Sunday, 19 November, 2017, 3:18 AM
Home
কে এই মারি লো পেন?
ফ্রান্সের নির্বাচন
ক্রিস্টিন ওক্রেন্ট লিখেছেন প্রথম আলোয়
Published : Wednesday, 26 April, 2017 at 2:24 PM, Count : 59
ফ্রান্সের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী মারি লো পেন প্রথম যেদিন টেলিভিশনে হাজির হলেন, সেদিনের কথা আমার মনে আছে। ২০০২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আমাকে ফ্রান্সের সরকারি টেলিভিশনে একটি বিতর্ক অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে হয়েছে। রাজনৈতিক ভারসাম্যের জন্য অনুষ্ঠানে অতি ডানপন্থীদের একজন প্রতিনিধির দরকার ছিল। তো, আমরা লো পেনের বাবা জঁ-মারি লো পেনকে আমন্ত্রণ জানাই। কিন্তু জঁ-মারির প্রচারণা ব্যবস্থাপক ব্রুনো গোলিনশ আমাদের আমন্ত্রণ অগ্রাহ্য করে মারিকে পাঠানোর প্রস্তাব দেন।

গণমাধ্যমকে তাঁরা বৈরী মনে করতেন। এ কাজ করে ব্রুনো শুধু গণমাধ্যমের সঙ্গেই চালাকি করলেন না, মারির সঙ্গেও করলেন। কারণ, ব্রুনো মারিকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন। তাঁর অভিযোগ, মারির বাবা তাঁকে অযাচিতভাবে ওপরে টেনে এনেছেন। তখন মারির বয়স ৩৩, আইনজীবী হিসেবে তিনি খুব একটা পরিচিত ছিলেন না, আদালতেও তিনি যেতেন না। তবে গণমাধ্যমে জায়গা পাওয়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল। শেষমেশ ব্রুনোর পরিকল্পনা বুমেরাং হয়ে ওঠে। এক সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের শিরোনাম হয় এ রকম, ‘ন্যাশনাল ফ্রন্টের নতুন কী আছে? মারি!’

২০০২ সালের ২১ এপ্রিল দিনটি ফ্রান্সের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখনো স্মরণীয় হয়ে আছে। প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জঁ-মারি ১৭ শতাংশ ভোট পান। এর মধ্য দিয়ে তিনি সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী লিওনেল জসপাঁকে দ্বিতীয় দফা থেকে বিদায়
করে দেন। কিন্তু তখন সব শ্রেণির নাগরিক লো পেনের বিরুদ্ধে ‘রিপাবলিকান ফ্রন্টের’ মিছিল করেন। ফলে রক্ষণশীল প্রার্থী জ্যাক শিরাক ৮২ শতাংশ ভোট পেয়ে যান।

আজ ১৫ বছর পর মারি লো পেন ২১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তাঁর বাবাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় ভোটে জিততে হলে তাঁকে ইমানুয়েল ম্যাখঁকে হারাতে হবে, যিনি প্রথম দফায় ২৪ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন। তবে ক্ষমতায় যাওয়াটা মারির বাবার জন্য যতটা কঠিন ছিল, তাঁর জন্যও ব্যাপারটা সহজ নয়। রিপাবলিকান ফ্রাঁসোয়া ফিলোঁ ও সমাজতন্ত্রী বেনই হ্যামন ম্যাখঁকে প্রথম দফা নির্বাচনের পর দ্রুতই সমর্থন দিয়েছেন। হ্যামন তো মারি সম্পর্কে বলেছেন, এই নারী ‘রিপাবলিকের শত্রু’।

কিন্তু লো পেন খুব কঠিন। নিজের লক্ষ্যের ওপর তাঁর আস্থা অবিচল। ইতিমধ্যে তিনি ন্যাশনাল ফ্রন্টের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের জন্য যে চেষ্টা করছেন, তাতে এটি কানাগলি থেকে রাজপথের প্রধান আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। যদিও তিনি ন্যাশনাল ফ্রন্টের নাম বদলে ‘ব্লু মেরিন’ করার পক্ষপাতী নন। কারণ, আগের নামের কারণে পুরোনো ভোটারদের মধ্যে এর আবেদন আছে। এই মনোভাব থেকেই বোঝা যায়, তিনি কোন ধরনের রীতি চালু করতে চান। এর জন্য এমনকি তিনি ভাতিজির মতও দমন করেন। তাঁর নাম মারিয়ন লো পেন। তিনিও একজন উঠতি রাজনৈতিক তারকা।

লো পেনের সফলতার মধ্যে আদর্শ পাচারের ব্যাপারও আছে। তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার সঙ্গে তিনি এটা করেছেন। ফ্লোরিয়ান ফ্লিপট নামের এই ব্যক্তির গণমাধ্যম-জ্ঞান যথেষ্ট। তিনি হলফ করে বলেছেন, আদর্শের জন্য নয়, তিনি লো পেনের সঙ্গে যোগ দিতে চান তাঁর প্রতিভার জন্য। বস্তুত এই জুটি ন্যাশনাল ফ্রন্টকে নানা রঙে রাঙিয়েছেন, যার মাধ্যে আছে নীল ও সাদা, লাল তো আছেই।

প্রথম দিকে লো পেন তাঁর বাবার মতোই প্রচারণা চালাতেন। বড় শরীর ও ভ্রুকুটি দিয়ে তিনি প্রতিপক্ষের মনে ভয় ঢুকিয়ে দেন। ধূমপায়ীর মতো ফ্যাসফেসে গলায় তিনি নিজের কথা বলেন, কখনোই নারীবাদের কার্ড খেলেননি তিনি। কিন্তু পরিণামে আবিষ্কার করেন, তিনি আরেকটি ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারতেন। সুবেশী ও মৃদুভাষী হিসেবে তিনি একধরনের ক্যারিশমা তৈরি করেন, যার মাধ্যমে তিনি বিপুলসংখ্যক সমর্থকের কাছে আবেদন করতে পারেন: বেকার তরুণ থেকে শুরু করে মোহভঙ্গ ঘটা মধ্যবিত্ত, নিয়ন্ত্রণ হারানোর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন পুলিশ থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের অভিবাসী; যাঁরা চান, ফ্রান্সের দরজা বিদেশিদের জন্য বন্ধ হয়ে যাক।

ন্যাশনাল ফ্রন্টকে দানবীয় চেহারা থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁকে শুধু বাবার পচা বাগাড়ম্বর বাদ দিলেই হয়নি, বাবাকেও বাদ দিতে হয়েছে। ২০১৫ সালের গ্রীষ্মে মারি তাঁর বাবাকে দল থেকে বহিষ্কার করেন, ১৯৭২ সালে যে দল তাঁর বাবাই গড়ে তুলেছিলেন। বৃদ্ধ বাবা মেয়ের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন, কিন্তু কয়েক মাস পর তিনি আত্মসমর্পণ করেন।

হ্যাঁ, লো পেন সেমিটীয় বিরোধিতা, আলজেরীয় যুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিকি ফ্রান্সের (ফ্রান্সের মুক্তাঞ্চল) গর্বমাখা স্মৃতিচারণা না করলেও জনতুষ্টিবাদের আগুনে ঘি ঢেলেই যাচ্ছেন। তিনি অভিবাসন, ইসলাম, বিশ্বায়ন, বহুসংস্কৃতিবাদ, ন্যাটো, অভিজাত ‘ব্যবস্থা’, বাজার, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিরুদ্ধে গালাগাল করেই যাচ্ছেন। ইউনিয়ন তো তাঁর চোখে দানব, যা ফ্রান্সের সব বিপদের জন্য সম্ভাব্য দায়ী।

তবে এ কথা শুনে কখনো দুঃখ পাবেন না যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ২৩ জন ন্যাশনাল ফ্রন্ট সদস্য ইউনিয়নের কাছ থেকে টাকা পান। শুধু তা-ই নয়, লো পেনের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হচ্ছে, তিনি নাকি এমইপির (মেম্বার অব ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট) ভর্তুকি নয়ছয় করেছেন। অনেক ফরাসি নাগরিকের কাছে আবার মর্যাদার উদ্বেগ, অর্থনৈতিক ক্ষোভ ও সন্ত্রাসবাদের ভীতিই মুখ্য।

লো পেন আন্তর্জাতিক মর্যাদা তৈরিরও চেষ্টা করেছেন। জানুয়ারি মাসে তিনি নিউইয়র্কে অযথাই এই আশায় বসে ছিলেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সঙ্গে দেখা করবেন। ট্রাম্প নাকি তাঁর কিছু কিছু রাজনৈতিক সূত্র ব্যবহার করে নির্বাচনে জিতেছেন। মস্কোতে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁর দলের কর্মকর্তারা দ্রুতই আমাদের ধরিয়ে দেন, টাকা চাইতে নয়, পৃথিবীর পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করতেই তিনি পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন।

যাহোক, ফ্রান্সের ৭৬ লাখ মানুষ এখন স্বীকার করে নিয়েছেন, লো পেন ফ্রান্স শাসন করার জন্য উপযুক্ত। পুনঃ ব্র্যান্ডিং ও উত্তেজক বক্তৃতা দিয়ে তিনি নির্বাচনে জিততে পারবেন না, কিন্তু তিনি ফরাসিদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছেন, যা বহুদিন টিকে যাবে।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।

ক্রিস্টিন ওক্রেন্ট: আরএফআই ও ফ্রান্স ২৪-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা।











« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com