্ষতিকর। এতে করে কখনো বড় রকমের কোনো দুর্যোগ বা বিপর্যয় (যেমন যুদ্ধ-বিগ্রহ) দেখা দিলে তখন ডাকলেও যদি কেউ সাড়া না দেয়, তা হলে কী হবে? রাজনীতির এই অপসংস্কৃতিও হাল আমলের সৃষ্টি। অতীতে যে কোনো ক্রাইসিস মোকাবেলায় আলাপ-আলোচনার আশ্রয় নেওয়া হতো, সকলের মতামত শোনা হতো, জাতিও জানতে পারত কে কী বলতে চান। আর এখন? এখন মুখে-পেটে সবখানেই নিম-নিশিন্দা।

৫.

শেষ করতে চাই কয়েকটি প্রস্তাব রেখে : ক. ভারতের যেসব পাহাড় থেকে প্রতি বছর পানি নামে তাদের পাদদেশে বাংলাদেশ অঞ্চলে বড় বড় জলাধার নির্মাণ করে বর্ষায় বন্যা প্রতিরোধ ও পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। সেই পানি শুকনো মওসুমে জলসেচের কাজে ব্যবহার করা যাবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীর সঙ্গে আলাপ করতে হবে। খ. সংরক্ষিত বিল ও তত্সন্নিহিত এলাকায় সাধারণ মানুষকে মত্স্য আহরণের সুবিধা প্রদান করতে হবে। গ. আগামী এক বছরের জন্য বন্যাকবলিত এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করে বিশেষ কৃষি, মত্স্য ও ত্রাণ কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। ঘ. বাঁধ নির্মাণে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর দুর্নীতি প্রমাণিত হবে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। ঙ. এক মগ বা এক বালতি পানি তুলে নৌকায় বসে পরীক্ষাকাজ শেষ করে অনুচিত দ্রুততার সঙ্গে রায় দিয়ে ‘অমুক পদার্থের কারণে পানি দূষিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি’ না বলে আরও বিশদ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। সেই লক্ষ্যে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, আণবিক শক্তি কমিশন, মত্স্য গবেষণা ইন্সটিটিউট, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে। তারা ভারতের ইউরেনিয়াম ডিপোজিটগুলোও পরিদর্শন করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবেন।

আবারও বলি, হাওরাঞ্চলের বিপন্ন মানুষের দিকে মানবিক দৃষ্টিতে তাকান। কোনটা ‘ফ্লাড’, আর কোনটা ‘ইনানডেশন’ তা বোঝাতে গেলে ফ্লাডও যাবে, আর সেই সঙ্গে আপনার বা আপনাদেরও খোদা হাফেয হয়ে যাবে।



লেখক : সাবেক সচিব, কবি

mkarim06@yahoo.com









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com