Saturday, 22 July, 2017, 2:42 AM
Home
পর্যটনমন্ত্রী কখনও বালি গিয়েছিলেন কি?
মাহবুব কামাল লিখেছেন যুগান্তরে
Published : Thursday, 27 April, 2017 at 1:35 PM, Count : 112
বছর ত্রিশেক আগে বন্ধু টুটুল রায়ের কাছে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীর দু’-একটি বিশেষ অধ্যায় জানতে চেয়েছিলাম। সে আমাকে বলেছিল- শোন্, এভাবে শেখার চেয়ে একটা কাজ র্ক। কোনো কিছু যখন শিখতে চাইবি, আনন্দ মিশিয়ে শিখবি, তাইলে চিরদিন মনে থাকবে। বালি যা। সেখানে দেখবি রাস্তার এখানে-সেখানে হিন্দু পুরাণের চরিত্রগুলোর বিশাল বিশাল মূর্তি আর অসংখ্য মন্দির। গাইডের কাছ থেকে মূর্তিগুলো সম্পর্কে জ্ঞান নিবি আর মন্দিরগুলোর ব্যুৎপত্তি জানবি। দেখবি তুই হিন্দু মিথলোজির মাস্টার বনে গেছিস।

টুটুলের মুখ থেকে ‘বালি’ উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনটি অপার সুন্দর চিত্রকল্প ভেসে উঠেছিল আমার চোখের সামনে। কিশোর কুমারের চার স্ত্রীর অন্যতম আবেদনময়ী হিসেবে ব্রান্ডেড যোগিতা বালি, বালি হাঁস, আরেকটি ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপরানী বালি। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘের মতো পুঞ্জ পুঞ্জ দ্বীপের সমাহার ইন্দোনেশিয়া। আর ভারত মহাসাগর ও বালি সাগর পরিবেষ্টিত পৌনে ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রদেশ বালি সেই অসংখ্য দ্বীপেরই এক মনোহর দ্বীপাঞ্চল। আরব দেশের বিজয়ী ধর্মপ্রচারকরা ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশ করার পর দেশটির হিন্দুদের ব্যাপকহারে ধর্মান্তরিত করেছিল বলে এটি এখন সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র; কিন্তু সমুদ্রের দুর্গম জলপথ অনতিক্রম্য ছিল বলেই হয়তো বালি ছিল তাদের চোখের আড়ালে। বর্তমানে তাই বালির ৪২ লাখ অধিবাসীর প্রায় ৮৫ শতাংশই হিন্দু।

এতদিন কেন যাইনি বালি- এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই। হ্যাঁ, এশিয়া বলেই হয়তো করেছি হেলফেলা। দূরের আলোই ঝলমল করে বেশি আর তাই ছুটে গেছি আটলান্টিকের ওই পারের আমেরিকা, যাইনি নিজ মহাদেশের সহজগম্য বালি। অথচ রবীন্দ্রনাথ কত আগেই না শিখিয়েছিলেন- ‘বহুদিন ধরে বহু পথ ঘুরে বহু ব্যয় করে বহু দেশ ঘুরে, দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু/দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হইতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু।’ দীক্ষাগুরু কতভাবেই না দীক্ষিত করেছেন আপনাকে, আমাকে; কিন্তু উপরের দীক্ষাটি অবহেলা করেছি বলে কুড়ি বছর আগে সুলতানা আজীম যখন তার মতো করে দূরবর্তী স্পেনের মার্লোকা দ্বীপের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন- পৃথিবীর সুন্দরতম ও সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গা- তখনও বালি যাইনি বলে তাকে বলতে পারিনি- আপনি কি বালি গিয়েছেন? সুলতানাকে আমার তখন মনে হয়েছিল সেই বন্ধুটির মতো, যে ডাক্তারকে সে চেনে তিনিই সবচেয়ে ভালো ডাক্তার, যে শিক্ষকের ঘনিষ্ঠ হয়েছে, তিনিই শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।

হ্যাঁ, সিনিয়র সিটিজেনের তালিকায় নাম ঢুকে গেছে অথচ বালি গেলাম এই মাত্র কয়েকদিন আগে। কী করে যাব? এ দেশে যে হলিডে কালচারই গড়ে ওঠেনি, তাই ছুটি পাওয়া ভার। অথচ আনন্দমুখর হলিডে মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের এক অত্যাবশ্যকীয় শর্ত। বালির রাজধানী ডেনপাসারে ক্যালেন্ডারের যে কোনো দিনেই নেটিভের চেয়ে ফরেনারের সংখ্যা কম নয়, আসে তারা হলিডে উদযাপনে। লন্ডন ও নিউইয়র্ক বহুজাতিক (multi-national) শহর বটে, তবে জাতিগুলো খুঁটি গেড়ে থাকে শহর দু’টিতে। ডেনপাসারের বিদেশীরা সমুদ্রে নায়, হোটেলে খায়- হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ছুটি শেষে মিলিয়ে যায় নিজভূমের দিগন্তে। সেই শূন্যতা দখল হয়ে যায় পরক্ষণেই আবার। চুম্বকীয় আবেশ বটে বালির, কাঁচাবাজারে যেমন আলু-পটলের ঝাঁকা থাকবেই; বালিতে গেলে তেমন একাধিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্টের দেখা মিলবেই। এই তো সেদিন সৌদি বাদশা তার ১৫০০ সঙ্গীসহ ঘুরে গেলেন বালি। ever-popular holiday destination বালির পপুলারিটি ২০০২ সালের ভয়াবহ জঙ্গি বোমা হামলাও ধ্বংস করতে পারেনি। বরং popular দ্বীপটি তার বুকে ট্যুরিস্ট ধারণ করে অব্যাহতভাবে populous (জনাকীর্ণ) হচ্ছে। আর অস্ট্রেলীয়দের কথা? নারী-পুরুষের প্রেমের মতোই বালির প্রতি তাদের ভালোলাগা। এ পর্যায়ে পাঠককে একটা টিপস দিই, অতঃপর আমরা বালির সদর-অন্দরে প্রবেশ করব। স্বদেশী বা বিদেশী কোনো বন্ধুকে হারিয়ে ফেলেছেন? ঠিকানা, ফোন নাম্বার কিছুই নেই? বালির হোটেলগুলোয় তার ছবির একটি করে কপি দিয়ে রাখুন। একদিন না একদিন কোনো এক হোটেল-ম্যানেজারের ফোন পাবেনই পাবেন- হ্যালো, আপনার বন্ধু আমাদের হোটেলেই উঠেছেন!

২.

রহস্য নয়তো কী, রিকশায় উঠলে সেই রিকশার চেইন পড়বেই আর প্লেনে চাপলে পেয়ে যাব উইন্ডো-সিট। কুয়ালালামপুরে তিন ঘণ্টা ট্রানজিটের পর মালিন্দো এয়ারের বোর্ডিং পাস হাতে পেয়ে দেখি এবারও সিটটা জানালার পাশেই, নীলের সঙ্গে সখ্য গড়ার সিট। আচ্ছা, শূন্যতার রঙ কি নীল? তা না হলে মেঘের উপরে উঠে যাই যখন, মাঝখানে থাকে না কোনো স্তর, নিঃসীম সেই শূন্যে আকাশ এত নীল দেখায় কেন তখন? যাকগে, সাড়ে তিন ঘণ্টার ফ্লাইটে অস্থির আমি, শুধু চোখ দুটো স্থির মনিটরে, এই বিশ্ব চরাচরে কোথায় আমি তখন জানতে। কানও সজাগ, কখন ককপিট থেকে ঘোষণা আসবে- আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই ডেনপাসারের নূরা রাই বিমানবন্দরে অবতরণ করতে যাচ্ছি। সদ্যপ্রেমের প্রথম ডেটিংয়ের আগ মুহূর্ত তো নয়, তবু কেন এত শিহরণ! অতঃপর আসে সেই ঘোষণা আর একটু একটু করে নিচে নামতে নামতে চলে আসি ভারত মহাসাগরের একেবারে বুকের কাছে। এরপর তার তীর ঘেঁষে যখন রানওয়েতে চাকা, মহাসমুদ্রের কপালে টিকলির মতো বিমানবন্দরটি কেড়ে নেয় মন। বিমানবন্দর তো নয়, এ হল ‘cross-nations’-এর এক মিলনমেলা। আবারও রবীন্দ্রনাথ- শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা। বিমানবন্দরটি যে নূরা রাই-এর নামাঙ্কিত, তার একটা শানে নযুল আছে। ইন্দোনেশিয়ার এক নমস্য বীর তিনি। দেশটি একসময় ওলন্দাজদের উপনিবেশ ছিল। Dutch colonialist-দের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মরেছিলেন নূরা রাই। বিমানবন্দরটির কমপ্লেক্সেই রয়েছে তার বিশাল এক মূর্তি।

কাস্টমস শেষে লাগেজ হাতে বাইরে বেরোতেই দেখতে পাই পূর্ব-নির্ধারিত ড্রাইভার আমার নামাঙ্কিত একটি বড় কাগজ বুকে সেঁটে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে গাইড ফিলিপিনো মেয়ে অ্যাডর। ৩৫ কী ৩৬ বছরের এই নারী চমৎকার ইংরেজি বলে, সে স্বেচ্ছায় গাইডবরণ করেছে আমার। তার হাতে এক থোকা ফ্রাঞ্জি পানি। আমাদের কাঁঠালচাঁপার মতো দেখতে ফুলটি। বালির হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এটি হলি ফ্লাওয়ার, পুজোর অর্ঘ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

গাড়িতে উঠে আমি প্রথমে যেতে চাই মাডে পাসতিকার অফিসে। ইন্দোনেশিয়ার প্রদেশগুলো গভর্নরশাসিত। ৬৫ বছর বয়সী পাসতিকা বালির গভর্নর। তার শাসনে তিন রাত কাটাব, দেখা না করে হোটেলে গেলে কেমন দেখায় না! রাস্তায় নামতেই চোখ ঝলসে ওঠে। বিত্তবানের গোছানো ড্রইংরুমের চেয়েও ছিমছাম চতুর্পাশ। নেটিভ যারা, হেঁটে যাচ্ছেন ভাবলেশহীন, প্রকৃতিস্থ তারা? কিন্তু আমার কিংবা অন্য ট্যুরিস্টদের উচ্ছ্বাস ‘রোধিবি কী দিয়া বালির বাঁধ?’ নেটিভ ও ট্যুরিস্টদের ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্টের পার্থক্যটা এভাবেই হয় যে, আমরা যেন অতি সুন্দর কোনো পরস্ত্রী দেখছি। নিত্যদিনের অভ্যাসে স্বামী অর্থাৎ নেটিভের চোখ সয়ে গেছে আর আমরা এই প্রথম দেখছি বলে অস্ফূট স্বর- আহা কী সুন্দর! ঢাকা এক স্বতঃস্ফূর্ত শহরের নাম। মেনে নেয়া যেত, যদি তা গোলাপের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটতো। গোলাপের পরিস্ফুটন স্বতঃস্ফূর্ত হলেও একটা নিয়ম মেনেই তা ফোটে; ঢাকার বিকাশে নিয়ম-কানুনের কোনো বালাই নেই। ডেনপাসারকে এর শাসকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠতে দেয়নি, এর পরতে পরতে রয়েছে পরিকল্পনা। পুরো শহরটিতে কোনো হাইরাইজ নেই। অ্যাডর জানাল, এ হল ধর্মীয় চেতনা। কোনো ভবনকেই বালির বিখ্যাত পর্বত আবাং ও মন্দিরগুলোর চেয়ে উঁচু করে নির্মাণ করা যাবে না। ঈশ্বর থাকেন পাহাড়ের চূড়ায়, সেখান থেকেই আশীর্বাদ ঢালেন তিনি আর মন্দির তো উপাসনালয়। এসবের চেয়ে উঁচু ভবনে বাস করলে ঈশ্বর ও দেবদেবীর অপমান করা হবে। কে বলে ধর্মের কোনো ইহজাগতিক ইউটিলিটি নেই?

পৃথিবীর সব সুন্দর দেশের মতো বালিও অর্ধেক পৃথিবী (the earth) আর অর্ধেক বিশ্ব (the world)। মানে অর্ধেক ঈশ্বরপ্রদত্ত প্রকৃতি, বাকি অর্ধেক মানুষের কারিকুরি। এ প্রসঙ্গে আমার একটি ধন্দ আছে। এই যে সুন্দরকে আরও সুন্দর করতে ঈশ্বরের সৃষ্টিতে মাতব্বরিটা করলাম- নদীতে বাঁধালাম ঘাট, গুহা থেকে উঠে এলাম অট্টালিকায়, চাঁদের আলোর বিকল্প বের করলাম ফ্লাড লাইট, এখানে-সেখানে বসালাম রঙের ছোপ, কৃত্রিমতায় জন্মালাম ক্রস-প্রজাতি, আরও কত কী- কাজগুলো অ্যান্টি-নেচার হয়ে গেল কি? যদি হয়, প্রকৃতি কি তাহলে একদিন প্রতিশোধ নেবে এই ঔদ্ধত্যের?

ইঞ্চি পরিমাণও খানাখন্দহীন, গাড়ির হর্নরহিত, কার্পেটের মতো মসৃণ রাস্তাসহ ধবধবে পরিচ্ছন্ন শহরটি দেখতে দেখতে আমার কেবলই মনে হয়, সি-বিচগুলোসহ দর্শনীয় জায়গাগুলো না জানি আরও কত সুন্দর! গভর্নরের সঙ্গে অবাধ সাক্ষাৎ শেষে হোটেলে রিপোর্ট করি যখন, সেটা লাঞ্চের সময়। লাঞ্চেই অ্যাডর জানায়, সেদিন বেশি কিছু হবে না, শুধু ভারত মহাসাগরের তীরে বসে সূর্যাস্ত দেখব। এক ঘণ্টার ড্রাইভে আমরা ছুটতে থাকি নির্দিষ্ট তীরের পানে। আমরা একেক করে পার হয়ে যাই হিন্দু পৌরাণিক চরিত্রগুলোর মূর্তি ও রাস্তার দু’পাশের নানা ধরনের স্থাপনা। অ্যাডরকে আমি তার কল্পনায় চেনাতে থাকি বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, বাংলাদেশ আর সে আমাকে বাস্তবে দেখিয়ে চলে বালির সৌন্দর্য। এখন যা দেখছি, তা অবশ্য বালির পুরো সৌন্দর্যের দু’আনাও নয়, এ শুধু স্থাপনা নির্মাণের যে শৃঙ্খলা, সেই সৌন্দর্য।

ভারত মহাসাগরের উদ্দিষ্ট তীরটিতে এসে আমরা আমব্রেলা-রেস্টুরেন্টগুলোর একটি দখলে নিয়ে কফি খেতে খেতে অপেক্ষায় থাকি সূর্যমামা মহাসাগরটির দিগন্তে বিলীন হওয়ার আগে বাংলাদেশ থেকে আগত তার ভাগ্নেকে কতটা চোখ রাঙায়। পুরো সৈকতটি জুড়ে অন্তত কুড়িটি জাতিরাষ্ট্রের ট্যুরিস্ট ভিড় করেছে, তাদের প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব, দেশী সূর্য, আছে সেই সূর্যের অস্তগামিতা; তবু কেন সেই চিরচেনা সূর্যের বিদায়লগ্নটিকে আবারও দেখার এত সাধ? তবে কি এ শুধুই জোড়া মেলানো? ঈশ্বরের দুই মহান সৃষ্টি সমুদ্র আর সূর্যের কেমিস্ট্রি থেকে নতুন কিছু পাওয়ার আশা? আসলেই তাই। এ এক অন্যরকম ক্যানভাস।

পরের দু’দিনই ড্রাইভার ও অ্যাডর এসেছে সকাল ন’টায় আর আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি রাত দশটা পর্যন্ত। কত বিচ! পাদাং পাদাং থেকে পান্দাওয়া, এরপর একে একে নুসাদুয়া, সেমিনইয়াক, সানুর, কুটা- মন ভালো হবে না মানে? একটায় গিয়ে হবে না, তো আরেকটায় হতেই হবে। মন্দিরগুলোর আর্কিটেকচার নিয়ে বুয়েটে আলাদা একটি কোর্সই খোলা যেতে পারে। তানাহ লট মন্দিরটিই সবচেয়ে সুন্দর, এটাকে বলা হয় temple of the sea and earth- সমুদ্রবক্ষে নির্মিত মন্দিরটি তো গড়তে হয়েছে মাটির উপরেই! মন্দিরটির নিরাপত্তা নাকি সর্পকুলের তত্ত্বাবধানে নিশ্চিত হয়ে আছে।

ইন্দোনেশিয়ার ধর্মীয় সম্প্রীতির সবচেয়ে আইডিয়াল জায়গা বালি। জাভা, সুমাত্রা ও অন্যান্য প্রদেশ থেকে ঝাঁকের পাখির মতো দলে দলে আসছে মুসলমান, ঢুকে যাচ্ছে তারা মন্দিরে-মন্দিরে, তানাহ লট থেকে উলুয়াতু, ওয়াটার হাউজে স্নানও করছে। সেটা পুণ্যস্নান হবে কিনা, আল্লাহ ছাড়া কে জানে? গেলাম পূজা মান্ডেলা নামের একটি গ্রামে। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, রোমান ক্যাথলিক, প্রোটেস্টান্ট- পাঁচ ধর্মাবলম্বীদের কত সহজ সহাবস্থান! উবেদে দেখলাম বারং নৃত্য, সিঙ্গারাজায় ডলফিন, বেদুগুলে রয়াল টেম্পল। বালির সবকিছুরই সবিস্তার বর্ণনা দিতে গেলে আসল কথাই বলা হবে না। তবে আবাং পর্বত ও জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি (active volcano) বাতুর-এর যে দৃশ্যপট উপভোগ করেছি অনতিদূরের একটি উঁচু রেস্টুরেন্টে বসে, সেটা ঠিক আনন্দ নয়, আনন্দের অধিক কিছু, ইংরেজিতে বললে ecstasy. ১৯৬৩ সালে বাতুর-এর যে অগ্ন্যুৎপাতে অনেকের মৃত্যু ঘটেছিল, সময়ের ফেরে কুচকুচে কালো হয়ে পড়া সেই লাভাও দেখলাম আগ্নেয়গিরিটার পাদদেশ। যা হোক।

কয়েকদিন আগে পর্যটনমন্ত্রী মেনন ভাই টোয়াব (ট্যুর অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ) আয়োজিত এক ট্যুরিজম ফেয়ারে বললেন, উগ্রপন্থীদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে আমাদের পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। কী আর বলি, এই আত্মতৃপ্তি আত্মনিপীড়নেরই নামান্তর। মন্ত্রী মহোদয় সম্ভবত মনে করেছেন, ট্যুরিজম মানে কিছু স্পটকে দর্শনীয়ভাবে সাজিয়ে তোলা। বালি থেকেই একটা উদাহরণ দিই। সেখানে শেষ রাতে ঘুমিয়েছিলাম দেরি করে। ঘুম থেকে উঠে বালিশে মাথা রেখেই ইন্টারকমে রেসেপশন কাউন্টারে সময় জানতে চাইলাম। বলল, সাড়ে ১১টা। আমার আক্কেল গুড়ুম! ফ্লাইট সোয়া ১২টায়, এই ৪৫ মিনিটে এয়ারপোর্টে গিয়ে বোর্ডিং পাস পাওয়া অসম্ভব। ড্রাইভার ও অ্যাডর কেন এলো না! তাদের তো দশটায় আসার কথা ছিল, বুঝতেই পারছি না। অ্যাডর কি অতিরাবীন্দ্রিক হয়ে উঠল যে, বিদায়বেলায় ‘যেতে নাহি দেব’ কবিতাটিও আওড়ানোর মতো মুডে নেই আর তাই আসেনি? নির্ধারিত ফ্লাইটের আশা ছেড়ে দিয়ে অলস ভঙ্গিতে নিচে নেমে দেখি (এমন প্যানিক যে, নিজের ঘড়ির কথাও খেয়াল নেই), বাজে সাড়ে ৮টা। ধাঁধার সমাধানটা হল, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের পর্যটক বেশি বলে কাউন্টারের উপরের দেয়ালে তিনটি ঘড়ি টাঙানো- একটিতে সিডনির সময়, একটিতে টোকিওর ও বাকিটিতে বালির। লোকটি ভুলক্রমে সিডনির ঘড়ি দেখে তিন ঘণ্টা এগিয়ে দিয়েছে সময়। অযথাই আমাকে আতঙ্কে ফেলার অপরাধে আমি যখন একচোট নিচ্ছি, হোটেলগুলোর দায়িত্বে থাকা ট্যুরিজমের এক পরিদর্শক লবি থেকে উঠে এসে বিস্তারিত শোনার পর অপরাধীকে চার লাখ রুপিয়া, মানে ৩৫ ডলারের মতো জরিমানা করে দিলেন!

ট্যুরিজম একটি ইন্টিগ্রেটেট টোটাল প্রসেস অর্থাৎ সমন্বিত সামগ্রিক প্রক্রিয়া। বালিতে এটা শুরু হয় on arrival ভিসার মতো উদার আহ্বানের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশে দীর্ঘসূত্রতার কাস্টমস ক্লিয়ার করার পর বাইরে বেরোলেই শুরু হয় লাগেজ টানাটানি। এখানে ট্যুরিস্ট স্পট আছে, নেই সেখানে যাওয়ার অ্যাপ্রোচ রোড, যা আছে তা ভাঙাচোরা। পৃথিবীর প্রায় সব বড় শহরেই ট্যাক্সির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে ড্রাইভার এখানকার মন্ত্রীর ড্রাইভার যেমনটা করে, তেমন বিনম্র ভঙ্গিতে নিজে দরজা খুলে দিয়ে প্রথমে মিটার চালু করেন, অতঃপর বলেন- স্যার কোথায় যাবেন? এখানে স্বজাতির জন্য ভাড়া মিটারের দ্বিগুণ, সাদা চামড়া হলে তিনগুণ। গণপরিবহনের কথা যদি বলি, নিকৃষ্টতম বললেও কুলোয় না। নেই খাদ্য-পরিবেশ, বাড়তি মনোরঞ্জনের প্রয়াস। নিরাপত্তা? কত বিদেশীই তো খুন হলেন এই দেশে!

বাংলাদেশে কিছু ট্যুরিস্ট আসেন বটে, সেটা ট্যুরিজম মন্ত্রণালয়ের কৃতিত্ব নয়। এদেশের সাধারণ মানুষের সেরা আতিথেয়তা আর পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের টানেই হয়তো আসেন তারা। সুন্দরতম দেখার পর দীর্ঘতম দেখার ইচ্ছা জাগতেই পারে। তবে তারা কি দেশে ফিরে বাংলাদেশে আসতে অন্যদের উৎসাহিত করেন? মনে হয় না। যদি করতেন, ভালো ডাক্তারের ক্ষেত্রে যেমনটা হয়, অনেক আগেই পসার জমতো। পর্যটন প্রশ্নে অতি সম্প্রতি পাওয়া আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশ পৃথিবীর ১৩৬টি দেশের মধ্যে ১২৫ তম স্থানে রয়েছে আর এশিয়ায় রয়েছে সর্বনিন্মে। অথচ পর্যটনমন্ত্রী আহ্লাদে আটখানা!

সাংবাদিক বলেই জানি, ২০১৬ সালকে পর্যটনের বছর ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে জানি না, এ ঘোষণার আউটপুট কী? জানতে চাই-ও না। জানতে চাই না জিডিপির হার কত শতাংশে পৌঁছল অথবা মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাত্রায় আমরা এখন কোন্ স্টেশনে। আমরা শুধু জানতে চাই, কবে হবে এই অনিশ্চিত, বিড়ম্বিত, হয়রানিমূলক যাপিত জীবনের অবসান?

মাহবুব কামাল : সাংবাদিক

mahbubkamal08@yahoo.com








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com