Friday, 19 January, 2018, 7:21 PM
Home
 কওমি সনদের স্বীকৃতি ও হেফাজত বিতর্ক
মো. জাকির হোসেন লিখেছেন কালেরকন্ঠে
Published : Tuesday, 25 April, 2017 at 4:56 PM, Count : 31
কওমি মাদরাসার সনদ দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি প্রদানের প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর জোর তর্কবিতর্ক চলছে। কেউ বলছেন এটি শুধুই ভোটের রাজনীতি। আবার অনেকেই এটিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দর্শনের বিপরীত বলে মন্তব্য করছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষী বিএনপি নেতারা সনদ স্বীকৃতির আড়ালে হেফাজতকে কাছে টানা ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের জন্য বিপদের কারণ হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন। কেউ কেউ বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছেন। রাজনীতির অঙ্গন থেকে বুদ্ধিজীবী ও সুধীদের প্রাঙ্গণ, সংবাদপত্র থেকে টেলিভিশনের টক শো—সবখানেই হাজির কওমি ও হেফাজত। আমি অধমও কুলুপ আঁটা নীরবতার অবসান ঘটানোর লোভ সামলাতে পারলাম না। বাংলাদেশে কওমির দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি প্রদানের উদ্যোগ এটিই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৬ সালে বিএনপি সরকার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণা দিলেও এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য হয়েছিল বলে আমার জানা নেই। বিষয়টি এমন যে বিএনপি এ ধরনের উদ্যোগ নিতেই পারে, তাই বলে আওয়ামী লীগ কেন করবে?

যা-ই হোক, কওমি সনদের স্বীকৃতিকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক ভুলের ফাঁদে আটকা পড়েছে বলে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। বিতর্কে কওমি মাদরাসা ও হেফাজতকে একত্রে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। কওমি মাদরাসা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যার গোড়াপত্তন ১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দে হজরত কাসেম নানুতবি, রশিদ আহম্মদ হাঙ্গুহি ও হাজি আবেদ হুসাইন (রহ.)-এর উদ্যোগ ও নেতৃত্বে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এটিই বিশ্বের সর্বপ্রথম কওমি মাদরাসা। এরপর দেওবন্দের দর্শন, পঠন-পাঠন ও সিলেবাস অনুসরণ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কওমি মাদরাসার সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯০১ সালে বাংলাদেশের প্রথম কওমি মাদরাসা ‘দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম’ চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর ১৯৩৭ সালে ‘আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া’ প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের পটিয়ায়। বাংলাদেশে বিদ্যমান কওমি মাদরাসার সংখ্যা ও এসব মাদরাসায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী সারা দেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদরাসা আছে। সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। অধ্যাপক আবুল বারকাতের মতে, দেশে মোট ৫৫ হাজার কওমি মাদরাসা রয়েছে। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের মতে, দেশে ২৬ থেকে ২৮ হাজার কওমি মাদরাসা রয়েছে। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর বৃহত্তম শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিলের ২০১২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের অধীনে ২০ হাজারেরও বেশি কওমি মাদরাসা রয়েছে। কওমি মাদরাসা ও এর শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির একটি অন্যতম কারণ হতে পারে এই যে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ছাড়াও কওমি কারিকুলামে মসজিদ, মক্তব ও ফোরকানিয়া মাদরাসাকেন্দ্রিক লাখ লাখ প্রতিষ্ঠানে কওমি ধারার শিক্ষা দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, শুধু ইসলামী শিক্ষা বিস্তারই কওমি মাদরাসা স্থাপনের উদ্দেশ্য ছিল না। ১৮৫৭ সালে ঐতিহাসিক সিপাহি বিপ্লবের পর ৩৪ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম ঐক্যবদ্ধভাবে ব্রিটিশদের প্রতিরোধের ডাক দেন। ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে প্রতিরোধ আন্দোলনে বিপুলসংখ্যক আলেম (এক হিসাবে ৭১ হাজার ৫০০ জন) নিহত হলে ইসলামের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞানে সমৃদ্ধ আলেম তৈরি অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা পরিকল্পনা করেছিল ধীরে ধীরে এই উপমহাদেশের মানুষের চিন্তা-চেতনা ও মানসিকতায় আমূল পরিবর্তন আনয়ন করা। বিশেষ করে ইসলামের শিক্ষার ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন করা, যাতে মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় অনুশাসন, স্বকীয় সভ্যতা ও দীপ্তিমান অতীত ভুলে গিয়ে অদূর ভবিষ্যতে নিজেকে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে মূল্যায়ন করতে না পারে এবং এর মাধ্যমে তাদের চিন্তা-চেতনা ও মেধা-মননে পাশ্চাতের চতুর্মুখী প্রভাব বদ্ধমূল হয়। এই হীন উদ্দেশ্য সফল করার সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছিল মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা। এর প্রমাণ মেলে সুলতান মুহাম্মদ তুঘলকের শাসনামলে শুধু দিল্লিতেই যেখানে সহস্রাধিক মাদরাসা ছিল সেখানে ফিরিঙ্গি আগ্রাসনের পর পুরো ভারতবর্ষে মাদরাসার সংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। ঔপনিবেশিক শাসকদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে লর্ড ম্যাকলে এ দেশের মানুষের জন্য এক নতুন শিক্ষানীতির সুপারিশ করেন। লর্ড ম্যাকলে তাঁর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নসংক্রান্ত এক প্রবন্ধে স্পষ্ট ভাষায় এ বিষয়ে বলেন, ‘এখন আমাদের কর্তব্য হলো, এমন এক দল লোক তৈরি করা, যারা আমাদের অধিকৃত অঞ্চলের অধিবাসী ও আমাদের মাঝে দোভাষীর দায়িত্ব পালন করবে। যারা রক্ত ও বর্ণে হিন্দুস্তানি হলেও চিন্তা-চেতনা, মেধা-মনন ও চারিত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে হবে ইংরেজ। ’ দূরদর্শী উলামায়ে কেরাম এই সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত ও তার ভয়াবহতা সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, এহেন পরিস্থিতিতে মুসলমানদের দ্বিন-ঈমান রক্ষার্থে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে তাঁরা স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। তাই ব্রিটিশদের প্রবর্তিত পশ্চিমা শিক্ষা, আগ্রাসী সভ্যতা ও ভোগবাদী সংস্কৃতির মোহময়তার আবরণে সাম্রাজ্যবাদী দুরাকাঙ্ক্ষা থেকে মুসলমানদের ঈমান-আকিদা রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে আবির্ভূত হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ইংরেজদের নব উদ্ভূত শিক্ষানীতির ধ্বংসের হাত থেকে মুসলিম জাতিকে রক্ষার উদ্দেশ্যে কতিপয় আলেম দেওবন্দে কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল একটি প্রতিবাদ, একটি বিপ্লব, একটি আন্দোলন।

অন্যদিকে ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি গঠিত হেফাজতে ইসলাম একটি ইসলামী আন্দোলনভিত্তিক সংগঠন। চট্টগ্রামের প্রায় ১০০টি কওমি মাদরাসার শিক্ষকদের নিয়ে এ সংগঠন গঠিত হয়। সংগঠনটি ২০১০ সালে বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির বিরোধিতার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। হাটহাজারী মাদরাসার পরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ইজহারুল ইসলাম সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা। হেফাজতে ইসলাম নিজেকে অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করলেও এটি জাতীয় রাজনীতি দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। হেফাজতের অনেক নেতা বিএনপি-জামায়াতের ২০ দলীয় জোটের হেফাজতকারীও বটে। ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের ঢাকার উপকণ্ঠ ঘেরাও, তারপর সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে শাপলা চত্বরে কিছু সময় অবস্থানের অনুমতি নিয়ে সরকারের পতনের উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের সিদ্ধান্ত, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার হেফাজতকে খাদ্য-পানীয় দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা এবং হেফাজতের দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে বিএনপির নেতাকর্মীদের রাস্তায় নেমে আসার ঘোষণা, শাপলা চত্বরে সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অভিযানে হাজার হাজার হেফাজতকর্মীকে হত্যার মিথ্যা গুজব রটানো, জীবিত হেফাজতকর্মীকে মৃতদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে শাপলা চত্বরে নিহতদের তালিকা প্রকাশ—পুরোটাই অপরাজনীতি, কোনোভাবেই ইসলামী অন্দোলন নয়। হেফাজতে ইসলামের রাজনীতি নিয়ে একাধিক কওমি আলেমও অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। কাজেই হেফাজতে ইসলাম ও কওমি মাদরাসাকে গুলিয়ে ফেলা যৌক্তিক বিতর্ক নয়।

দ্বিতীয় বিতর্ক, কওমি সনদের স্বীকৃতি মূলত ভোটের রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী একটি রাজনৈতিক দলেরও প্রধান। রাজনৈতিক দলের প্রধান হিসেবে ভোটের রাজনীতি অপ্রাসঙ্গিক নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি দলীয় নীতি-আদর্শের সঙ্গে কতটা সাযুজ্যপূর্ণ? বিতর্কটা এখানেই। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে ভোটারদের মোটা দাগে সাত ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এক. সচেতনভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল শক্তি, আওয়ামী লীগকে যারা ভোট দেয়। দুই. বেশির ভাগ ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটার, যাঁরা আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। তিন. ধর্মনিরপেক্ষতায় প্রবলভাবে বিশ্বাসী দলটিও আওয়ামী লীগকেও ভোট দিতে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছন্দ বোধ করে। চার. আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্কের কারণে ভারতবিরোধী তথা হিন্দুত্ববাদবিরোধী ভোটার, যাঁরা বিএনপিকে ভোট দেন। পাঁচ. ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মের নামে রাজনীতিতে যুক্ত বা এর প্রতি সহানুভূতিশীল ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেন। ছয়. পাকিস্তানপন্থী ভোটারদের একটি দল বিএনপি ও এর জোটকে ভোট দেয়। সাত. দোদুল্যমান ভোটারদের দলটি পরিস্থিতি-প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ভোটের সিদ্ধান্ত নেয়। জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ধর্মনিরপেক্ষ ও ইসলামবিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত আর বিএনপি ইসলামী ভাবধারার তথা ইসলামের প্রতি সহানুভূতিশীল, ভারতবিদ্বেষী ও পাকিস্তানদরদি হিসেবে পরিচিত। এই অবস্থায় হেফাজতকে কাছে টানার রাজনীতি তথা হেফাজতপ্রীতি আওয়ামী লীগের ভোটের রাজনীতিতে খুব একটা লাভজনক হবে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর হেফাজত-বিএনপি গোপন যোগাযোগ তারই ইঙ্গিত দেয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি হেফাজতের দুজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতারা। গোপন ওই বৈঠকে হেফাজতের পক্ষ থেকে জানানো হয় বিএনপি নেতারা কোনোভাবে যেন তাদের ভুল না বোঝেন। কেননা কৌশলগত কিছু কারণে দাবি আদায়ে সরকারের সঙ্গে তারা সাময়িক সখ্য গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু আদর্শিক বা মানসিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে হেফাজতের গভীর সম্পর্ক হওয়ার সুযোগ নেই। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে বেখবর নন বলেই আমার ধারণা। তাই কওমির সনদের স্বীকৃতি হেফাজতপ্রীতি নয়, বরং স্থিতিশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অধিকারের স্বীকৃতি বটে।

কওমির দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি প্রদানে যাঁরা ক্ষুব্ধ, বিস্মিত হয়েছেন তাঁরা কওমির সিলেবাস, পরীক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। অনেকে মন্তব্য করছেন এসএসসি, এইচএসসি, ডিগ্রি পাস না করে কিভাবে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন সম্ভব? বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯টি শিক্ষা বোর্ড আছে। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ, সংক্ষেপে বেফাক হলো বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলোর বৃহত্তম বোর্ড। কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও মাস্টার ডিগ্রি স্তর রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা হলো কোরআন তিলাওয়াত ও ইসলামিয়াতসহ গণিত, বাংলা, ইংরেজি, সমাজবিজ্ঞান প্রভৃতি পঞ্চম শ্রেণির মান পর্যন্ত। একে বলা হয় আল-মারহালাতুল ইবতিদাইয়্যাহ বা কওমি প্রাইমারি/প্রাইমারি মাদরাসা। নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে রয়েছে সাধারণ শিক্ষাসহ ইসলামিক শিক্ষা। অর্থাৎ আরবি ভাষা, আরবি ব্যাকরণ ও ফিকাহ শাস্ত্র, গণিত, বাংলা, ইংরেজি, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল ও বিজ্ঞান। একে বলা হয় মারহালাতুল মুতাওয়াসসিতাহ। নিম্ন মাধ্যমিকে তিন বছর অর্থাৎ ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করতে হয়। আল-মারহালাতুস সানাবিয়াতুল হলো মাধ্যমিক স্তর। এতে রয়েছে দুই বছর যথা, নবম ও দশম শ্রেণি। আল-মারহালাতুস সানাবিয়াহ্ আল-উলইয়াকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর বলা হয়। এতে মোট দুই বছর একাদশ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করতে হয়। স্নাতক ডিগ্রিকে মারহালাতুল ফজিলাত বলা হয়। দুই বছর মেয়াদি এ ডিগ্রিতে রয়েছে বিষয়ভিত্তিক ডিপ্লোমা ও গবেষণামূলক শিক্ষা কোর্স, যথা হাদিস, তাফসির, ফিকহ, ফতোয়া, তাজবিদ, আরবি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি, উর্দু ও ফারসি ভাষা, ইসলামের ইতিহাস ও সিরাত, ইলমুল কালাম, ইসলামী দর্শন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, পৌরবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ের গবেষণামূলক শিক্ষা। মারহালাতুল তাকমিলকে মাস্টার ডিগ্রি বলা হয়। এটি এক-দুই বছর মেয়াদি ডিগ্রি। এ স্তরকে দাওরায়ে হাদিস বলা হয়। কওমি শিক্ষাব্যবস্থার নানা স্তর বলে দিচ্ছে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করতে হলে অনেক ধাপ পেরিয়ে তবেই তা অর্জন করতে হয়। তাদের মতো করে এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক সবই রয়েছে। সাধারণ শিক্ষায় ১৫-১৭ বছর অধ্যয়ন করে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করা যায়। আর কওমি মাদরাসায়ও ১৫-১৬ বছর অধ্যয়ন শেষে দাওরায়ে হাদিস তথা মাস্টার ডিগ্রি অর্জনের বিধান রয়েছে। প্রশ্ন হলো শিক্ষা বোর্ড স্নাতক ও মাস্টার ডিগ্রি প্রদান করতে পারে কি না? আমার জানামতে, কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৩ সালের খসড়ায় উল্লেখ ছিল, যত দিন পর্যন্ত কওমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা না হবে তত দিন পর্যন্ত মাদরাসা বোর্ডের আদলে গঠিত কওমি মাদরাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ স্নাতক-সম্মান ও স্নাতকোত্তরের সনদ দেবে।

পবিত্র কোরআনে দ্বিনের শিক্ষা অর্জনের গুরুত্ব ও তার প্রতি উদ্বুদ্ধ হওয়ার কথা এবং তার পদ্ধতির কথা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তাদের প্রতিটি দল থেকে কিছু লোক কেন বের হয় না, যাতে তারা দ্বিনের গভীর জ্ঞান আহরণ করতে পারে এবং যখন আপন সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাবর্তন করবে তখন তাদের সতর্ক করতে পারে, যাতে তারা (গুনাহ থেকে) বেঁচে থাকে’ (সুরা তওবা : ১২২)। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা দ্বিনের বিশেষ জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়েও জ্ঞান অর্জন করছে। তাদের ডিগ্রির স্বীকৃতিতে রাজনীতির চেয়ে তাদের অধিকারের স্বীকৃতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain@justice.com









« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com