Friday, 19 January, 2018, 7:22 PM
Home
হাওরের দুর্যোগে জুজুর রাজনীতি
মোজাম্মেল হোসেন লিখেছেন সমকালে
Published : Wednesday, 26 April, 2017 at 2:24 PM, Count : 41
দেশের উত্তর-পূর্ব অংশে সাতটি জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে যখন আকস্মিক বন্যায় মানুষের দুঃখ-কষ্টের অন্ত নেই; ধান তলানোর পর কতক অংশে মাছ মরে যাওয়া, হাঁস মরে যাওয়া, নিজেরা খেয়ে বাঁচার সঙ্গে পালা গরু-বাছুরকে বাঁচাতে ছোটাছুটি, তখন রাজধানীতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কিছু লোক রাতারাতি বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন। তা যে-সে বিশেষজ্ঞ নন; একেবারে পরমাণু তেজস্ক্রিয়ার উৎস সম্পর্কে বিজ্ঞ। ইউরেনিয়াম বানান করতে পারেন কি-না জানি না, সে রকম লোক বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে তিন কিলোমিটার উজানে মেঘালয়ের রানিকরে 'ওপেন পিট' নামে উন্মুক্ত পদ্ধতির ইউরেনিয়াম খনি আবিষ্কার করে ফেলেছেন এবং জেনে গেছেন, আমাদের যাদুকাটা নদী দিয়ে ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয় দূষণ এসে হাওরের মাছ মেরে ফেলেছে। কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে বড় বড় শিরোনাম দিয়েই এ সন্দেহের খবর পরিবেশন করা হয়েছে। একটি অনলাইন মাধ্যম ও মূলধারার দুটি সংবাদপত্রে গুরুত্ব দিয়ে এ খবর প্রচার করা হয়, একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে প্রধান শিরোনামে। তারা বৈজ্ঞানিক ভাষ্য নেওয়ারও চেষ্টা করেনি। এ রকম খবর জনমনে আতঙ্ক ছড়াতেই পারে। শুধু বন্যার বিপর্যয় নয়; ইউরেনিয়াম তেজস্ক্রিয়া হলে ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তা হতে পারে। তবে এ ঘটনায় সামাজিক গণমাধ্যমে দেখলাম, এ ধরনের প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে ঠাট্টা-মস্করাও করা হচ্ছে। ঠাট্টা করে যারা পোস্ট দিয়েছেন, তারা শিক্ষিত তরুণ-তরুণী।

বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে অঞ্চলটিতে এবার চৈত্রের শেষাংশেই, ২৭ মার্চ থেকে অবাক করা অতিবর্ষণ শুরু হয়। প্রথম সুনামগঞ্জ জেলার নলুয়ার হাওরে ২৯ মার্চ ভোরে বাঁধ ভাঙে। এর পর একে একে সুনামগঞ্জের সব হাওরই ভাঙনের ফলে তলিয়েছে। শেষ দুটি ২২ ও ২৪ এপ্রিল শনির হাওর ও পাগনার হাওর। মৌলভীবাজার জেলার হাকালুকি হাওরের ক্ষতিও বেশি। অন্য জেলাগুলোর হাওরের আংশিক এলাকা। বর্ষায় তো হাওর তলিয়ে সমুদ্রের মতোই হয়ে যায়। কিন্তু এবার বিপর্যয়টা হলো বোরো ধান কাঁচা থাকতেই বন্যা এসে সর্বস্বান্ত করে দিল। প্রথম মাছ মরা ধরা পড়ে ১৬ এপ্রিল, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরে। পরে হাঁস মরা। গন্ধ ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অঞ্চলে কত বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল একাধিক হাওরে পরীক্ষা চালিয়ে জানান, ধান পচে গিয়ে পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে যাওয়া, অক্সিজেন কমে যাওয়া এবং ফসলে ব্যবহৃত কীটনাশক পানিতে মিশে যাওয়া মাছ ও হাঁস মরার কারণ বলে তারা মনে করছেন। কিন্তু ইউরেনিয়াম-তাত্তি্বকরা এ পরীক্ষায় গুরুত্ব না দিতে উৎসাহী।

২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ভৌতবিজ্ঞানী দিলীপ কুমার সাহার নেতৃত্বে একটি অনুসন্ধানী দল ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের পানি পরীক্ষা করে সুনামগঞ্জে জানান, তারা পানিতে ইউরেনিয়াম দূষণের কোনো অস্তিত্ব পাননি। এই দলটি প্রাণিদেহ, মাটি প্রভৃতি নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে।

ইতিমধ্যে এ লেখার দিনে পাওয়া খবর হলো, মাছ ও হাঁসের মৃত্যু থেমে গেছে, গন্ধ কমে গেছে এবং মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণও বেড়েছে। অর্থাৎ প্রাকৃতিক কারণে যে বিপর্যয় হয়েছে এবং বাঁধ রক্ষায় মানুষের গাফিলতির ফলে যে বিপর্যয় বেড়েছে; প্রাকৃতিক নিয়মেই তা থেকে উদ্ধার পাওয়া যাচ্ছে। ইউরেনিয়াম এখানে শয়তান নয়। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, পানিতে প্লাঙ্কটন নামক জীবাণু তৈরি হওয়ায় মাছের উৎপাদন বাড়বে। অর্থাৎ সদাশয় প্রকৃতি আমাদের কিছুটা ক্ষতিপূরণও করবে। প্লাঙ্কটন স্রোতবিহীন বৃহৎ জলাশয় ও সমুদ্রের বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের জীবাণু এবং মাছ ও তিমির খাদ্য।

কিন্তু পরমাণু শক্তি কমিশনের বক্তব্যের পরও ইউরেনিয়াম-তাত্তি্বকরা থেমে নেই। এর কারণ কী?

কারণ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। ভারত-বিরোধিতার পুরনো সহজ রাজনীতি এ দেশে সবসময়ই ছিল। বাস্তব অভিজ্ঞতার কারণে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ছিল। এখন আবার চাঙ্গা করা হচ্ছে। সামনে নির্বাচন পর্যন্ত ভারত-বিরোধিতাকে বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগ-বিরোধিতার জন্য প্রয়োজন হবে। ভারত-জুজু চাঙ্গা করা দরকার।

পরমাণু কমিশনের বক্তব্যের পরও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রাত্যহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সোমবার যে ভাষায় ইউরেনিয়ামতত্ত্ব উপস্থাপন করেন, তাতে পরিষ্কার হয়_ ইউরেনিয়াম বা তজ্জনিত দূষণের মারাত্মক উদ্বেগের চেয়ে ভারত প্রসঙ্গই প্রধান। রিজভী বলেন, '...ইউরেনিয়ামের বিষাক্ত বর্জ্য জনজীবন ও পরিবেশকে বিষাক্ত করে দিচ্ছে। ভারত থেকে আগত এই বর্জ্যের কারণে হাওরের মাছ, পশুপাখি মারা পড়ছে; মানুষের মধ্যে বিপদের অশনিসংকেত বৃদ্ধি করেছে। এই হলো ভারত সফরের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তার প্রিয় বন্ধু ভারতে উপহার।'

এই রাজনৈতিক ভাষার সঙ্গে বিজ্ঞান ও পর্যবেক্ষণের কোনো সম্পর্ক নেই।

ইউরেনিয়ামতত্ত্বের উৎস কী? এর কি একেবারেই ভিত্তি নেই? আছে। মেঘালয়ের রানিকর নদীতে দূষণ সংক্রান্ত সেখানকার খাসিয়া সম্প্রদায়ের কয়েক বছরের পুরনো একটি উদ্বেগ। খাসিয়া ছাত্র ইউনিয়ন এ বিষয়ে মেঘালয় রাজ্য সরকার ও ভারত সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে_ সেখানে ইউরেনিয়াম অনুসন্ধান কার্যক্রম বন্ধ করা হোক। মেঘালয়ে খাসিয়া ছাত্র ইউনিয়নের প্রভাব আছে। দি নর্থইস্ট টুডে (টিএনটি) নামক তাদের ওয়েবসাইটে তাদের প্রতিবাদের খবরগুলো বের হচ্ছে ২০১০ সাল থেকে। ওই বছর রানিকর নদীর পানির রঙ বদলে গেলে ও মাছ মারা গেলে তারা ইউরেনিয়াম অনুসন্ধানকে দায়ী করে। ভারতের ঝাড়খণ্ড ও অল্প্রব্দপ্রদেশে দুটি ইউরেনিয়াম খনি কাজ করছে। দুটিই ভূপৃষ্ঠের অনেক গভীরে পাওয়া ইউরেনিয়াম। ঝাড়খণ্ডে তেজস্ক্রিয়তার ধীর প্রভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম এবং কাক ও মহিষের অজানা রোগ সম্পর্কিত কিছু অভিযোগ উঠেছিল। ইউরেনিয়াম উত্তোলনের জন্য অত্যন্ত কঠোর সাবধানতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর আন্তর্জাতিক মান নির্ধারিত আছে। মেঘালয়ে ইউরেনিয়াম তোলা শুরু হয়নি। ইউরেনিয়াম খনি প্রকল্পের স্থানীয় বিরোধিতা আছে। ভারতের মূলধারার সংবাদপত্রে এ বিরোধিতার খবর ছাপা হয়; কিন্তু রানিকর নদীতে মাছ মরার জন্য ইউরেনিয়ামকে দায়ী করার বিষয়টি গুরুত্ব পায় না। মেঘালয় সরকার ও ভারতের পরমাণু শক্তি কমিশন তদন্ত করে বলেছে, মাঝে মধ্যে মাছ মরার কারণ মাছ ধরার জন্য খাসিয়াদের বিষ ব্যবহার। ইউরেনিয়াম অনুসন্ধান কারণ নয়। ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা যদি রানিকর নদী ও মেঘালয়ে হতো, তাহলে ভারত ও বিদেশেও হৈচৈ হতো।

কোনো অঞ্চলের ছোট কোনো পত্রিকায় প্রকাশিত দুর্বল ভিত্তির খবরকে বিশেষ উদ্দেশ্যে বড় করে রাজনৈতিক হৈচৈ বাধানোর দৃষ্টান্ত নতুন নয়। আমাদের দেশে একাধিকবার এটা হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র সক্রিয় আছে ভারত ও তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালিয়ে মানুষের মনকে বিষিয়ে দেওয়ার জন্য। ১৯৭০-এর দশকের প্রথমদিকে বিএনপির জন্ম হয়নি। জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির মাঠে আসেনি। তখন উগ্র বামপন্থি ও চীনপন্থিরা এ কাজে সক্রিয় ছিল। মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজ খরচে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরকে মাইনমুক্ত করে দিয়ে বড় উপকার করেছিল। চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় কাগজে প্রকাশিত বঙ্গোপসাগরে সোভিয়েত নৌঘাঁটি বলে একটি মতলবি ভুয়া খবর ঢাকার বড় কাগজে প্রকাশ করার পর ওইসব মহল এ নিয়ে তুমুল প্রচারে মেতে উঠেছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর পর নৌঘাঁটি খুঁজে পাওয়া তো দূরের কথা, কেউ এ নিয়ে টুঁ শব্দ তোলেনি। মেঘালয় ছাত্র ইউনিয়নের স্থানীয় ইস্যুকে সুনামগঞ্জের হাওরে ভারতীয় ইউরেনিয়াম আবিষ্কারের জন্য ব্যবহারের সঙ্গে ওই ঘটনার মিল আছে।

তবে এই আবিষ্কারকরা ভূগোলকেও অবজ্ঞা করছে। মেঘালয় থেকে যাদুকাটা নদী এসে সুরমা নদী দিয়ে মেঘনায় গেছে। ঢলের উপচানো পানি টাঙ্গুয়ার-মাটিয়ানায় যেতে পারে। কিন্তু নলুয়া ও দেখার হাওরে যেতে পারে না। উজানে তো যেতে পারে না। নলুয়ার সঙ্গে মেঘালয়ের পাহাড়ি নদীর কোনো সংযোগই নেই। মাছের মড়ক বেশি হয়েছে নলুয়া ও দেখার হাওরে। টাঙ্গুয়ার হাওরে হয়েছে কম। ইউরেনিয়াম-তাত্তি্বকরা এই ভূগোল খেয়াল করেননি। কারণ ভূগোল নয়; তাদের লক্ষ্য রাজনীতি।

সাংবাদিক








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com