Friday, 22 September, 2017, 2:16 PM
Home
তিনি এক ‘বাতিঘর’
আবদুল বায়েস লিখেছেন কালেরকন্ঠে
Published : Thursday, 27 April, 2017 at 1:35 PM, Count : 106
স্যার ফজলে হাসান আবেদ কেসিএমজি বিশ্বের এক নম্বর এনজিও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ‘বাতিঘর’ বলে বিশ্বব্যাপী নন্দিত। অতি সম্প্রতি ‘ফরচুন’ ম্যাগাজিন তাঁকে পৃথিবীর অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বন্ধনীতে রেখেছে। তবে আগে-পিছে যত বিশেষণ ও খেতাব থাক না কেন, ব্র্যাকের লাখ লাখ কর্মীর কাছে তিনি যেমন ‘আবেদ ভাই’ ছিলেন, এখনো তা-ই আছেন। এই মহতী মানুষটির জন্ম ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে। বাবা সিদ্দিক হাসান ও মা সৈয়দা সুফিয়া খাতুন।

এক সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারে ফজলে হাসান আবেদের জন্ম। জমিদার পরিবার, দাদা খানবাহাদুর, নানা মন্ত্রী, বাবা জেলা সাবরেজিস্ট্রার, মেজ চাচা জেলা জজ ইত্যাদি সমেত পরিবারের সদস্যদের ‘সাহেব’ হওয়ার আকাশছোঁয়া খায়েশ থাকাটাই স্বাভাবিক। তিনিও সাহেব হতে চেয়েছিলেন কিন্তু বিধি বাম। সত্তরের প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাসের সময় ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে দেখেন লাখ লাখ মানুষ মৃত, বাতাসে বেড়ায় লাশের গন্ধ, তছনছ বাড়িঘর। হাতিয়া, মনপুরা পুরো এলাকা যেন ভাগাড়। হৃদয় দিয়ে অনুভব করলেন, মানুষের আর্তনাদে আকাশ ভারী; অথচ পাশে দাঁড়ানোর তেমন কেউ নেই। অনেকটা এমপ্যাথিশূন্য সমাজ ও তৎকালীন সরকার। সেই একটা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ নিমেষে বদলে দিল; জেরার মুখে পড়ল জীবন-দর্শন এবং সন্ধিক্ষণে দাঁড়াল তাঁর সাহেব হওয়ার শখ। সিদ্ধান্ত নিলেন নিজের স্বার্থ নয়, দেশ ও দশের স্বার্থ তথা প্রান্তজনের আপনজন হবেন।

দুই

আজ তাঁর ৮১ বছরে পদার্পণ, সুতরাং শুভ জন্মদিন। ৮১ বছরেও একুশের মতো দৃপ্ত পদচারণ, সুসংহত শব্দশৈলী, পরিমিত পর্যালোচনা এবং ঈর্ষণীয় স্মরণশক্তি। একাশিতে পা দিয়েও তিনি তাড়িত চল্লিশের চেতনা দিয়ে। হাঁটাহাঁটি দেখলে মনে হয় কোনো একটা কিছু জয় করতে যাচ্ছেন। এ সবই ঘটে মহাখালীস্থ ব্র্যাক সেন্টারে ১৯ তলায়। যেখানে তিনি সকালে এসে সন্ধ্যা অবধি ব্র্যাকের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে চিন্তামগ্ন থাকেন। শাল্লার অভিজ্ঞতায় সিক্ত দরিদ্রের এই সেবক সারা বাংলাদেশ চষে বেড়িয়েছেন, গরিবের ডেরায় পা রেখেছেন। আজ খুব কম গ্রাম বা জনপদ আছে, যেখানে ব্র্যাকের কোনো না কোনো সেবা পৌঁছেনি।

তিনজন মানুষ তাঁর ওপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলেছেন বলে তিনি মনে করে থাকেন। যেমন অভিভাবক হিসেবে বাবা, মেনটর হিসেবে মা এবং ‘চিন্তাবন্ধু’ হিসেবে ছোট চাচা। তবে ছোটবেলা থেকেই ফজলে হাসান আবেদের মেধা-মনন, খেলাধুলা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে প্রচুর প্রভাব রেখেছেন তাঁর ছোট চাচা সৈয়দ সায়ীদুল হাসান। তিনি ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালে এক হিন্দু পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে শহীদ হন। তারও আগে সমাজে কিংবা নিজের বাড়িতে বইয়ের লাইব্রেরি আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অগ্রদূত ছিলেন তিনি। চাচার অনুপ্রেরণায় ফজলে হাসান আবেদের কবিতা পড়ার প্রতি আগ্রহ জন্মে এবং সেই সুবাদে শেকসপিয়ার, বায়রন, রবীন্দ্রনাথ, কিটস মাথায় কিলবিল করতে থাকলে একবার কবি হওয়ার শখও জাগে। আবার এই ছোট চাচার পরামর্শেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের পাট চুকিয়ে ১৮ বছর বয়সে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাত্রা। কথায় আছে—বাপ কা বেটা, কিন্তু তিনি যে চাচা কা ভাতিজা!

তিন

প্রসঙ্গত, কয়েকটি মাইলফলক উল্লেখ না করলে গল্প অপূর্ণ থেকে যেতে পারে। সত্তরের দশকের শেষ দিকে এক চিমটি লবণ, আধা লিটার পানি ও এক মুঠো গুড় স্লোগান নিয়ে সাড়াজাগানো ওরাল স্যালাইন বিপ্লব; আশির দশকে শিশুর টিকা নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চলে কাজ এবং নব্বই ও পরবর্তী দশকে কৃষি, খাদ্য এবং বীজ বিপ্লব এমনকি বিশ্ব খাদ্য পুরস্কার ঘরে তোলা সাফল্যের জয়টিকা। ব্র্যাকের কৃতিত্বের বছরে আরো আছে অবহেলিত শিশুদের শিক্ষা, গ্রামীণ স্বাস্থ্যে সম্পৃক্ততা এবং ২০০০ ও পরবর্তী সময় হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী ঘিরে যুগান্তকারী সম্পদ হস্তান্তর পদক্ষেপ। এ ছাড়া আছে দরিদ্রের জাত বা ভৌগোলিক কোনো সীমানা নেই—এই আপ্ত কথা মনে রেখে অন্যান্য দেশে দারিদ্র্য নিরসনে কাজ করার জন্য ‘ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনাল’ প্রতিষ্ঠা করে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রম। মোট কথা, বাংলাদেশসহ অনেক দেশে খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টি, ক্ষুদ্র অর্থায়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন হেন জায়গা নেই যেখানে স্যার আবেদের চিন্তা-চেতনার ছোঁয়া নেই। বড় কথা, এই চিন্তা-চেতনা ছিল বহতা নদীর মতো, যা কখনো এক জায়গায় থেমে থাকেনি।

চার

৮০ বছর পেরিয়ে আজও তিনি সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত উচ্চাঙ্গসংগীতের আসর উপভোগ করতে ভালোবাসেন; তাঁর ভালো লাগে রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা ও শেকসপিয়ারের সনেট; তাঁকে আহত করে নারী-পুরুষ বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতন, অপশাসন ও গণতন্ত্রহীনতা। বিনয়ী, মিতভাষী, অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন, শিল্প ও সাহিত্যানুরাগী এবং কঠোর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দরিদ্রের দিশারি হয়ে ওঠা স্যার ফজলে হাসান আবেদের ৮১তম জন্মদিনে আবারও উষ্ণ অভিনন্দন জানাই।


লেখক : সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com