Tuesday, 24 October, 2017, 4:26 AM
Home
শিশুর দুরন্তপনাও কি অপরাধ?
মো. আসাদুল্লাহ লিখেছেন সমকালে
Published : Tuesday, 25 April, 2017 at 4:56 PM, Count : 118

শিশুরা পবিত্র। দুরন্তপনা, চঞ্চলতা তাদের বৈশিষ্ট্য। শিশুর চঞ্চলতা অনেক ক্ষেত্রেই শিশুর সুস্থতার, ভালো থাকার নির্ণয়কও বটে। শিশুর স্থবির হয়ে যাওয়া বা চঞ্চলতার ঘাটতি বাবা-মার দুশ্চিন্তার মাত্রাও বাড়িয়ে দেয়। কাজেই শিশু দুরন্তপনায় বেড়ে উঠবে, গতিময়তার মধ্যে বেঁচে থাকবে, সেটাই প্রত্যাশা থাকে। দেশি-বিদেশি অনেক সার্থক ব্যক্তিত্ব জীবনের পথচলা বর্ণনা করতে গিয়ে শৈশবের দুরন্তপনা তুলে আনেন। সাহিত্যিক-কবি-লেখকের সৃষ্টিতে শৈশবের গল্পগাথা অবলীলায় ধরা পড়ে। চাইলেও শৈশব, কৈশোর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটা জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত যে, কেউ অস্বীকার করতে চাইলেও অজান্তেই স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন হতে বাধ্য। জীবনের একেবারেই সূচনালগ্নে গ্রাম্য সব কিশোরের প্রায় একই গল্প থাকে। শুনলে মনে হয় যেন একই গল্প শুনছি। দল বেঁধে স্কুলে যাওয়া, বর্ষা-কাদায় মাখামাখি হয়ে বাড়ি ফেরা, পথের ধারে ঝুলে থাকা জ্যৈষ্ঠের পাকা আমের স্বাদ নেওয়া কিংবা ভাদ্রের গরমে খালের ওপর তৈরি বাঁশের সাঁকোর ওপর থেকে পানিতে লাফালাফি, পড়ন্ত বিকেলে ফুটবল বনে যাওয়া কচি বাতাবিলেবুর আঘাতে মচকানো পা নিয়ে বাড়ি ফেরা, সবার অলক্ষ্যে বিষয়টির সমাধান করার চেষ্টা, বড়দের হুলিয়া উপেক্ষা করে শিক্ষানবিশ সাঁতারুর ভাদ্র-আশ্বিনের ভরা জোয়ারে কলাগাছের ভেলা নিয়ে ছুটে চলা ইত্যাদি। এসব দুরন্তপনায় কোনো দোষ নেই, কোনো অভিযোগ নেই, কোনো সালিশ-বিচার নেই, কোনো আক্ষেপ নেই। আছে শুধু নিজেকে মেলে ধরার স্বাধীনতা, জীবনের মজা বুঝতে পারার স্বাধীনতা, যেমন খুশি তেমন করার স্বাধীনতা, স্বাধীনতা উপভোগ করার স্বাধীনতা। এটাই শৈশবের চিরায়ত বৈশিষ্ট্য। এটাই স্বাভাবিক। গ্রামবাংলার সবাই সেটা জানে এবং অনুভব করে। এটাই পরল্ফপরা। তবে এসব বিষয় হয়তো অতীত হতে চলছে। নগর সংস্কৃতি গ্রামীণ সংস্কৃতিকে গ্রাস করার অভিপ্রায়ে বীরদর্পে এগিয়ে চলছে। সে জন্য মাঝে মধ্যে মনে হয়, শৈশব গ্রামে যতটা ধরা দেয়, তার সিকিভাগও নগর সভ্যতায় অনুপস্থিত। এটা বর্তমান প্রজন্মের জন্য অবশ্যই দুঃখজনক যে, তারা যে পরিবেশে বেড়ে উঠছে, সেখানে দুরন্তপনার কোনো স্থান নেই, স্বীকৃতি নেই, শৈশবের অনাবিল আনন্দে শিহরণ জাগানোর বালাই নেই, জরা-জড়তা কাটিয়ে সাবলীল-স্বাভাবিক হওয়ার ফুরসত নেই, আছে শুধু পারিবারিক-সামাজিক প্রযোজনার জটিল ছকে মনুষ্য নামক রোবট বানানোর অলঙ্ঘনীয় চেষ্টার বিষয়বস্তু হওয়া।
শিশু-কিশোরদের দুরন্তপনা স্বাভাবিক হলেও সমাজ যে সবসময় তার পরিপূর্ণ পরিচর্যা দিতে প্রস্তুত, সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। সমাজে একটি শিশুর স্বভাবসুলভ স্বাভাবিক গতি-প্রকৃতিও সমাজের অন্য কারোর চরম বিরক্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু শিশুর চঞ্চলতা বা দুরন্তপনার খেসারত জীবন দিয়ে দিতে হবে তা-ইবা কে ভেবেছে। কিন্তু এ রকম একটি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়। রাজধানীর শ্যামপুরে ছয় বছরের একটি শিশুকে হত্যা করা হয়। তদন্তে জানা যায়, এই শিশুটি হত্যার পেছনে শিশুর দুরন্তপনাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে, যেটা অনেকের কাছে অসহ্য ছিল। অর্থাৎ শিশুটি চঞ্চল প্রকৃতির হওয়ার কারণে কেউ একজন সেটা সহ্য করতে পারেনি, তাই শিশুটিকে হত্যা করেছে। একই সমাজে একটি শিশুর স্বাভাবিক আচরণের বিপরীতে সমাজের কোনো এক অংশের কী মারাত্মক প্রতিক্রিয়া? ভাবা যায়, শিশুর স্বাভাবিক দুরন্তপনাও তার প্রাণ সংহারের কারণ হতে পারে। তাহলে কি আমরা এমন এক সমাজের সৃষ্টি করছি, যেখানে শিশুর দুরন্তপনাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। এসব অকারণ বা তুচ্ছ কারণেও শিশুর ওপর নির্যাতন থেমে নেই। সমাজের সবার আচরণ এক নয়। মানুষের চিন্তা-চেতনাও আলাদা। কিন্তু তার জন্য নিষ্পাপ, নিরপরাধ একটি শিশুকে কেন তার শিকার হতে হবে, যে তার স্বাভাবিক জীবনধারা অব্যাহত রেখেছিল? দরিদ্র পরিবারের সদস্য হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল? এই শিশুটির দোষটা কী? যে নির্মমভাবে পাথরের আঘাতে করুণভাবে মারা গেল, তার যন্ত্রণা কি আমরা বুঝতে পারি? এ রকম শত শত শিশু অকালে হারিয়ে গেছে ভিন্ন ভিন্নভাবে। কত অস্বাভাবিক মৃত্যু যে কত শত শিশুকে কেড়ে নিয়েছে, তার হিসাব কে দেবে? কত সহজেই এ ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিই আমরা।
বাবা-মার কাছে সন্তান সবসময়ের জন্যই আদরের, ভালোবাসার। সন্তান যতই খারাপ হোক, যত বড়ই হোক, চাকুরে হোক বা বেকার হোক, সন্তানের জন্য তাদের ভালোবাসা কখনও ফুরায় না, শেষ হওয়ার নয়। ভালোবাসার পাশাপাশি সন্তানকে নিয়ে স্বপ্নও দেখেন। সে জন্য বাবা-মা সন্তান আগলে রাখেন। তবে এই আগলে রাখার পদ্ধতিও ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। কখনও কখনও শাসন করার ধরনকে নির্যাতনের সমকক্ষ হিসেবে গণ্য করেন অনেকে। বড়দের নিষ্ঠুরতার কাছে শিশুরা সবচেয়ে অসহায়। সেই নিষ্ঠুরতা অনেক সময় বাবা-মার কাছ থেকেও আসে, বাইরের মানুষ থেকেও আসে। সব থেকে প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে সুরক্ষা। শিশুরা নিরাপদ নয়। শিশুর নিরাপত্তা খুব জরুরি। শান্তিপূর্ণভাবে বাস করার নিরাপত্তা। স্কুলে যাওয়া-আসার নিরাপত্তা। খেলাধুলা-বিনোদনের নিরাপত্তা। মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার নিরাপত্তা। স্বাভাবিক সুস্থ জীবনযাপন করার নিরাপত্তা। এসব বিষয়ে ভাবা দরকার। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য একটি সুস্থ-স্বাভাবিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারিনি। তাদের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী সৃষ্টির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। আইনের যথাযথ ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারিনি। সে জন্য শিশুরা নানাবিধ নির্যাতনের শিকার হলেও তার সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না। শিশুরা ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। কোথাও কোনো একটি নৃশংস ঘটনা ঘটলে তার পরপরই একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। যে কারণে একইভাবে পরপর অনেক শিশু নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। পাড়া-প্রতিবেশী, স্বামী-স্ত্রী এমনকি এলাকাভিত্তিক শত্রুতার শিকারও হচ্ছে এখন শিশুরা। অপরাধ করে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। রাজনের মতো দু-একটি ঘটনার দ্রুত বিচারের রায় হচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। যে কারণে দিন দিন অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া পরিবারে শিশুর সামনেই বাবা-মায়ের কলহ-বিবাদসহ নানা ধরনের নির্যাতন চলছে, যা শিশুরা শিখছে। বড় হয়ে এসব শিশু হত্যাকারী, নির্যাতনকারী হয়ে উঠছে। বিদ্যমান এই সামাজিক অবস্থায় শিশুর বেড়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে কীভাবে? তাই শিশুর প্রতি নির্যাতন বন্ধে ব্যক্তিগত-পারিবারিক-সামাজিক-রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীলতার ক্ষেত্র তৈরি হোক। এটাই প্রত্যাশা।
ashadullah.bd@gmail.com
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক







« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com