Friday, 19 January, 2018, 7:22 PM
Home
‘জনগণের কাছ’ থেকে ‘গণতন্ত্র’ রক্ষা!
এ কে এম জাকারিয়া লিখেছেন প্রথম আলোয়
Published : Thursday, 27 April, 2017 at 1:35 PM, Count : 57
দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের মন্দা শুরু হয়েছে বেশ আগেই। এর প্রভাবে গণতন্ত্র তার নাদুসনুদুস চেহারা হারাতে শুরু করে। অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে ভগ্নদশা নিয়ে চলতে থাকা গণতন্ত্রের শরীর আরও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। গণতন্ত্রপ্রেমী তাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের মধ্যে ভয় ঢুকে পড়েছে। গণতন্ত্রকে রক্ষার আওয়াজ উঠেছে। গত বছর ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) গণতন্ত্রের যে সূচক বের করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের মাত্র ৪ দশমিক ৫ শতাংশ জনগণ পূর্ণ গণতন্ত্রের মধ্যে বাস করে। অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী বাস করে পুরো অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। আর বাকি অর্ধেক যেসব দেশে বাস করে, সেখানে গণতন্ত্র রয়েছে, তবে ত্রুটি-বিচ্যুতিও রয়েছে। ইআইইউ ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বের গণতন্ত্রের মান ও অবস্থা ধরে যে সূচক বের করে যাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, গণতন্ত্রের অবস্থা ক্রমে খারাপের দিকেই যাচ্ছে।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন স্বাভাবিকভাবে গণতন্ত্রকে ‘রক্ষার’ প্রশ্নও চলে এসেছে। এ প্রসঙ্গে ইআইইউর আঞ্চলিক পরিচালক (ইউরোপ) জোয়ান হোয়েএক মজার প্রশ্ন তুলেছেন, সবাই গণতন্ত্র রক্ষার কথা বলছেন। কিন্তু গণতন্ত্রকে কার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে? জোয়ান হোয়ের এই মন্তব্য পড়লাম গণতন্ত্র নিয়ে ডগলাস হেভেনের এক প্রতিবেদনে। ‘গণতন্ত্রের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে এই লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিবিসিতে। দীর্ঘ এই প্রবন্ধে তিনি গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক দশা, এর নানা পর্ব ও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিকের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়াসহ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা এখন সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। ইউরোপে গণতন্ত্রের রূপান্তর ঘটছে। মধ্যপ্রাচ্যে আবার কর্তৃত্ববাদী শাসন ফিরে আসছে। নাগরিক অধিকার ছেঁটে ফেলবেন এমন লোকরঞ্জনবাদী নেতারা নির্বাচনে জিতে চলেছেন। উন্নত দেশগুলোতে কয়েক প্রজন্ম ধরে যে মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিল, তা ধসে পড়তে শুরু করেছে।

এই পরিস্থিতিতে জোয়ান হোয়ের আক্ষেপ হচ্ছে রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের মতো দেশগুলোর গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশি মাতামাতি হয় ও হচ্ছে। কিন্তু আসল সমস্যা পশ্চিমে, সবচেয়ে পরিপক্ব গণতন্ত্রের কেন্দ্রে। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প জিতেছেন। এই লোকরঞ্জনবাদী উত্থানের প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেক গণমাধ্যমসহ রাজনৈতিক এলিটদের তরফে আওয়াজ উঠেছে ‘গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে’। জোয়ান হোয়ের তাই প্রশ্ন, গণতন্ত্রকে আসলে কার কাছ থেকে রক্ষা করতে হবে? জনগণের কাছ থেকে? ব্রেক্সিট হয়েছে জনগণের ভোটে, যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পও জিতেছেন জনগণের ভোটে। হোয়ে মনে করেন, ব্রেক্সিটের ঘটনা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের বিষয়। এটা এক যুগান্তকারী ঘটনা। যাঁরা অনেক বছর ভোট দেননি, তাঁরাও ভোট দিতে এসেছিলেন।

হোয়ের এই ধারণার সঙ্গে আরও অনেকেই একমত। ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক ও গণতন্ত্র অধ্যয়নবিষয়ক পণ্ডিত ল্যারি ডায়মন্ড বলেছেন, ‘এক দশক ধরেই আমরা গণতন্ত্রের একধরনের নিয়ন্ত্রিত মন্দাভাব দেখে আসছিলাম। আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। কিন্তু গত বছর সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে পরিপক্ব দেশগুলোতেই এখন গণতন্ত্র বিপদের মধ্যে পড়েছে।’

অনেকেই বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্ভবত এই প্রথমবারের মতো পশ্চিমা বিশ্ব গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য নিয়ে এতটা উদ্বেগের মধ্যে পড়েছে। ইআইইউ গণতন্ত্রের যে সূচক তৈরি করে, তাতে দেশগুলোকে পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র ও গণতন্ত্রহীন রাষ্ট্র হিসেবে ভাগ করা হয়। গত বছরের সর্বশেষ সূচকে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ গণতন্ত্র থেকে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রে নেমে গেছে। এই সূচক করা হয়েছিল ২০১৫ সালের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে। দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের মান কমতে শুরু করেছে।

দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের এই ধারাবাহিক পতন কেন? এমনকি উন্নত ও দীর্ঘ পরীক্ষিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতেও? এর কারণ হিসেবে সাধারণভাবে আর্থিক খাতের সংকট এবং এর ফলে আর্থিক কাটছাঁটের নীতির প্রভাবের কথা বলা হয়। এবং বিশ্ব এখনো সেই প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিবিসিতে প্রকাশিত ডগলাস হেভেনের নিবন্ধে বলা হয়েছে, আর্থিক খাতের সংকট গণতন্ত্রের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে, রাজনৈতিক নেতাদের জনগণ যেভাবে দেখত ও বিবেচনা করত, সেখানে পরিবর্তন হয়েছে। এই ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়, তবে গণতন্ত্রের এই সংকট স্বল্পস্থায়ী হওয়ার কথা। অর্থনীতির অবস্থার উন্নতি হলে রাজনীতির আবার আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার কথা। গণতন্ত্রের
স্বাস্থ্য ভালো হওয়ার কথা। জোয়ান হোয়ে এই মতের সঙ্গে একমত নন। তিনি মনে করেন, গণতন্ত্রের যে বিপদ দেখা যাচ্ছে, তা স্বল্পস্থায়ী কোনো বিষয় নয়। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ গণতন্ত্র থেকে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের দেশে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে ছিল এবং ২০১৫ সালে দেশটি নিচে নেমে গেছে। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী যে সংকট গণতন্ত্রের গভীরে চেপে বসেছে, তার সুবিধাভোগী হচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

তবে এখন ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের বিজয় যে ঝাঁকুনি দিয়েছে, তাকে যদি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচনায় নেওয়া হয়, তবে গণতন্ত্রের সামনের দিনগুলোর জন্য তা ভালো হতে পারে। জোয়ান হোয়ে বলছেন, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে গণতন্ত্রের অবস্থা যে খারাপের দিকে যাচ্ছে, তাকে এত দিন কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি। এখন সবাই যখন এ ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছে, তখন ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই নতুন বাস্তবতায় গণতন্ত্রের যে ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো স্পষ্ট হয়েছে, তাকে অবহেলা করা যাবে না।

‘সংখ্যাগরিষ্ঠের’ গণতন্ত্র যে বিশুদ্ধ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে ও দাঁড়াচ্ছে, তা তো টের পাওয়া যাচ্ছে। রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক ও গণতন্ত্র অধ্যয়নবিষয়ক পণ্ডিত ল্যারি ডায়মন্ড এই দিকটিতে নজর দিতে চেয়েছেন। বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছা যেন প্রকৃত গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্যের দিকটি এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট মুসলিম দেশের অভিবাসীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে ট্রাম্পের পেছনে জনসমর্থন থাকতে পারে। কিন্তু শুধু জনসমর্থনের জোরেই ট্রাম্প হয়তো যা খুশি তা-ই করতে পারবেন না সেখানকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নানা ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থার কারণে। এটা একটা বড় আশার দিক। ‘গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা ও সংবিধান এ ক্ষেত্রে যেসব রক্ষাকবচ দিয়েছে, সেগুলোকে বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ও অধিকাংশ পশ্চিমা দেশের রয়েছে।’ তবে ডায়মন্ড এটাকে ‘নিশ্চিত’ হিসেবে ধরে নিতে চান না।

ব্রেক্সিট ও ট্রাম্পের বিজয় পশ্চিমা বিশ্ব, সেখানকার রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানী, পণ্ডিত ও সচেতন নাগরিকদের যে ঝাঁকি দিয়েছে, তা সেসব দেশের গণতন্ত্রকে ‘পথে’ আনার পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে সেখানকার ব্যবস্থার মধ্যে যে ভারসাম্যমূলক কাঠামো রয়েছে, তা-ও গণতন্ত্রের পতন ঠেকাতে ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু আমাদের মতো ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের দেশ, যেখানে নির্বাচনী ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত ভেঙে পড়েছে, রাষ্ট্রের অঙ্গগুলোর মধ্যে কোনো ভারসাম্যমূলক ব্যবস্থা নেই, বরং আছে নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব করার প্রবণতা—সেসব দেশের সামনে তবে কী অপেক্ষা করছে? আবার আমাদের দেশের সচেতন জনগোষ্ঠী বা বুদ্ধিজীবী মহলেও গণতন্ত্রের এই দশা নিয়ে কোনো রা নেই। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কোনো প্রকাশও নেই।

আগে উল্লেখ করা জোয়ান হোয়ের সেই প্রশ্নে ফিরে আসি। লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির উত্থান দেখে এবং জনগণের ভোটে এ ধরনের নেতাদের নির্বাচিত হতে দেখে তার পরিহাসপূর্ণ প্রশ্নটির মূল কথা হচ্ছে গণতন্ত্রকে কি তবে জনগণের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে? কারণ, ভোটের সুযোগে তো তারা ব্রেক্সিট ঘটিয়ে ফেলে, ট্রাম্পের মতো লোককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে। বাংলাদেশ সম্ভবত এ ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছে এবং বেশ আগেই এই প্রশ্নের সমাধান করে ফেলেছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন আমাদের দেশে হয়েছে, তাতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, জনগণকেও অংশ নিতে হয়নি। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আসলে জোয়ান হোয়ের পরিহাসেরই বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ৫ জানুয়ারি যে ধরনের নির্বাচন হয়েছে, তা ‘জনগণের কাছ’ থেকে ‘গণতন্ত্রকে’ রক্ষা করেছে। তখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলে বা জনগণ তাদের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে কী অঘটন ঘটিয়ে ফেলত, কে জানে!

আবার নির্বাচন আসছে। এ নিয়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। ভাবি, সামনের নির্বাচনে জনগণ ভোটের সুযোগ পেলে যে কোনো ‘অঘটন’ ঘটাবে না, তা কি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে? জনগণ অংশ নিক এমন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অবাধ নির্বাচন নিয়ে সম্ভবত আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলে একটি ভয় রয়েছে। তাই দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের বাজে দশা নিয়ে যখন এত আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক ও উত্তরণের পথ খোঁজার চেষ্টা হচ্ছে, তখন আমরা চুপ আছি। জনগণকে বাদ দিয়ে বা জনগণের কাছ থেকে ‘গণতন্ত্রকে’ বাঁচানোর পথকেই হয়তো দস্তুর মানছি।

আমাদের সামনে তবে কী অপেক্ষা করছে? কেমন হওয়া উচিত বা কেমন হবে আগামী নির্বাচন?

এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com