Sunday, 19 November, 2017, 3:18 AM
Home
অল্প একটু ভাবাতে চাই
জয়া ফারহানা লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Thursday, 27 April, 2017 at 1:35 PM, Count : 87
কিছু ব্যতিক্রম বাদে কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-চলচ্চিত্রকাররা সাধারণত দীর্ঘায়ু হন না। তবে কি কম আয়ু নিয়েই পৃথিবীতে আসেন তারা? নাকি শিল্পের সহজাত পাগলামিতে দ্বিতীয় পৃথিবীতে যাওয়ার তাড়াহুড়ো থাকে খুব? শক্তি চট্টোপাধ্যায় কাঁচাবাজার করতে গিয়ে বাজারের থলে হাতে চলে গিয়েছিলেন ভুটান। তারপর ভীষণ তাড়াহুড়োয় পৃথিবী থেকেও। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের প্রস্থানের পর তাকে উদ্দেশ্য করে সুমন লিখেছিলেন: কে বেশি পাগল, কবি না কবিতা? ঘুমোও বাউন্ডুলে ঘুমোও এবার। ক্ষোভ, অভিমান, জেদ থেকে সুমন শক্তিকে ঘুমোতে বললেও, শক্তির মত বাউন্ডুলেরা ঘুমিয়ে পড়লে পৃথিবীরই সমস্যা। শিল্পের বাউন্ডুলেরা বেঁচে থাকলে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এমন আরো দু’টো শব্দের সংখ্যা বাড়ে, আরো দু’একটা সুর পৃথিবীর বাতাসকে টাটকা করে, পৃথিবীতে বেঁচে থাকা আরেকটু সুখের হয় মানুষের জন্য। যদিও আয়ু এবং জীবনের সকল হিসেব-নিকেশে কাঁচা শিল্পীরা নিজেরা বেশিদিন বাঁচেন না। বেঁচে থাকেন ঘোরতর হিসেবীরা। ব্যাংক একাউন্টে তাদের হিসেব ফুলে-ফেঁপে ওঠে। ব্যক্তিজীবনে আরাম-আয়েশ, সচ্ছলতা উপচে পড়ে। সামান্য সর্দি-কাশিতে ছুটে যান বামরুনগ্রাদ, মাউন্ট এলিজাবেথে। শিল্পীদের এতো কপাল নেই। আয়ু তাদের থাকে ঠিকই, শিল্পের পেছনে সে আয়ু ক্রমাগত ক্ষয় হতে থাকে। শিল্প সত্য উন্মোচন বড় সহজ ব্যাপার নয়। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় খুঁজে পাওয়া যায় সে সত্য। তার আগে বছরের পর বছর চলে আত্মক্ষয়, অনিয়ম, শরীরের উপর যথেচ্ছাচার। কিছু বিষ রক্তের মধ্যে গুলিয়ে না নিয়ে কে কবে শিল্প সত্য উন্মোচন করতে পেরেছে? বিষে বিষে ক্ষয় হন স্রষ্টা, অমৃতটুকু পায় পাঠক, দর্শক, শ্রোতা। একটি ভালো সৃষ্টির আড়ালে লুকিয়ে থাকে কতো মহাজনের কতো প্রত্যাখ্যান, কতো অপমান, কতো ‘না’। চারপাশে হ্যাঁ হ্যাঁ করা সঙদের ভিড়ে সত্যিকার শিল্পী কেবল না-ই শুনতে থাকেন। প্রকাশক শোনান: ভাই, বাজার দিন দিন কঠিন হচ্ছে, কাগজের দামও আকাশছোঁয়া, তাছাড়া কয় কপি বই-ই বা...! অডিও প্রকাশকের কর্ণধার বলেন, ইউটিউবের বরাতে অ্যালবামের কপালে মড়ক লেগেছে, ও তো কেউ কেনেই না। আর সিনেমা হলগুলো তো পরিণত হয়েছে সুপার মার্কেটে, তাই চলচ্চিত্র দর্শক নাই অজুহাত দিতেই পারেন পরিবেশক। পাঠক নেই, শ্রোতা নেই, দর্শক নেই, তাই রয়্যালিটিও নেই। তবে কি কবি, শিল্পী, চলচ্চিত্রকাররা ঘাস খেয়ে বাঁচবেন? প্রায় তেমন পরামর্শ-ই দেন বাজার নিয়ন্ত্রকরা। কিন্তু পুরো বাজারের চালচিত্র কি এমন? না তো। কতো অসুর সুরের মর্যাদা পায়, কতো অ-কবি কবির সম্মান পায়, কতো ভুল জিনিস প্রতিভা হিসেবে সমাদৃত হয়। প্রতিবেশী দেশের কতো রদ্দি জিনিস শিল্পের মর্যাদা পায়। তাদের পায়ের ধূলো বাংলাদেশের মাটিতে পড়ার আগেই বাজারওয়ালারা টাকাভর্তি থলে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেন। এদের বেলায় টাকার অভাব হয় না। বাজার কী জিনিস খাবে তা ভালোমতো জানা থাকে এনাদের। ফলে বাজারওয়ালারা ওনাদের প্রতি বিশেষভাবে প্রীত। একটি দ্বিতীয়, তৃতীয় রিয়েলিটি শো’র চতুর্থ শ্রেণির ‘তারকা’ নিয়ে যে সীমাহীন আদিখ্যেতা চলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, তা দেখে সৈয়দ মুজতবা আলীর দেশি ঠাকুর ছেড়ে বিদেশি কুকুর ধরার গল্প মনে পড়ে কেবল। দেশের মাটিতে দেশের প্রথমসারির শিল্পীরা অসম্মানিত হন, আদৃত হয় হুজুগের জনপ্রিয়রা। না, এমন আপ্তবাক্য আওড়াতে চাই না যে, যে দেশে প্রতিভাবানের কদর নেই সে দেশে প্রতিভাবান জন্মায় না। যার রক্তের মধ্যে সুর, অ-সুররা তাকে যতো অবহেলাই করুক, সুর ও শিল্পের ধ্যান থেকে, সাধনা থেকে, মগ্নতা থেকে তাকে বিরত রাখা যাবে না। নিয়তি এই যে, জীবদ্দশায় ভ্যান গঁগের একটি ছবিও বিক্রি হবে না, জীবনানন্দ দাস এক পয়সাও রয়্যালিটি পাবেন না, গঁগার মতো শিল্পীরা পালিয়ে যাবেন তাহিতি দ্বীপে আর লাকী আখন্দের মত হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালাকে দেখতে হবে হাসপাতালের করুণ বিছানায়। তাতে কী? তাদের জন্য বরাদ্দ থাকে ‘দু’হাতে টুপি খোলা সালাম’ অথবা ‘গোটা দেশ কাঁদছে আপনার জন্য’ বা ‘...এ ক্ষতি পূরণ হবার নয়’ জাতীয় বাক্য। আছে শহীদ মিনারে দু’ঘন্টার শ্রদ্ধাঞ্জলি। চ্যানেলে চ্যানেলে আধঘণ্টার স্মরণ আয়োজন, নাগরিক শোকসভা, সাহিত্য বা বিনোদন পাতায় এক্সক্লুসিভ ট্রিটমেন্ট। ভাগ্য প্রসন্ন থাকলে জুটে যেতে পারে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত হবার ব্যবস্থাও। তারপর? তারপর ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় শিল্পীর ন্যায্য পাওনার হিসাব, তার সৃষ্টি সংরক্ষণের উদ্যোগ, পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। তিনদিনের এই সম্মান সমাদর আর সারাজীবনের অবহেলা দেখতে কোন্ পরিবার চাইবে তার সন্তান শিল্পী হোক? শিল্পী কারখানায় তৈরি হওয়ার জিনিস নয় ঠিক, কিন্তু এও ঠিক শিল্পী-জীবনের এই করুণ পরিণতি দেখে, কোনো শিশুর মধ্যে শিল্পের প্রতি অনুরাগ দেখলে বাবা-মা প্রাণ দিয়ে প্রতিরোধ করেন ওই অনুরাগের প্রতি আসক্তি। না, স্টারডমের কথা বলছি না। স্টারডমের প্রতি সমাজের পৃষ্ঠপোষকতা আছে। নেই সাধনার প্রতি।

প্রকৃত শিল্পীরা কদাচিত্ দর কষাকষিতে পারঙ্গম হন। শিল্পীদের রয়্যালিটি নিয়ে কয়েকটি শিল্পী সংগঠন যূথবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ কয়েক বছর হলো। সে উদ্যোগ-আয়োজন এখনো রয়ে গেছে অমীমাংসিত। রাস্তায় দশ তরুণের অন্তত সাতজনের কানেই তার গোঁজা দেখি। এমন কী কানে তার গুঁজে থাকার কারণে রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনের নিচে আহত-নিহতের ঘটনাও শোনা যায়। স্নানঘরে না গুনগুনালে যে জাতির স্নান সম্পূর্ণ হয় না, প্রেম নিবেদনে যে জাতির কমন সম্বল গান-কবিতা, সে দুর্ধর্ষ গান পাগল জাতির প্রতিভাবান শিল্পীদের কপালে কেন এতো দুর্দশা? যে জাতির এতো গান পিয়াসা সেই জাতির শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের জীবদ্দশায় কেন দুঃস্থ শিল্পীর তকমা আঁটে? জীবদ্দশার মতো মৃত্যুতেও যাদের আইকনিক ইমেজ পাওয়ার কথা কেন তাদের মৃত্যুকালের ঘটনা পরম্পরা এতো বিপন্ন, এতো নিদানের কাল হয়ে ওঠে?

লেখক :কথাশিল্পী








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com