Friday, 19 January, 2018, 7:21 PM
Home
হাওরে মাছের মড়ক ও তার দায়
সমকালে লিখেছেন পাভেল পার্থ
Published : Saturday, 22 April, 2017 at 5:18 PM, Count : 50

তলিয়ে যাওয়া হাওরে প্রশ্নহীনভাবে মরছে জীবন। একের পর এক। মাছ, জলপোকা, জোঁক, হাঁস, মাকড়, কি সাপ। লুটিয়ে পড়ছে জলজ তৃণগুল্মের শরীর। সবার চোখের সামনেই দুঃসহ এক যন্ত্রণা পাড়ি দিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছে দেশের ছয় ভাগের এক ভাগ অঞ্চল।
পাহাড়ি ঢলের তলায় বোরো মৌসুমের উফশী জাতের ধান গাছগুলো পুষ্ট কি অপুষ্ট দানা নিয়ে ডুবে গেছে। এসব উফশী জাতের ধান খর্বাকৃতির। পাহাড়ি ঢলে মুহূর্তেই ডুবে যায়। জলের তলায় বেশি সময় জীবিত থাকতে পারে না। তো জলের তলায় ধান গাছ মরে জলকে দূষিত করছে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। মাছসহ জলজ প্রাণগুলো জলের তলায় অক্সিজেন-স্বল্পতায় টিকে থাকতে পারছে না। মরে যাচ্ছে। জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের এমন করুণ মৃত্যু আমরা দেখেছিলাম সুন্দরবনের নদীতে তেলবোঝাই জাহাজ ডুবে যাওয়ার পর। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়েছিল। পানির ওপরে তেলের আস্তরণ পড়ে ছিল। কিন্তু সুন্দরবনের নদী ছিল জোয়ার-ভাটার নদী। ছিল সমুদ্রের কাছাকাছি। জলপ্রবাহে তেমন কোনো অভ্যন্তরীণ বাধা ছিল না। সুন্দরবন সেই দুঃসহ মৃত্যুযন্ত্রণা সামাল দিয়েছিল। কিন্তু হাওর-ভাটি এই দূষণ কীভাবে সামলাবে? এখানে জোয়ার-ভাটা নেই। চারদিকে প্লাবিত হয়ে একটা জলাবদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া হাওরের চারধারজুড়ে উজান কি ভাটিতে নানা কিসিমের বাঁধ আছে। আছে নানা ধরনের অবকাঠামো। এ ছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে আসা বালি ও পাথরে ঢাকা পড়ে আছে হাওর। হাওরবাসীর অভিধানে বলে, 'হাওর মুইঞ্জ্যা গেছে'। এই মুইঞ্জ্যা যাওয়া হাওরে পাহাড়ি ঢলের জল ধরে রাখার জায়গা নেই। তাই চারদিকে ছড়িয়ে প্লাবিত হয়ে পড়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। হাওর কেবল মানুষের জন্যই এখন খাদ্যহীন অঞ্চল নয়। এখানে গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগির খাবারও তলিয়ে গেছে। কেবল মানুষ বা গৃহপালিত প্রাণসম্পদ নয়; হাওরের প্রাকৃতিক প্রাণবৈচিত্র্যও এক চরম খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। এ অবস্থা আরও বেশি দিন চলতে থাকলে হাওর অঞ্চল এক গভীরতর প্রতিবেশগত সংকটে পড়তে বাধ্য হবে।
হাওর থেকে একেবারেই উধাও হয়ে যাওয়া একটি মাছের নাম নানিদ। নল-নটা বনের ধারে নাভিতে আঙুল ঢুকিয়ে নানিদ মাছ ধরার এক আদি কায়দা দুনিয়া থেকে হারিয়ে গেছে। চিতল, বাঘাইড়, মহাশোল, বেরকুল, এলং, বামস, রানী, আলুনী, সিলং, বাছা, ঘাইরা, চিরাই, দেশি পাঙ্গাস, গাং মাগুর, কোটা কুমিরের খিল, ঘাঘলা, ঘোড়ামুখ, রিঠা, আগুনচোখা, আইড়, গুতুম মাছও হাওর থেকে হারিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। চলতি সময়ে হাওরে যেভাবে মরছে মাছ, তাতে কতগুলো প্রজাতি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কে জানে! অধিকাংশ মাছ মরছে হাঁ করে। মানে পানিতে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় অক্সিজেনটুকু পায়নি এসব অভাগা মাছ। এমনকি হতে পারে তলিয়ে যাওয়া পানিতে ধান গাছগুলো পচে পানিতে অ্যামোনিয়া গ্যাস তৈরি করছে, যে কারণে মাছসহ জলজ জীবের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন।
চলতি সময়ে হাওরের মাছসহ জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের এই করুণ মৃত্যুকে শুধু পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন আর অ্যামোনিয়ার পরিমাণ দিয়েই কি দেখা হবে? ভয়াবহভাবে মাছের মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জের হাওরে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি। বাংলাদেশের এক প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন অঞ্চল। হাকালুকি, হাইল, কাউয়াদীঘি কি ঘুইঙ্গ্যাজুড়ির মতো হাওরগুলো মূলত দেশের চা বাগান অঞ্চলে অবস্থিত। চা বাগানে মনস্যান্টো কোম্পানির রাউন্ডআপসহ নানা কোম্পানির আগাছানাশক ব্যবহৃত হয়। ব্যবহৃত হয় নানা রাসায়নিক বিষ। বৃষ্টিপাতের ফলে চা বাগান ধোয়া পানি এসে সব সময় এসব হাওরে গড়ায়। এর আগেও হাকালুকি ও হাইল হাওরে মাছেদের মৃত্যু ঘটেছে। এ বছর মাছেদের মৃত্যুর সঙ্গে চা বাগানে ব্যবহৃত বিষ জড়িত কি-না, এটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। অনেকে বলছেন, হাওরের জমিতে বোরো মৌসুমে আবাদের জন্য জমিতে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার ও বিষ ব্যবহৃত হয়। এই সার ও বিষই পানিতে অ্যামোনিয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে পানিকে দূষিত করছে। কারণ এটি তো ঠিক, দেশের হাওরাঞ্চলে সিনজেনটা কোম্পানির আগাছানাশক রিফিট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কৃষি জমিনে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও বিষ এই মাছের মৃত্যুর জন্য দায়ী কি-না, এটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
তলিয়ে যাওয়া হাওরে ধান গাছ পচে অ্যামোনিয়া ও দ্রবীভূত অক্সিজেনের তারতম্য, চা বাগানের বিষ, কৃষিজমির সার, বিষ- এসব হয়তো এবারের মাছসহ জলজ প্রাণবৈচিত্র্যের মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিন্তু আর কিছু? ২০০৭ সালে সুনামগঞ্জের মাটিয়ান হাওর ও শনির হাওরে চৈত্র-বৈশাখ মাসে মরেছিল ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ। ঘইন্যা মাছের সংখ্যা ছিল বেশি। ২০০৮ সালে আবার মরেছিল ঘইন্যা মাছ। হাওরবাসী প্রতিবাদ করেছিলেন- মেঘালয় পাহাড়ের খনি এলাকা থেকে দূষিত পানি এসে নদী ও হাওরের মাছেদের মেরে ফেলেছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতের মেঘালয় পাহাড়ে আছে অপরিকল্পিত নানা খনি এলাকা। কয়লা, চুনাপাথর থেকে শুরু করে ইউরেনিয়াম খনি। কয়লা খনির সালফারসহ বর্জ্য পানিতে সীমান্তবর্তী হাওরের মাছ ও জলজ জীবের মৃত্যু প্রায়ই ঘটে থাকে। সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের ত্বকের রোগসহ নানা রোগ হয়। বাকি রইল ইউরেনিয়াম খনি। এর বিরুদ্ধে উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিবেশবাদী ও আদিবাসী সংগঠনগুলো আন্দোলন করছে। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চল থেকে এই খনি অঞ্চলের দূরত্ব প্রায় ২০ কি.মি.। তবে পশ্চিম খাসি পাহাড়ের এই অঞ্চল থেকেই নেমেছে শত-সহস্র পাহাড়ি ছড়া। ভুরুঙ্গাছড়া, লাকমাছড়া, নয়াছড়া, পাগলাছড়া, গারোছড়া, রাজাইছড়া- এ রকম নানা নামের পাহাড়ি ছড়া। এসব পাহাড়ি ছড়াই নেমে এসেছে টাঙ্গুয়ার হাওর, সজনার হাওর কি শনির হাওরে। এসব পাহাড়ি ছড়া থেকেই জন্ম নিয়েছে হাওরের নদী রক্তি, পাটলাই কি যাদুকাটা। পশ্চিম খাসি পাহাড়ের ইউরেনিয়াম খনির বর্জ্য দূষণে এবারের মাছেদের মৃত্যু ঘটছে কি-না, এটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ হাওর সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়া। জাতিসংঘ ঘোষিত রামসার অঞ্চল। মৌলভীবাজারের হাকালুকি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা। পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া এসব হাওর আজ গভীর দুঃসহ যন্ত্রণা পাড়ি দিচ্ছে। বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ছে, খাদ্যশৃঙ্খল উল্টেপাল্টে যাচ্ছে। অথচ জাতিসংঘ বা দেশের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কোনো কথা বলছে না। কোনো বিশেষ সতর্কতা বা তৎপরতাও দেখাচ্ছে না। টাঙ্গুয়ার হাওরের আলংয়ের ডুয়ার, পাইন্যাখালী বাগ ও বিনোদপুর বাগ বিরল প্রাণবৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল। এ রকম বিশেষ অঞ্চল দেশের সব হাওরেই আছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যদি আবদ্ধ পানি দূষিত হয়ে থাকে তবে হাওরের এমন বিশেষ অঞ্চলগুলো গভীর সংকটে পড়তে পারে। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজিনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তা পানির ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন ও জুওপ্ল্যাঙ্কটনকে মেরে ফেলবে। হাওরের খাদ্যশৃঙ্খলের প্রাথমিক খাদ্য উৎপাদনকারী অণুজীবের মৃত্যু ঘটলে তা একে একে খাদ্যস্তরের সব জীবকেই সংকটে ফেলবে, যার সুদূরপ্রসারী যন্ত্রণা প্রথমত সামাল দিতে হবে হাওরবাসী মানুষকে।

গবেষক, প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ
animistbangla@yahoo.com








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com