Friday, 19 January, 2018, 7:21 PM
Home
আগামী নির্বাচনে ধর্মীয় রাজনীতির ভূমিকা
বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন সমকালে
Published : Tuesday, 25 April, 2017 at 4:56 PM, Count : 86
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ধারণা, আগামী সাধারণ নির্বাচনে ধর্ম খুব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখা দেবে। কে কতখানি ধর্মের পাবন্দ বা ধর্মীয় রাজনীতির সপক্ষে, এটা নির্বাচনে বড় রকম বিবেচনার বিষয় হবে। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এ ধারণার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। এ কথা ঠিক যে, '৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করার সময় স্বাধীন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ যেভাবে স্বাস্থ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা, বিশেষত জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা পাবেন মনে করেছিলেন, সেটা না পেয়ে 'ইহকালে' যা পাওয়া গেল না পরকালে তা পাওয়ার চিন্তা থেকে অনেকে নামাজ, রোজাসহ অন্যান্য ধর্মকর্ম আগের থেকে অনেক বেশি করছেন। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারের দ্বারা তাদের অবস্থার উন্নতি হবে, এটা তারা মনে করেন। এটা যে হয় না, তা তারা পাকিস্তান আমলে ভালোভাবেই বুঝেছিলেন এবং পাকিস্তান এ দেশ থেকে উৎখাত হয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সেটাই।

পাকিস্তান আমলে জীবনধারণের সাধারণ অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা এমনভাবে বঞ্চিত ছিলেন, যাতে বড় কিছু আশা করাও তখন তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জনগণের ওপর এক সর্বাত্মক ফ্যাসিস্ট সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করার পর এ দেশের জনগণ তাদের শাসন এ দেশ থেকে উৎখাতের জন্য মাঠে নেমেছিল। একতরফা আক্রমণ প্রতিরোধ করতে গিয়ে তারা বাংলাদেশকে পরিণত করেছিল এক যুদ্ধক্ষেত্রে। তারা পাকিস্তানিদের এ দেশ থেকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছিল।

অনেকের ধারণা, এ দেশের জনগণ পাকিস্তানি আমলের স্মৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় এ দেশের জনগণ যে চেতনার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল, যে আশা-আকাঙ্ক্ষা তাদের মনে জাগ্রত হয়েছিল, সেসবই এখন শুকিয়ে গেছে এবং বাংলাদেশের জনগণ আবার ধর্মের রাজনীতিতে ফেরত গিয়ে তাদের অবস্থা পরিবর্তনের চিন্তা করছে! এর থেকে ভ্রান্ত রাজনৈতিক চিন্তা আর হতে পারে না। কাজেই এই হিসাবের ওপর দাঁড়িয়ে যারা আগামী নির্বাচনে নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করবেন, তারা বড় আকারে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ নিয়ে অন্য চিন্তার অবকাশ নেই।

নামাজ, রোজা করা লোকের সংখ্যা বৃদ্ধি, নানা ধরনের পীর, হজরত-মওলানা, আলেম-ফাজেলের সংখ্যা বৃদ্ধি ও তাদের ছাঁচে ঢালা ধর্ম প্রচার অথবা ধর্মের নামে জঙ্গি হামলা কোনো কিছুই বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতিকে আর এমন জায়গায় আনতে পারবে না, যাতে সেটা নির্বাচনে কোনো নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে। 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'র নাম করে যতই তার বরখেলাপ কাজ শাসক শ্রেণি কর্তৃক করা হোক, যে চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল তার কোনো পরিবর্তন সাধারণ মানুষের মধ্যে ঘটেনি। উপরন্তু সে চেতনা মানুষের মনে যে নতুন আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছিল, সে আশা-আকাঙ্ক্ষা আরও গভীরতা লাভ করেছে, আশা-আকাঙ্ক্ষার পরিধি আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। মানুষের চিন্তার এই পরিবর্তন মোটেই উপেক্ষার বিষয় নয়।

যারা ক্ষমতায় ভাগ বসিয়ে পরম সুখে আছে, তাদের চিন্তা হলো_ কীভাবে তারা দুর্নীতি করবে, কীভাবে সন্ত্রাস করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করবে, কীভাবে অন্যের সম্পত্তির ওপর হামলা করবে, কীভাবে তাদের জমিজমা, জলাশয় দখল করবে, কীভাবে ব্যাংকে জনগণের গচ্ছিত রাখা টাকাকড়ি ঋণ নিয়ে উধাও হবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের চিন্তা? তার সঙ্গে কি এসব লোকের চিন্তা-ভাবনা ও কার্যকলাপের সম্পর্ক আছে? চিন্তা করে দেখুন, সিলেটের হাওরগুলোতে পানি দূষিত হয়ে এবং হঠাৎ বন্যার পানি ঢুকে যাদের ফসল ও মাছ ধ্বংস হচ্ছে, তারা কি ধর্ম নিয়ে চিন্তা করছে, না তারা নিজেদের জীবন-জীবিকার কথা ভেবে অস্থির আছে? যাদেরকে জমিজমা থেকে উৎখাত করা হচ্ছে, তারা কি ভাবছে আগামী নির্বাচনে কোনো ধর্মীয় দলকে ভোট দেওয়ার? এ কথা কে না জানে যে, জামায়াতে ইসলামী যতই ধর্মের কথা বলুক, এ দেশে ইসলাম ডুবে যাচ্ছে বলে ইসলাম রক্ষার রাজনীতি করুক, মানুষ তো তাদেরকে ভোট দেয় না। যে ভোট তারা পায় সেটা দিয়ে ক্ষমতা দখল করার প্রশ্ন ওঠে না।

বিএনপিকে যতই ধর্মীয় দল হিসেবে চিত্রিত করা হোক এবং তারা ধর্মীয় দলের সঙ্গে যতই গাঁটছড়া বাঁধুক, তারা ১৯৯১ সালে কি ধর্মীয় রাজনীতির জোরে ক্ষমতায় এসেছিল? ১৯৯১ সালে তারা ক্ষমতায় এসেছিল এরশাদ সরকারের সঙ্গে কোনো রকম আপস না করে তাদের একটানা বিরোধিতার কারণে। ২০০১ সালে তারা ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনগণের নেতিবাচক ভোটের কারণে। ঠিক যেভাবে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপির বিরুদ্ধে জনগণের নেতিবাচক ভোটের জোরে। এসব বিষয় উপেক্ষা বা অবজ্ঞার অর্থ হলো, দেশের বাস্তব অবস্থার দিকে না তাকিয়ে এক ধরনের ইচ্ছাপূরণ চিন্তা। এ ধরনের চিন্তা প্রকৃত পরিস্থিতির চরিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে একেবারেই অকার্যকর।

এ দেশের মানুষ যে পরিস্থিতিতে নির্বাচনে ভোট দেয়, বিশেষ করে নির্বাচন যেভাবে পরিচালিত হয়, তাতে জনগণের প্রকৃত স্বার্থ কোনোভাবেই তার দ্বারা পূর্ণ হয় না। কিন্তু তবু নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন হলে এবং নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বেশি হস্তক্ষেপ করতে না পারলে সাধারণ মানুষ ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রতিক্রিয়া ঠিকই ব্যক্ত করে থাকে। কারণ জনগণকে নির্বাচনের সময় যতই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক, ক্ষমতার গদিতে বসে কোনো সরকারই জনগণের দিকে তাকায় না। জনগণের স্বার্থের চিন্তা তাদের মাথা থেকে উধাও হয়। নিজেদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক আখের গোছাতেই তারা ব্যস্ত থাকে। এসব দেখেই অন্য কিছু না পারলেও ক্ষমতাসীন দলকে একভাবে শাস্তি দেওয়ার জন্য নেতিবাচক ভোট দিয়ে তারা তাকে উচ্ছেদ করে।

ক্ষমতাসীনরা দেশের কত উন্নয়ন করেছে বলে অহরহ বক্তৃতা-বিবৃতি দেন, তাদের ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা এ নিয়ে অনেক গুরুগম্ভীর ও পণ্ডিতি আলোচনা করেন সভা-সমিতিতে ও নিজেদের লেখার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন বলতে বোঝায় কলকাখানার সংখ্যা বৃদ্ধি, রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ইত্যাদি শহরে বড় বড় ইমারত এবং সব শ্রেণির লোকের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা, বড় বড় ব্যয়বহুল হাসপাতাল, মাসিক হাজার হাজার টাকা বেতনের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি, কোটি কোটি, এমনকি শত শত ও হাজার হাজার কোটি টাকার মালিকের ছড়াছড়ি। এভাবে উন্নয়নের সামান্য ছিটেফোঁটা জনগণের ভাগ্যে জোটে। কৃষি উৎপাদন ক্ষেত্রে যে বিরাট সাফল্যের কথা বলা হয়, তার মূল কৃতিত্ব কৃষক ও ক্ষেতমজুরদের। শিল্পের যে উন্নতির কথা বলা হয় তার মূলে আছে সারাবিশ্বে সব থেকে অল্প মজুরি পাওয়া শোষিত ও নির্যাতিত শ্রমিকদের শ্রম। উন্নয়নের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের জন্য কর্ম সৃষ্টির কথা বলা হয়। কিন্তু এই কর্মসৃষ্টি কি শ্রমিকদের স্বার্থে করা হয়, যা করা হয় স্বল্পতম মজুরিতে উৎপাদন করে বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের জন্য? এসবই ভেবে দেখার বিষয়। এসব দিক বিবেচনা করলেই বোঝা যাবে, নির্বাচনকে ভোটাররা কোনো দলের প্রতি ভালোবাসা বা পক্ষপাতিত্বের কারণে তাদেরকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে ক্ষমতাসীন করে না। আসলে নির্বাচন তাদের জন্য হয় ক্ষোভ প্রকাশের একমাত্র সুযোগ। এই ক্ষোভের সুবিধা লাভ করেই নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতাসীন হয়।

এসব দিক বিবেচনা করলেই বোঝার কোনো অসুবিধা হয় না যে, নির্বাচনে ধর্মের ভূমিকা নিতান্তই সামান্য ও প্রান্তিক ছাড়া আর কিছু নয়। কাজেই নির্বাচনের সময় কোনো বড় দল নানা রঙের ধর্মীয় দল বা সংস্থার সঙ্গে জোট বাঁধলেও নির্বাচনের ওপর তার প্রভাব কোনো নির্ধারক ভূমিকাই পালন করে না। ধর্মীয় দল বা সংস্থার সঙ্গে এভাবে গাঁটছড়া বেঁধে কোনো দলের সুবিধা না হলেও যেসব ধর্মীয় দলের সঙ্গে এই গাঁটছড়া বাঁধা হয়, তাদের অনেক সুবিধা হয়। তারা বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এই ভ্রান্ত নীতি থেকে ফায়দা আদায় করে, যেভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা হেফাজতে ইসলাম এখন কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি আদায় করেছে এবং তাদের সর্বোচ্চ ডিগ্রিকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ডিগ্রির সমতুল্য হিসেবে স্বীকৃতি আদায় করে প্রায় অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত কওমি মাদ্রাসা পাস ছাত্রদের জন্য সরকারের প্রশাসন এবং অন্যত্র চাকরির ব্যবস্থা করেছে। এর দ্বারা বিদ্যমান নৈরাজ্যিক প্রশাসনের বিশৃঙ্খলতা আরও বৃদ্ধি হওয়ার শর্তই তৈরি হয়েছে।

আগামী নির্বাচনের কথাবার্তা এখন শুরু হয়েছে। যদি এই নির্বাচন ২০১৪ সালের মতো আজ্ঞা পালনকারী নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্ব, পুলিশের তদারকিতে না হয়ে কিছুটা নিরপেক্ষ হয়, তাহলে তার মাধ্যমে জনগণ ধর্মের প্রতি ভালোবাসা ব্যক্ত নয়, নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের একটা সুযোগ পাবে।

২৪.৪.২০১৭

সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com