Saturday, 22 July, 2017, 2:41 AM
Home
এক অটিস্টিক কিশোরী কী বলছে শুনুন
স্বপ্না রেজা  লিখেছেন যুগান্তরে
Published : Thursday, 27 April, 2017 at 1:35 PM, Count : 95
কষ্ট যে পায়, জীবন যার বিপন্ন হয়, সে-ই সাক্ষী। একাত্তরের আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, নিরস্ত্র বাঙালির শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার হাজারো গল্প, স্বাধীনতা অর্জন ইত্যাদির পেছনে মূলমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল মাটি ও জাতির অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি। বিষয়টিতে প্রতিটি ইনডিভিজুয়ালেরই অস্তিত্ব রক্ষার প্রেরণা নিহিত ছিল। জাতির ভেতরই তো আমি, আপনি কিংবা সে। প্রতিটি স্বতন্ত্র ব্যক্তির চাহিদাই একদিন সমষ্টির চাহিদায় পরিণত হয়, সমষ্টির দাবিতে পরিণত হয়। সভ্যতা আর সামাজিকতার উৎস, শেকড়, বিস্তার, সুরক্ষা ইত্যাদি যাই বলি কেন, মানবজীবনে সভ্যতা বা সামাজিকতা নিত্যব্যবহার্য একটি অলঙ্কার। এই অলঙ্কারে অলঙ্কৃত হয়ে সবাই নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, প্রমাণ করতে চায়। এ প্রতিষ্ঠা, প্রমাণের জন্য তাকে যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়। যুদ্ধ হয় শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক। সোজাসাপ্টা, অস্তিত্ব রক্ষায় মানুষ সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এটা মানবজীবনের সূত্র। এটি একটি ধারাবাহিক চলমান প্রক্রিয়ায় সক্রিয় এবং এই প্রক্রিয়া কোনো জোরশক্তি দ্বারা ব্যাহত করা সম্ভব হয় না, হয়নিও। ইতিহাস তাই বলে।
বেশ সংবেদনশীল জাতি আমরা। আবেগটাও কিন্তু বেশ। আর তাই বলেই না আমরা কষ্টে শব্দ করি, প্রতিবাদী হই। কষ্ট থেকে পরিত্রাণ পেতে মরিয়া হই, রুখে দাঁড়াই। অন্যের দুখে, অন্যের চোখের জলে নিজের দুঃখ খুঁজে পাই, নিজের চোখ ভেজাই, সবাই মিলেমিশে একাকার হই। এক হই। যেমন একাত্তরে দেশকে শত্রুমুক্ত করে দেশটাকে স্বাধীন করেছি, স্বৈরতন্ত্রকে হঠিয়েছি। আরও কত কী বিজয়ের ইতিহাস রয়েছে আমাদের! কখনও কোনো কোনো ব্যর্থতার গ্লানি যখন মন পোড়ায়, মন কাঁদায় তখন আমরা সেই সব ইতিহাস পানে মুখ রেখে আশ্বস্ত হই, স্বস্তি খুঁজে আবারও জেগে উঠতে প্রাণ পাই। ন্যায় আর ন্যায্যতার আপসহীন দাবি আদায়ে অসম্ভবকে সম্ভব করতে কত না ঘটনাই ঘটিয়েছি আমরা। সম্প্রতি মনে রাখার মতো, মনে থাকার মতো, অপরকে মনে করিয়ে দেয়ার মতো, ইতিহাস হওয়ার মতো এমন দুটি ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও সেই সত্য আমরা দেখতে পেলাম। সেই সত্যই যেন প্রমাণ হল। আমি কিশোরী শারমিন আক্তার ও সোনিয়া আক্তারের কথা বলছি, যারা সম্প্রতি নিজেরাই তাদের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছে। কিছুদিন আগেই তাদের বয়সী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, সুরক্ষার জন্য মাথা ঘামিয়ে সংসদে পাস হয়েছে বিশেষ ধারা নিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিলটি। বিশেষ ধারার খসড়াতে কন্যাশিশুর আরও বিপর্যয় হওয়ার শঙ্কা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক, ক্ষোভ, সংশয় দেখা দিয়েছে, পুনর্বিবেচনার দাবিও উঠেছে, লাভ হয়নি। বাস্তবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে বিলটির গলায় বিজয়ের মালা পরানো হয়েছে। আসলে বিল নয়, কণ্ঠভোটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী জয়ী হয়েছেন, পাস করেছেন এবং নিজেদের দেয়া মার্কসে তারা যেন জিপিএ-৫ পেয়েছেন, আঙুলের ভি সূচক দেখিয়েছেন। শিক্ষা আর বোধের গুণগতমান যাই হোক না কেন। আর তারই সূত্র ধরে সম্প্রতি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম, একজন কিশোরী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর কিশোরীর ভবিষ্যৎ, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, খেয়েপরে বেঁচে থাকবার মহৎ(!) ভাবনায় সেই ধর্ষকের সঙ্গেই বিয়ে দেয়া হয়েছে। বিল প্রণয়নকারীদের কাছে খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, আপনারা তো অসহায় কিশোরীদের এমনই ধর্ষক শ্রেণীর অভিভাবকত্ব পেতে চাইছিলেন, তাই না? কিন্তু এখানে যে ধর্ষণ করে ধর্ষকের বিয়ে করার বিঘ্নহীন সুযোগটা স্বীকৃত হয়ে গেল, বুঝলাম কি আমরা? এখন থেকে তো পুরুষ তার আকাক্সিক্ষত কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করতে চাইবে, নোংরা প্রস্তাব দেবে, বিয়ের প্রস্তাব দেবে নিঃসংকোচে, নির্বিঘ্নে। তাদের জন্য ধর্ষণ তো একটি বড় হাতিয়ার হয়ে গেল, নয় কী? কারণ ওটা করেই তো অপরাধী পুরুষরা লক্ষ্যে পৌঁছতে চাইবে। ধিক্। যেসব ব্যবস্থাপক এ ঘটনায় ভালো কিছু করেছেন বলে ভাবছেন, দাবি করছেন, তারা মূলত অর্বাচীনের অন্য সংস্করণ। পোশাকে সহজে এদের চেনা যায় না।
আজকের লেখার মূল প্রতিপাদ্য বা উদ্দেশ্য ছিল, এই বৈরিতার মধ্যে ফুঁসে ওঠা, প্রতিবাদী হয়ে ওঠা দুই কিশোরীর গল্প বিবেকবর্জিত নির্বোধের কানে গুনগুনিয়ে বাজিয়ে শোনানো। ঝালকাঠির স্কুলছাত্রী শারমিন আক্তার ও ত্রিশাল উপজেলার উজানপাড়ার মাদ্রাসাছাত্রী সোনিয়া আক্তার নিজেরাই নিজেদের বাল্যবিবাহ ঠেকাল। কী হল? অনেক কিছুই হল। বিশেষ ধারার বাল্যবিবাহ নিরোধ বিল ছাড়া, পেশিশক্তি ছাড়া, অস্ত্র ছাড়া, রাজনৈতিক পারিবারিক পরিচিতি ছাড়া, সম্পূর্ণ নিজেদের বুদ্ধিমত্তায়, সাহসিকতায় এবং সমাজের কিছু দায়িত্বশীল বোধসম্পন্ন মানুষের সহায়তায় তারা তাদের রক্ষা করল। বাল্যবিবাহ নামক নারীর অস্তিত্ব ধ্বংসকারী এক ক্রনিক্যাল অস্বস্তিকর অব্যবস্থা থেকে কৈশোরের উচ্ছলতা রক্ষা করল, জীবনের প্রদীপ জ্বালবার সাহস দেখাল। অসাধারণ! অভিনন্দন শারমিন ও সোনিয়া! চিৎকার করে বলছি, মেয়েরা শোনো! আমার দু’চোখ আনন্দে ভরে উঠছে! ভয় হারিয়ে গেছে। আমার, আমাদের ভীতু হওয়ার আশঙ্কাকে তোমরা গুঁড়িয়ে দিয়েছ! মাগো, বিপ্লব এভাবেই সূচিত হয় কোনো একটি জায়গা থেকেই। তারপর তা সংক্রমিত হয়, সঞ্চারিত হয়, সম্প্রসারিত হয়। তোমরা বিশেষ ধারার বাল্যবিবাহ নিরোধ বিলকে দেখিয়ে দিলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে। আমার বিশ্বাস, কিশোরীরাই একদিন তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে সক্ষম হবে সর্বক্ষেত্রে।
কৃত্রিম ভাবনা থেকে নয়, বরং শারমিন আর সোনিয়ার জীবনরক্ষার বাস্তব ঘটনার সচিত্র তথ্য দেশের প্রতিটি আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেয়া জরুরি। প্রচার মাধ্যম, সরকার, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা দরকার। প্রত্যেক কিশোরী যদি নিজের জীবন সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, নিজের অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়, তাহলে বাল্যবিবাহ নিরোধ বিলের দরকার হয় না। বিশেষ বিবেচনার অজুহাতে পুরুষতান্ত্রিক মনমানসিকতায় কন্যাশিশুদের প্রতি করুণার পথও আর থাকে না। পরিশেষে একটি সত্য গল্প দিয়ে লেখা শেষ করব। বিশেষ ধারাসংবলিত বাল্যবিবাহ নিরোধ বিলের সংবাদ পত্রিকার পাতায় পড়ে একজন অটিস্টিক কিশোরী তার মাকে ভীতু কণ্ঠে বলে উঠলেন, মা! আর দু’মাস পরেই তো আমার আঠারো বছর! আমার বিয়ে হয়ে যাবে! তোমরা কি আমার বিয়ে দিয়ে দেবে? আমার কী হবে মা?
আসুন এই প্রশ্নের উত্তর আমরা বিল প্রণয়নকারীদের কাছ থেকে নিই।
স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com