Wednesday, 23 August, 2017, 10:20 AM
Home
এই যুদ্ধ-মহড়া থামাতে হবে
মুহা. রুহুল আমীন লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Thursday, 27 April, 2017 at 1:35 PM, Count : 146
কোরীয় উপদ্বীপের সামরিক উত্তেজনা কি বৃহত্যুদ্ধের রূপ নিবে? এ বিষয়ে বিশ্বমিডিয়ায় বিতর্কের ঝড় চলছে। একপক্ষ বলছেন, এ উত্তেজনা সাময়িক এবং পারমাণবিক যুদ্ধের কথা বিবেচনা করে কেউই যুদ্ধ শুরু করবে না। আবার আরেক পক্ষ মনে করেন, পারমাণবিক অস্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো শক্তিকে তোয়াক্কা না করে উত্তর কোরিয়া একটি চূড়ান্ত আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে উদ্দীপিত হতে পারে এবং সে কারণে যে কোনো মুহূর্তে অত্রাঞ্চলে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হতে পারে।

প্রশ্ন হলো, সম্ভাব্য এ কোরীয় আঞ্চলিক যুদ্ধের পক্ষদ্বয় কারা? কোরীয় যুদ্ধ কি কেবল উত্তর কোরিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? নাকি এ যুদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রসমূহসহ অত্রাঞ্চলের সমুদয় স্টেকহোলডারদের যুদ্ধের উন্মত্ততায় মাতিয়ে তুলবে? কোরীয় সংকটের অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এ সংকটটি কেবল আঞ্চলিকবৃত্তেই আবদ্ধ থাকবে না বরং শীঘ্রই তা আঞ্চলিক সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রূপ পরিগ্রহ করবে এবং বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোকে সংযুক্ত করে শীঘ্রই তা সর্ববিনাশী পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে।

গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে যখন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়, তখন কোরীয় সংকটের বীজ উপ্ত হয়। কোনো রকম মীমাংসা ছাড়া, কোনো রকম শান্তিচুক্তি ছাড়া কেবল ১৯৫৩ সনের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ১৯৫০-৫৩ সময়ে সংঘটিত কোরীয় যুদ্ধের প্রথম অধ্যায় শেষ হয় । কিন্তু সেই সময় থেকে স্নায়ুযুদ্ধের সিঁড়ি বেয়ে কোরীয় সংকট দানা বাঁধতে থাকে, যা আজ বৈশ্বিক পারমাণবিক যুদ্ধের কিনারায় এসে থমকে আছে এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক যুদ্ধের রণহুংকার ছাড়ছে।

যারা কোরীয় সংকটের বিশ্বযুদ্ধের রূপান্তর তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, তাদের ধারণা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বেকার অস্ত্রায়ণ প্রতিযাগিতার ন্যায় অত্রাঞ্চলে অস্ত্রায়ণ প্রক্রিয়া চলছে, যা বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস দিচ্ছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেহেতু অস্ত্রায়ণ প্রতিযোগিতার একটি প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিল, তেমনি কোরীয় এলাকায় অস্ত্রায়ণ প্রতিযোগিতা, প্রশান্ত মহাসাগরের সামরিক মহড়া এবং পাল্টাপাল্টি রণহুংকার অত্রাঞ্চলে মহাযুদ্ধের অভিশাপ- ই নামিয়ে আনছে। এ মহাযুদ্ধ থামাতে হবে, কোনোভাবেই পৃথিবী ধ্বংসের এ খেলা চলতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু কিভাবে? তা কি আদৌ সম্ভব?

আমরা বিতর্ক করছি—যুদ্ধ হবে কি হবে না। আমরা কথা বলছি এ যুদ্ধের বিস্তৃতি নিয়ে। আমরা আলোচনা করছি এ যুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে। কিন্তু কথা বলা দরকার এ সম্ভাব্য সর্বনাশা যুদ্ধ থামানো নিয়ে।

পূর্বেকার আলোচনা থেকে স্পষ্ট এ যুদ্ধ বাহ্যিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে মনে হলেও চূড়ান্ত বিচারে এ যুদ্ধ পৃথিবীর বৃহত্শক্তিবর্গের যুদ্ধ হিসেবেই আবির্ভূত হবে। চীনের আঞ্চলিক মিত্র উত্তর কোরিয়াকে চীন কখনো বিপদসংকুল অবস্থায় রাখবে না, রাশিয়াও তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এ দিকে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের জোট। তারা অত্রাঞ্চলে একটি পক্ষ-প্রতিপক্ষ ইতোমধ্যে তৈরি করে ফেলেছে। এ জোটটি আঞ্চলিক ভিত্তিতে গড়ে উঠেনি, এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেই তা বিচার করতে হবে। যদি এখানে কোনো যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে তা এ বৈশ্বিক পক্ষদ্বয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে শীঘ্রই সর্বব্যাপী বৈশ্বিক পক্ষ-প্রতিপক্ষের চূড়ান্ত রূপ গ্রহণ করবে এবং তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাবে।

পূর্বেই আলোচনা করেছি কোরীয় সংকট স্নায়ুযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রত্যক্ষ ফল, কাজেই সাবেক দুই পরাশক্তিসহ বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ঐকান্তিক চেষ্টা ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া এ যুদ্ধ থামানো সম্ভব নয়। প্রথমে ব্যাখ্যা করা দরকার যুদ্ধের সম্ভাবনা বা প্রেক্ষিত কেন তৈরি হলো! সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা চিন্তা থেকেই যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। কাজেই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে যুদ্ধের সম্ভাবনাকে শান্তির প্রত্যাশায় রূপান্তরিত করা যায়। একটু পেছনে ফেরা যাক।

অব্যাহত নিরাপত্তা-হুমকির মুখে ক্ষুদ্র, দুর্বল, দরিদ্র, অবহেলিত রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়া ২০০৩ সালে এনপিটি চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে পারমাণবিক অস্ত্রায়ণ প্রক্রিয়া শুরু করলে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং উত্তর কোরিয়া ছয় জাতি সংলাপ শুরু করে। ইতোমধ্যে ২০০৬ সালে উত্তর কোরিয়া সর্বপ্রথম তার পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন করে অত্রাঞ্চলে অস্ত্র-প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। ছয় জাতি সংলাপে কোনো ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে না এবং এক পর্যায়ে ২০০৯ সালে এ সংলাপের ইতি ঘটে। এরপর থেকে উত্তর কোরিয়া একের পর এক পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়ে যায়। উত্তর কোরিয়ায় নিরাপত্তা-হুমকি-মারাত্মক হয়ে উঠে গত মার্চে (২০১৭), যখন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে সামরিক মহড়া শুরু করে। তাদের যৌথ সামরিক কর্মকাণ্ড যথা- কি রিজল্ভ (key Resolve), ফোল ঈগল (Foal Eagle) এবং ম্যাক্স থানডার (Max Thunder) উত্তর কোরিয়াকে খুবই ভীত সন্ত্রস্ত করে তোলে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ হলো, উত্তর কোরিয়া তার পারমাণবিক প্রযুক্তি বিকারগ্রস্ত রাষ্ট্র (rogue states), সন্ত্রাসী গোষ্ঠীসহ যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের কাছে হস্তান্তর করছে। সে কারণে নিরাপত্তা-হুমকি তৈরি হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়ার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএস কার্ল ভিনসন নামক রণতরী পাঠিয়ে ভূমধ্যসাগর ওলটপালট্ করছে। রণতরীটি এখন ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, জাপান সাগর পার হয়ে এখন কোরীয় জল অঞ্চলে অবস্থান করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বাহী একটি সাবমেরিনও সমপ্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার নৌঘাঁটিতে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার অব্যাহত সামরিক মহড়ার মুখে ভীত-সন্ত্রস্ত উত্তর কোরিয়া ১৫ এপ্রিল উত্তর কোরিয়ার জাতির জনক কিম ঈল সুং-এর ১০৫তম জন্মদিবস উপলক্ষে ‘সূর্যদিবস’ (Day of the Sun) পালন করে এবং তাদের সামরিক কুচকাওয়াজের সময় অত্যাধুনিক আইসিবিএম প্রদর্শন করে যা আমেরিকায় আঘাত হানতে পারে বলে মার্কিন সামরিকগণের আশঙ্কা। অধিকন্তু আরো পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার হুমকি দেয় উত্তর কোরিয়া। কার্লভিনসনের সাথে জাপানের যুদ্ধজাহাজ যোগ দিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক উত্তেজনা তৈরি করছে। এর পাল্টা প্রতিবাদ হিসেবে, উত্তর কোরিয়া কার্লভিনসনকে জন্তু-দানব (gross animal) হিসেবে আখ্যায়িত করে তা ডুবিয়ে দেওয়ার এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের মৃত্যুদুয়ারে পৌঁছে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।

যে কোনো দ্বন্দ্ব নিরসন করতে হলে দ্বন্দ্বের কারণগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। পৃথিবীর বর্তমান ও অতীতের দ্বন্দ্বগুলো সমাধানের আলো দেখেনি এ কারণে যে, কারণগুলো চিহ্নিত হলেও তা নিরসনকল্পে কোনো নীতি বা পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। কোরীয় উপদ্বীপের সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে হলে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-হুমকি দূর করতে হবে। প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো ২০০৯ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া ছয় জাতি নিরাপত্তা-সংলাপ আবার চালু করতে হবে এবং জাতিসংঘকে এ ব্যাপারে মধ্যস্থতা করতে হবে।

উত্তর কোরিয়াকে নিশ্চিত করতে হবে যে, তার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র হুমকি নেই। কিভাবে তা সম্ভব? ক্ষুদ্র এ রাষ্ট্রটিকে নিরস্ত্র করে, তার পারমাণবিক অর্জন বিনষ্ট করে কি তা সম্ভব? একটা সময় ছিল, যখন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোকে পরাশক্তিদ্বয় নানাভাবে সহযোগিতা করতো, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিত, তখন বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক নিবারক অবস্থা বিরাজ করছিল। অর্থাত্ দুই পরাশক্তির পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে তাদের বা তাদের প্রভাব বলয়ের কোনো রাষ্ট্র অপর রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণে সাহসী হতো না।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের সাথে সাথে পৃথিবীর নিরাপত্তা চিন্তায় নতুন বাস্তবতা যোগ হয়েছে। জোটচ্যুত হয়ে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো এখন অসহায়, সংশয় ক্লিষ্ট। ফলে তারা নিরাপত্তা চিন্তায় আত্মশক্তি ও আত্মনির্ভরতার পুঁজি সংগ্রহে ব্যাপৃত। এ এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্রতি ব্যক্তি ও প্রতি রাষ্ট্র আত্মরক্ষায় সর্বোচ্চ শক্তির সঞ্চয় করতে চাইবে। এ পথ থেকে কাউকে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়। আত্মরক্ষার চিন্তা স্বাভাবিক জন্মগত অধিকার ও অবিচ্ছেদ্য মানবচরিত্র। মানুষ মরে যাবে, কিন্তু আত্মশক্তির আত্মরক্ষার সুযোগ কখনো হাতছাড়া করবে না। এ কথা নিরেট সত্যি ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও।

উত্তর কোরিয়া, ইরান ও কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট দুষ্ট অক্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং তাদেরকে সমূলে বিনাশ করতে যুক্তরাষ্ট্র সকল শক্তি নিয়োজিত করেছে। যে রাষ্ট্র বা ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের স্বার্থের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্র শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সেই রাষ্ট্রটি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শত্রুতা করুক বা না করুক সে বিবেচনা স্থান পায়নি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে। এভাবে ইরাক, আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া, সুদানসহ পৃথিবীর অনেক রাষ্ট্রকে যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রুর তালিকায় গ্রন্থিত করেছে এবং এক এক করে এ রাষ্ট্রগুলোকে ধ্বংস করে ফেলছে। যুক্তরাষ্ট্র তার শত্রু আখ্যায়িত রাষ্ট্রগুলোর সাথে কী আচরণ করে আসছে, তা বিবেচনায় নিয়ে সঙ্গত কারণে ক্ষুদ্র যে রাষ্ট্রগুলো ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রযুক্তি হাতে পেয়েছে, বা পারমাণবিক অস্ত্রায়ন শুরু করেছে তারা সে পথ থেকে সহজে পিছপা হতে চাইবে না। একজন শীর্ণকায় দুর্বল ব্যক্তিও আত্মনিরাপত্তা রক্ষায় মহাশক্তিধর প্রতিপক্ষকে মৃত্যুর আগে শেষ ঘুষিটি মারবে। এ ব্যক্তি-চরিত্র বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্র চরিত্রে সঞ্চারিত হয় এবং রাষ্ট্র নেতাদের মন কাঠামোতে তা নিবদ্ধ থেকে নিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন করা হয়। সামরিক নীতিনির্ধারণে তাই ব্যক্তির স্বাভাবিক জন্মবৈশিষ্ট্যের বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা চিন্তা ও নিরাপত্তা অধিকারকে ক্ষুণ্ন না করে নির্মোহ স্বচ্ছ গতিশীল ও সৃজনশীল নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করতে হবে আন্তর্জাতিক সমাজকে।

স্নায়ুযুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে উপযুক্ত স্বাভাবিক নিরাপত্তা চিন্তার বৈশিষ্ট্যকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চিন্তায় অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচিত ও বিশ্লেষিত করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় নতুন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে ফ্লানসিস ফুকুইয়ামার মতো পন্ডিত ‘ইতিহাসের ইতি’ তত্ত্ব প্রচার করে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য বিস্তারের ধান্দাবাজ নীতির সমপ্রসারণ ঘটান। এটা বর্তমান সময়ে যে অচল, অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য, তা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বসম্প্রদায়কে অনুধাবন করতে হবে। আমরা এখন এমন এক সময়ের সন্ধিক্ষণে যখন ইরানের মতো একটি রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রকে এক নম্বর শয়তান হিসেবে ঘোষণা করার স্পর্ধা দেখায় এবং উত্তর কোরিয়ার মতো একটি দরিদ্র দুর্বল রাষ্ট্র আমেরিকাকে পারমাণবিক হামলায় ধ্বংস করার হুমকি দেওয়ার সাহস পায়। এই উদ্ভূত বাস্তবতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্ব ও নীতি প্রণয়নের নতুন বার্তা ও নতুন যুগের সূচনা করছে যা অস্বীকার করে নতুন শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

এখন সময়ের দাবি হলো স্নায়ুযুদ্ধোত্তরকালে টেকসই, গ্রহণযোগ্য এবং অভঙ্গুর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নতুন স্থাপনা গড়ে তোলা, যা জাতিসংঘের কতিপয় মৌলিক নীতি পরিবর্তন করে জাতিসংঘকে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক, বৈশ্বিক ও সর্বজনীন সংস্থায় রূপান্তরিত করবে। সকল জাতির সমতা, সমঅধিকার, সার্বভৌমত্ব ও সম্মান-মর্যাদা ঠিক রেখে বৈশ্বিক পরিবর্তন আনতে বিশ্বের নেতৃবৃন্দকে উত্সাহিত করবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের যে মনগড়া তত্ত্ব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বৃহত্ শক্তিবর্গ পৃথিবীর ছোট রাষ্ট্রগুলোর ওপর শোষণ নির্যাতন চালিয়ে আসছে তার অবসান ঘটাতে হবে। চোখ রাঙানি, শাসানোর হুমকি ধমকি এখন আর ফলপ্রসূ হবে না।

এ বাস্তবতা অস্বীকার করলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মধ্যে পড়বে। ধস, ক্ষত ও মৃত্যু পৃথিবীতে নিয়ত অস্থিরতা জিইয়ে রাখবে। রাজনৈতিক বাস্তববাদ অনুযায়ী রাষ্ট্র্রীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য কেবল বৃহত্ শক্তিগুলোই শক্তি প্রদর্শন করবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ব্যবস্থার দুর্ব্যবহার ও অপব্যবহার করে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তাকে অবজ্ঞা করা যাবে—এমন চিন্তা এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ভ্রম দিকভ্রান্ত লক্ষ্যে উপনীত করবে। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রযুক্তি এখন এ বিশ্বায়নের যুগে গুটিকতক রাষ্ট্রের হাতে থাকবে এ অযৌক্তিক চিন্তা। পারমাণবিক শক্তির সমব্যবহার নিশ্চিত করে পারমাণবিক সমতা ও পারমাণবিক নিবারক অবস্থা তৈরি করা যায় কি না সে ব্যাপারে চিন্তা করার সময় এখন এবং এখনই। তা না হলে উত্তর কোরিয়ার ন্যায় অদূর ভবিষ্যতে আরো অন্য কোনো রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহ পারমাণবিক অস্ত্রায়ণের প্রমত্ততায় মেতে উঠবে। তখন পৃথিবীকে ধ্বংসের খাদ থেকে বাঁচানো হবে কঠিন।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ই-মেইল: mramin68@yahoo.com


শুরু করলে সফলতা আসবেই
জাজাফী
চারদিকে আজ হতাশার গ্লানি। সবাই হতাশ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভিতর হতাশাটা মামদো ভূতের মতো চেপে বসেছে। হতাশাগ্রস্ত সেইসব তরুণ ও যুবকের অধিকাংশই মনে করে জীবন বুঝি শেষ হয়ে গেলো। কিংবা যারা এখনো মনে করছে তারা হয়তো জীবনে কিছুই করতে পারবে না তাদেরকে বলতে চাই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। শুরু করুন, সফলতা আসবেই। কিভাবে শুরু করবেন সেটাও কিছুটা বলতে চাই। তার আগে ছোট্ট একটা গল্প বলতে চাই।

দুই বন্ধুর গল্প। মনে করি এক বন্ধুর নাম রাকিন, আরেকজনের নাম মুহিন। রাকিন ভাই কোনো মফস্বল শহরের কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ একটা বিষয়ে পড়াশোনা করেন। বিষয়টা ছিল অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের। আজকালতো জানেন, চাকরি ক্ষেত্রে আবেদন করতে গেলেই বোঝা যায় কোন্ সাবজেক্ট দামি আর কোন্টা মূল্যহীন। রাকিন ভাই কোনো টিউশনিও করতেন না। সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকতেন। কম্পিউটারের প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। তা বলে তিনি কম্পিউটারে গেমস খেলে বা সিনেমা দেখে সময় নষ্ট করতেন না। তিনি ইউটিউব দেখে দেখে নানা বিষয় আয়ত্ত করতে লাগলেন।

রাকিন ভাইয়ের বন্ধু মুহিন ভাই ভর্তি হন সেরা এক বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিক্ষেত্রে সব থেকে আকর্ষণীয় সাবজেক্টের একটিতে। তিনি একটা নামি-দামি কোচিং সেন্টারে ক্লাসও নিতে শুরু করেন। ফলে টিউশনির বাজারে তার ছিল প্রচুর চাহিদা। মাস শেষে চল্লিশ হাজারেরও বেশি টাকা আয় ছিল তার (অনেকেই টিউশনি থেকে আশি-নব্বই হাজার টাকা আয় করে এই ঢাকা শহরে)। তো মুহিন ভাইয়ের আয় দেখে সবার খুবই ঈর্ষা হতো। ছাত্রজীবনে মুহিন ভাই এতো এতো আয় করছেন সেখানে অন্যরা বাবার কাছ থেকে টাকা এনে পড়াশোনা করছে। কিন্তু ঈর্ষা করতো না শুধু রাকিন ভাই। সে মুচকি হাসি দিতো। রাকিন ভাই যেহেতু কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকতো তাই তার সামান্য কিছু আয় হতো।

বছর গড়িয়ে গড়িয়ে একদিন রাকিন ভাই বিএসসি শেষ করলেন। তার আর এমএসসি করা হলো না। অন্যদিকে মুহিন ভাই এমএসসি শেষ করে চাকরির আবেদন করতেই একটা কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে গেলেন। মাসিক বেতন ৩৫ হাজার টাকা। তিনি যদিও তার ছাত্রজীবনের আয়ের চেয়ে কম বেতনে চাকরি পেয়েছেন তার পরও সবাই খুবই জেলাস। আড্ডায় মুহিন ভাই তার চাকরি ও বেতনের কথা বলতেই কেউ কেউ ঈর্ষান্বিত হলো। শুধু ঈর্ষান্বিত হলেন না রাকিন ভাই। এটা দেখে মুহিন ভাই বললেন- কিরে তুই কিছু বলছিস না যে। শুনলাম এমএসসিটাও করতে পারিসনি। এভাবে আর কতদিন ভবঘুরে হয়ে ঘুরবি।

রাকিন ভাই বেশি কিছু বললেন না। শুধু বললেন, এমএসসির চেয়েও বড় কিছু করে রেখেছি আমি। ক’দিন পর মুহিন ভাই চাকরিতে জয়েন করলেন। কোম্পানির এমডির সাথে তখনো তার দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। যদিও কোম্পানি খুব বেশি বড় নয় তবুও কাজের পরিবেশ অনেক ভালো। ঠিক একমাস পর মুহিন ভাই জরুরি কাজে এমডির সাথে দেখা করতে গেলেন। তিনি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সিরিয়াল নিয়ে এমডির রুমে ঢুকলেন। এমডি স্যার তখন অন্যদিকে মুখ করেছিলেন। মুহিন ভাইকে বসতে বলে তার দিকে ঘুরে তাকালেন। মুহিন ভাই থ’ হয়ে গেলেন। যে কোম্পানিতে সে চাকরি করে এবং যে এমডির সাথে দেখা করতে এসেছেন তিনি তারই সেই ভবঘুরে বন্ধু রাকিন ভাই। তার মানে সেই আড্ডার আগেই রাকিন ভাই জানতেন মুহিন ভাই তারই কোম্পানিতে জয়েন করছেন।

রাকিন ভাইকে কোম্পানির এমডির চেয়ারে দেখে মুহিন ভাই থ’ হয়ে গেলেন। তখন রাকিন ভাই বললেন উঠে আসার গল্প। তিনি বললেন- আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়তাম তখনই কেউ একজন আমার বুকের মধ্যে স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল। তারপর সেই স্বপ্নটাকে পুঁজি করে একটু একটু করে এগিয়েছি। বার বার ফেইলিওর হওয়ার পরও আশা ছাড়িনি, একবার যখন শুরু করেছি তখন শেষ দেখবো বলে লেগে থেকেছি। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে উঠলাম তখন নিজের সেই অভিজ্ঞতা আর কাজের সাথীদের নিয়ে ছোট্ট করে কোম্পানিটা শুরু করেছিলাম। তখন আমার হয়ে কাজ করতো মাত্র পাঁচজন মানুষ। ছাত্র অবস্থায় তাদেরকে আমি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে দিতাম। তার সাথে দিতাম বুকভরা স্বপ্ন, একদিন বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাতাম। এখনো তাদের কেউ কেউ আমার সাথেই আছে। এখন আমার কোম্পানিতে কাজ করে প্রায় দেড়শো মানুষ। যাদের মধ্যে তোর আমার মতো অনেক ইঞ্জিনিয়ার আছে, তাদের কারো কারো বেতন ৫০ হাজারের বেশি।

মুহিন ভাই আর কোনো কথা বলতে পারলেন না। তার কেবলই মনে হতে লাগলো সে বুঝি থ্রি ইডিয়টস সিনেমার একজন কুশীলব। এটা শুধুমাত্র গল্প বলার জন্য গল্প নয়, এটা থেকেই আমাদের শিখে নিতে হবে। আমাদের যেসব তরুণ আজ চাকরি চাকরি করে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে হতাশ, তাদেরকে বলতে চাই হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। শুরু করুন,সফলতা আসবেই।

লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com