Sunday, 19 November, 2017, 3:28 AM
Home
দুই দেশের স্বার্থেই সুসম্পর্ক প্রয়োজন
কাজী শওকত হোসেন লিখেছেন যুগান্তরে
Published : Wednesday, 26 April, 2017 at 2:24 PM, Count : 37
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর ছিল দুই দেশের সরকার ও জনগণের উষ্ণ আন্তরিকতায় ভরপুর এবং সৌহার্দ্য ও মর্যাদাপূর্ণ। এ সফর নানা কারণে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। ভারতীয় প্রথা অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানানোর কথা ছিল প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়ের। কিন্তু শেখ হাসিনার সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে আসছিল দুই দেশের সরকার; এবং পত্রপত্রিকা, রেডিও-টেলিভিশনেও তা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছিল। দুই দেশের জনগণও এটি আগ্রহ সহকারে উপভোগ করছিল। শেখ হাসিনার সফরকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই ছুটে যান দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে। প্রধানমন্ত্রীর লোককল্যাণ মার্গের বাসভবন থেকে বিরাট গাড়িবহর না নিয়ে অত্যন্ত সাদাসিধাভাবে রাস্তা না আটকিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেখ হাসিনাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে চমক সৃষ্টি করেন মোদি। শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে তাকে ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনে যাওয়ার জন্য গাড়িতে তুলে দিয়ে ফিরে যান মোদি। রাষ্ট্রপতির বাসভবনে অতিথি হওয়াও ছিল একটি বড় ঘটনা। বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে এমন সম্মান প্রাপ্তি একটি বিরল ঘটনা।
ভারত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরীক্ষিত বন্ধু। ১৯৭১ সালে বিপদের দিনে আমাদের পাশে থেকে ১ কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা দিয়েছিল তারা। মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অস্ত্র-গোলাবারুদসহ প্রয়োজনীয় সবরকম সহায়তা জুগিয়েছিল। বিশ্বসভায় বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলা, বিশ্ব জনমত গড়ে তোলা- এ সবকিছুর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে ভারত সফলভাবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সব পর্যায়ে সহযোগিতা করেছিল। এ কারণেই আমরা মাত্র ৯ মাস যুদ্ধ করেই স্বাধীন হয়েছি। এ যুদ্ধে ভারতের ১ হাজার ৬৬১ জন সৈন্য প্রাণ হারিয়েছে। শেখ হাসিনা তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়েছেন। ভারত সরকার আমাদের ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে ভাতা ও চিকিৎসা প্রদান এবং বছরে ৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে মাল্টিপল ভিসা প্রদান করবে বলে জানিয়েছে। এটিও একটি বিরল ঘটনা।
ভারতের সঙ্গে আমাদের ফারাক্কা চুক্তি, অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানিবণ্টন প্রশ্নে আলোচনার প্রয়োজন আছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার শেখ হাসিনা সরকার বন্ধ করে দিয়েছে, অতীতে বাংলাদেশের কোনো সরকার যা পারেনি বা করেনি।
শেখ হাসিনার এ সফরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৩৬টি চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাস সার্ভিস ও ট্রেন চলাচলের নতুন পথ উন্মুক্ত হয়েছে। ৪৫ কোটি ডলারের উন্নয়ন ঋণ, ৫০ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে। বিএনপি দেশ বিক্রি করে দেয়ার, ক্ষমতায় টিকে থাকার চুক্তির অভিযোগ তুলে যা বলছে, তা কোনো শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তারা হীনমন্যতায় ভোগে।
প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে যে তিস্তা চুক্তি হবে না তা সবারই জানা ছিল। আলোচনার এজেন্ডায় তিস্তা প্রসঙ্গ ছিল না, তারপরও ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ ব্যাপারে আন্তরিকতার অভাব ছিল না। সব ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো হয়েছিল বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। বর্তমানে ও ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এ কূটনৈতিক তৎপরতা। তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কম চেষ্টা করেননি অতীতে। ২০১১ সালে ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরে আসার শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এ সফরে তার না আসার কথা জানান। গত বছর ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে এসেছিলেন মমতা। তাকে যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হয়েছিল; কিন্তু বাকপটু মমতা বেঁকে বসায় তিস্তা সমস্যার অবসান হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ মমতাকে ভালোবেসেছে একজন বাঙালি তেজস্বী লড়াকু নারী নেত্রী হিসেবে। কিন্তু তিনি তার ভোটের দাবা খেলায় চটুল কথাবার্তা দিয়ে এগিয়ে থাকতে চান সবসময়। আন্তর্জাতিক আইন, ১৯৬৬ সালের হেলসিংকি নীতিমালার ৪ ও ৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভাটির দেশ উজান দেশের অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু মমতা অবিবেচনাপ্রসূত ৫টি প্রায় বুজে যাওয়া নদীর নাম বলেছেন তিস্তার বিকল্প হিসেবে। তোর্সা, ধানসিঁড়ি, জলঢাকা, রায়ডাক, মানসিঁড়ি থেকে পানি দেয়া যায় কিনা সে বিষয়ে সমীক্ষা, বিশেষজ্ঞের মতামত এবং আলোচনা শুরু করা যায় কিনা মত দিয়েছেন। বাংলাদেশ এ বিষয়টিকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ব্যবসায়ী ফোরামের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, চাইলাম পানি পেলাম বিদ্যুৎ, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পানি বণ্টনে। তার এ দৃঢ়চেতা বক্তব্য প্রশংসাযোগ্য।
তিস্তা বাংলাদেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। লালমনিরহাটের দোয়ানীতে তিস্তা ব্যারাজের কাজ শুরু হয় ১৯৯০ সালে। প্রায় ৮ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৯৮ সালে এ প্রকল্প চালু হয়েছিল। এ প্রকল্প থেকে ১২টি উপজেলায় সাড়ে ছয় লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে পানির প্রবাহ ৪০০-৮০০ কিউসেকে নেমে আসায় প্রকল্পটি মুখথুবড়ে পড়েছে। অথচ আগে সর্বনিম্ন সাড়ে চার হাজার কিউসেক পানি প্রবাহিত হতো। ভারত ১৯৯৮ সালে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ শুরু করে এবং কয়েকটি খাল তৈরির মাধ্যমে তিস্তার পানি মহানন্দায় প্রবাহিত করে। উদ্দেশ্য, তিস্তার পানি ব্যবহার করে কুচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, দক্ষিণ দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর ও মালদায় কৃষিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২০০ কিলোমিটার পশ্চিমবঙ্গে, ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশের রংপুর থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ফুলছরিতে ব্রহ্মপুত্র নদে এসে। তিস্তার পানির সুবিধা ভোগ করে ভারতীয় অংশের ৩০ শতাংশ ও বাংলাদেশী অংশের ৭০ শতাংশ মানুষ। তিস্তার পানি সংকটের মূল কারণ, এর উৎস অংশে সিকিম ৫টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প উৎপাদন করেছে। তিস্তাপারের মানুষের প্রতি সেকেন্ডে পানি প্রয়োজন ১৬০০ কিউবিক ফুট। এ পানি সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন শুষ্ক মৌসুমে ভারত কর্তৃক প্রয়োজনীয় পানি ছাড়া। ভারতকে মনে রাখতে হবে, এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটাবে।
কাজী শওকত হোসেন : কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com