Sunday, 19 November, 2017, 3:28 AM
Home
এখনই নিঃস্ব হাওরবাসীর পাশে দাঁড়াতে হবে
মোস্তাফা জব্বার লিখেছেন ইত্তেফাকে
Published : Wednesday, 26 April, 2017 at 2:24 PM, Count : 76
অকাল বন্যায় হাওরের ফসলহানি নতুন কোনো ঘটনা নয়। গড়ে প্রতি তিন বছরে এক বছরের ফসল হাওরবাসী ঘরে তুলতে পারেন না। সাতটি জেলার কোনো না কোনো উপজেলার কোনো না কোনো হাওরের ফসল প্রতি বছরই নষ্ট হয়। পাহাড়ি ঢল আকস্মিকভাবে উত্তর থেকে নেমে আসে এবং রাতারাতি হাওর ডুবিয়ে দিয়ে যায়। একেবারে উত্তরে সুনামগঞ্জ বিধায় সেই জেলার হাওরগুলোর ওপর চাপটা প্রথমে আসে। সেই এলাকার হাওরগুলো আগে ডোবে। এরপর নেত্রকোণা হয়ে কিশোরগঞ্জ দিয়ে বন্যার পানি নিচের দিকে নামে। অন্যদিকে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হাওরগুলোও এই ঢলে আক্রান্ত হয়ে থাকে। পাহাড়ি ঢলের প্রকৃতি দু’ধরনের। প্রথমটি হচ্ছে ভারত থেকে আহু নদী দিয়ে ঢলের পানি এসে সুরমা ও কুশিয়ারায় প্রবাহিত হতে থাকে। অন্যদিকে হাওর এলাকায় বৃষ্টি হবার ফলে সেই ঢলের পানির উচ্চতাও বাড়তে থাকে। সচরাচর চৈত্র মাসে যদি এই অকাল বন্যা হয় তবে হাওরের ফসলহানির পরিমাণ ব্যাপক হয়। বৈশাখের শেষ দিকে হলে ফসলহানিটা কমে যায়। এবার চৈত্রে এমন সময়ে অকাল বন্যাটি হয় সেই সময়ে বোরো ধান পাকা তো দূরের কথা ধানের শীষটাও পোক্ত হয়নি। ফলে পানিতে ডুবন্ত ফসল ঘরে তোলা দূরে থাক, গরু বাছুরের জন্য খড় সংগ্রহ করাও সম্ভব হয়নি।

এবারের অকাল বন্যার ব্যাপক ক্ষতির মূল কারণ হচ্ছে ধান পোক্ত হবার আগেই হাওরগুলো ডুবে গেছে। গত ২৪ এপ্রিল সকালে আমি বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রতিষ্ঠান হাওর অ্যাডভোকেসি প্লাটফরম থেকে সরকারি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে যেসব তথ্য পেলাম তাতে দেখা যায় যে, এবারের বন্যায় হাওরের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৪ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা বা ডলারে ৫৪৬ মিলিয়ন ডলার। এর মাঝে শস্য ক্ষতি হয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৯৫ হেক্টরের। এই জমির শস্য ক্ষতির পরিমাণ ৪ হাজার ৩৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা, মাছের ক্ষতি ১৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং খড়ের ক্ষতির পরিমাণ ১১৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। এই হিসাবটি পাবার পর শনির হাওর ও পাকনার হাওরও ডুবেছে। কেবলমাত্র সুনামগঞ্জের ১৪২টি হাওরের সবকটির ফসলই ডুবে গেছে। সরকারি এই হিসাবের বিপরীতে হাওরবাসীর ধারণা যে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর দ্বিগুণ।

হাওরের মানুষের জন্য এই সময়টি ভয়ঙ্কর হয়েছে নানা কারণে। হাওরের কৃষক বস্তুত মহাজনী ঋণের জালে বন্দী থাকে। ব্যাংকের চাইতে ১০ বা ২০ গুণ সুদে তারা জমি চাষের জন্য কার্তিক মাস থেকেই ঋণ নিতে থাকে। এসব ঋণ শোধ করা হয় ধানে। ধান কাটার পর ধান দিয়ে ঋণ শোধ করা হয়। কার্তিক মাস থেকে কৃষক যে ঋণ নেয় সেটি কেবল চাষাবাদে নয়, নিজেদের অন্ন জোগানো থেকে সাংসারিক অন্য কাজেও ব্যবহার করা হয়। ধান কাটার পর কাঁচা ধান মহাজনের নৌকায় তুলে দিয়ে কৃষক হয়তো তার ঘরে ছয় মাসের খাবার রাখতে পারে। ছয় মাস আবার সেই মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নেয় এবং একই চক্রে জীবনটা কাটিয়ে দেয়। শত শত বছর ধরে এই অবস্থা বিরাজ করছে। এবারও তাই হাওর তলিয়ে যাওয়ায় ঋণসহ কৃষক তলিয়ে গেছে এবং তার ঘরে পরের ফসল না ওঠা পর্যন্ত খাবার নেই। সন্তানের লেখাপড়া দূরের কথা, সংসার চালানোর মতো নগদ টাকাও নেই তার। গরুর খাবার না থাকায় পানির দামে তাকে গবাদি পশু বেচতে হচ্ছে। দুঃখজনক হচ্ছে যে, এসব প্রাণীর ক্রেতাও এখন হাওর এলাকায় পাওয়া যায় না। সমগ্র হাওর এলাকায় সব কৃষক নিঃস্ব হয়ে পড়ায় কারও পাশে কেউ দাঁড়াতে পারবে সেই অবস্থাটিও নেই।

পুরো প্রক্রিয়াটিতে এটি দুঃখজনক যে এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে মানুষের দুর্নীতি। হাওর এলাকায় হাজার হাজার বাঁধ অস্থায়ীভাবে নির্মাণ করতে হয়। মাটির এই বাঁধগুলো নির্মাণে দুর্নীতিকে এই ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে হাওরের বাঁধগুলো জনগণ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে টিকিয়ে রাখতো। প্রধানত পৌষ মাসে ধান চাষ করে মাঘ মাসেই তারা বাঁধগুলো বেঁধে ফেলতো। প্রতিটি গ্রামের ছেলেবুড়ো সকলে মিলে দল বেঁধে এসব বাঁধ বেঁধে রাখতো। স্বাধীনতার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড এইসব বাঁধের দায়িত্ব গ্রহণ করে। গোড়া থেকেই লক্ষ করা গেছে যে মাঘ মাসে কখনও এসব বাঁধ বাঁধা হয় না। টেন্ডার করা, ঠিকাদার নিয়োগ ও কাজ শুরু করার জন্য টাকার বরাদ্দ করা ইত্যাদি বিলম্বিত হতে হতে এবার চৈত্র মাসেও বাঁধ বাঁধার কাজ শুরুই করা হয়নি। উল্লেখ করা যেতে পারে যে বাঁধগুলো মাটি দিয়ে বাঁধা হয় বলে মাঘ মাসে বাঁধগুলো বাঁধা না হলে সেগুলো শক্ত হয়ে পানির ধাক্কা সামাল দিতে পারে না। এবার আমরা শুনলাম যে নদীর পাড় বা হাওরের বাঁধের চাইতে বেশি উচ্চতায় ঢল আসার ফলেও হাওর রক্ষা করা যায়নি।

সাধারণভাবে এসব কথা বলার পাশাপাশি সবার আগে এটি বলা দরকার যে, এখনই রাষ্ট্রকে কতগুলো জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। হাওর এলাকাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হবে কি হবে না, কি পরিমাণ মানুষ মারা গেলে এটি দুর্গত এলাকা হবে সেটি আমি জানি না। তবে হাওরের মানুষ মারা গেলে তাদের পাশে কবর দেবার জন্য দাঁড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। হাওরের সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিয়ে আমরা বহুদিন যেসব আলোচনা করেছি সেগুলোর কথা পরে বলা যাবে। আপাতত জরুরিভাবে যেসব ব্যবস্থা নিতে হবে সেগুলো হলো:

১) হাওরবাসী হতদরিদ্র ও কামলাদেরকে বিনামূল্যে খাবার দিতে হবে। সরকার পরিবারপ্রতি ৩০ কেজি চাল ও ৫০০ টাকা মাসে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি যথাযথ নয়। একটি পরিবারের গড়ে ৫ জন মানুষের জন্য জনপ্রতি ২০ কেজি করে মাসে অন্তত ১০০ কেজি চাল দরকার এবং কমপক্ষে ৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে দরিদ্র, হতদরিদ্র এবং সম্পন্ন কৃষক ইত্যাদি শ্রেণিতে বিভাজন করে তাদের চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা করা যেতে পারে। হাওরের মানুষদের বাঁচানোর জন্য পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এখানে দেশের অন্য অঞ্চলের চাইতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বহুগুণ শক্তিশালী করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার সরকারি নগদ টাকা বা সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই দুর্নীতির কোনো সুযোগ রাখা যাবে না।

২) হাওরের সকল প্রকারের ঋণ আদায় সামনের ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত স্থগিত করতে হবে এবং চলতি বছরে একজন কৃষক যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছিলেন তার দ্বিগুণ ঋণ সামনের বছর তাকে বিনা সুদে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। এই কাজটি সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন বিষয় হবে। সরকার যদি ব্যাংকগুলোর ঋণ স্থগিত করে তবুও বেসরকারি মহাজনী ঋণের চাপ কৃষকরা কেমন করে সহ্য করবে সেটি অনুধাবন করা কঠিন। এজন্য সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।

৩) চিকিত্সা সুবিধাহীন হাওরের মানুষের শিক্ষা ও চিকিত্সার জন্য সরকারকেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি হাসপাতাল ও কমিউনিটি হাসপাতালে ওষুধসহ সকল পরীক্ষাও বিনে পয়সায় করতে হবে। স্কুলের সকল বেতন মওকুফ ছাড়াও দুপুরে সব স্কুলে খাবার দিতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পড়াশোনা অব্যাহত রাখার জন্য বৃত্তি বা অন্য কোনো আকারে নগদ সহায়তাও দিতে হবে।

৪) হাওরের গবাদি পশুর জন্য বিনামূল্যে/স্বল্পমূল্যে পশুখাদ্য সরবরাহ করতে হবে।

৫) হাওরের মানুষের বাড়িগুলো রক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।

৬) হাওরের জলমহালগুলোর চলতি বছরের ইজারা বাতিল করে পুরো হাওরে এক বছরের জন্য সবাইকে মাছ ধরার সুযোগ করে দিতে হবে।

এইসব পদক্ষেপের পাশাপাশি চলতি বছরের জন্যই এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে কৃষকরা আগামী বছরের চাষাবাদটা করতে পারে। তাদের জন্য বীজ, সার, কীটনাশক ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বাঁধ তৈরি করে সামনের বছরের এবং তারপরের ফসল রক্ষার স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। হাওরের জন্য একটি আলাদা মন্ত্রণালয় বা বিভাগ তৈরি করে তার মাধ্যমে হাওর মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। হতে পারে যে বহুদিন আগে প্রণীত সেই মহাপরিকল্পনা নবায়ন করতে হবে।

n লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক

ই-মেইল: mustafajabbar@gmail.com








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com