Tuesday, 24 October, 2017, 4:31 AM
Home
তাদের উদ্দেশ্য এক, কর্মপন্থা ভিন্ন
যুগান্তরে লিখেছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
Published : Saturday, 22 April, 2017 at 5:18 PM, Count : 112
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের পর আরেকটি মৌলবাদী দল মাথা তুলতে চাইছে। এই দলটির নাম হেফাজতে ইসলাম। এদেরও শক্তির ভিত্তি একশ্রেণির মসজিদ এবং কওমি মাদ্রাসা। ধর্ম প্রচার বা শান্তিপূর্ণভাবে ধর্মীয় রাজনীতি করতে চাইলে হেফাজত সম্পর্কেও আপত্তি করার কিছু ছিল না। যেমন পাকিস্তান আমলের নেজামে ইসলাম দল। ১৯৭১ সালের পূর্ব পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নেজামে ইসলাম একটি শক্তিশালী দল ছিল এবং তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দেশে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পথে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন। এ জন্য ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় হক-ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্টে নেজামে ইসামকে গ্রহণ করা হয়েছিল। এমনকি নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাতেও স্থান দেওয়া হয়েছিল।

১৯৭১ সালে জামায়াতের পাল্লায় পড়ে নেজামে ইসলাম দল পাকিস্তানি হানাদারদের কোলাবরেটর না সাজলে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার একটা নতুন অবস্থান তৈরি হতে পারত। তাদের রাজনৈতিক ভ্রান্তির জন্যই তা হয়নি। এ কথা স্বাধীন বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামের রাজনীতি সম্পর্কেও প্রযোজ্য। দেশে ইসলাম ধর্মের হেফাজত করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে ও গণতান্ত্রিক পন্থায় দেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা তাদের লক্ষ্য হলে কারও আপত্তি করার কিছু ছিল না।

সারাবিশ্বেই একসময় কমিউনিস্ট পার্টির লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র সংগামের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল। ভারতে ও পাকিস্তানে এ জন্য বহুকাল তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত দল ছিল। সশস্ত্র বিপ্লব ঘটিয়ে ক্ষমতা দখলের পন্থা ত্যাগ করে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পন্থায় রাজনীতির অঙ্গীকার করার পরই ভারতে তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয় এবং তারা পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা ও ত্রিপুরায় সরকার গঠনেও সক্ষম হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে তারা ৩৪ বছর রাজত্ব করেছে।

বাংলাদেশেও হেফাজত শান্তিপূর্ণ পন্থায় ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করলে কারোরই আপত্তি করার কিছু ছিল না। জামায়াতের সঙ্গে তাদের লক্ষ্য ও আদর্শের মিল থাকলেও দু'দলের মধ্যে বড় পার্থক্য, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় হেফাজতের জন্ম হয়নি এবং দলটির পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগিতা দানের কোনো সুযোগ ছিল না। গণহত্যায় দলটির নেতাদের কারও সহযোগী হওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। সুতরাং ১৯৫৪ সালের নেজামে ইসলামের মতো বর্তমান বাংলাদেশে হেফাজত কোনো গণতান্ত্রিক দলের সঙ্গে মিলেমিশে যদি দেশের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে চায়, তাতে বাধা দেওয়ার কিছু ছিল না।

ব্রিটিশ ভারতে মহাত্মা গান্ধী ছিলেন অসাম্প্রদায়িক কংগ্রেসের অঘোষিত নেতা। তিনি ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদের জন্য অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিলেন। এই ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে গোঁড়া মুসলিম সম্প্রদায়কেও টেনে আনার জন্য তিনি তুরস্কের মধ্যযুগীয় খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতে অসহযোগ আন্দোলনের পাশাপাশি খেলাফত আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং তাতে টেনে এনেছিলেন দেওবন্দের ছাত্র ও শিক্ষকদেরও। মওলানা হাসরত মোহানী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, আলীগড়ে শিক্ষিত মওলানা শওকত আলী, মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর প্রমুখ ছিলেন এই খেলাফত আন্দোলনের নেতা।

বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা গণতন্ত্র রক্ষা, জামায়াত ও বিএনপির হিংসাত্মক রাজনীতি রোখার জন্য হেফাজতের সহযোগিতা গ্রহণ করে থাকলে অন্যায় কিছু করেননি। তার এই রাজনীতি কৌশলের রাজনীতি; কিছুটা আপস করে চলার রাজনীতি। কিন্তু আত্মসমর্পণের রাজনীতি নয়। অবশ্যই সৌদি ওয়াহাবি মতবাদ এবং পলিটিক্যাল ইসলামের অনুসারী জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী হিংস্র রাজনীতির মোকাবেলায় ইসলাম ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষাদানের জন্য হেফাজতকে কাছে টেনে রাখা এবং জামায়াত ও হিযবুত, হরকাত প্রভৃতি সন্ত্রাসী দল থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা দরকার ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার এ ব্যাপারে কোনো ভুল করেছে বলে আমার মনে হয় না।

কিন্তু হেফাজতের স্বরূপ সম্পর্কে আওয়ামী লীগ এবং তার সরকারকে অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত। দিন দিন এ কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, জামায়াত ও হেফাজতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পার্থক্য কর্মপন্থায়। জামায়াত সন্ত্রাসীপন্থায় যে উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে চায়, হেফাজত তা নমনীয় পন্থায় সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি দ্বারা চায় পূর্ণ করতে। সন্ত্রাস দ্বারা সরকার উৎখাতের চেষ্টায় তারা ব্যর্থ হয়েছে ২০১৩ সালে। ঢাকায় শাপলা চত্বরে তাদের ভয়াবহ অভ্যুত্থান চেষ্টা হাসিনা সরকার ব্যর্থ করতে না পারলে দেশে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ শুরু হতো এবং বাংলাদেশে আধা তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হতো।

হেফাজতের এই উদ্দেশ্য পূরণে তখন এগিয়ে এসেছিল বিএনপি, জামায়াত; এমনকি জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টিও। তারা হেফাজতের মধ্যযুগীয় ১৩ দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল এবং ঢাকার দিকে মিছিল করে অগ্রসরমান হেফাজতিদের পথে পথে খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করেছিল। হেফাজতিদের এই অভ্যুত্থানের সাফল্যের সম্ভাবনায় বেজায় খুশি হয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া শেখ হাসিনাকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিলেন ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়ার জন্য। 'দেশে হেফাজতি হুজুরের শাসন কায়েম হয়ে গিয়েছে' বলে প্রচার করা হয়েছিল।

কবি নজরুল বলেছেন, 'প্রেম ও প্রহার এই দু'টি মোর নীতি'। ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতি অভ্যুত্থান ব্যর্থ করার জন্য হাসিনা সরকার এই দুটি নীতি সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছে। কোনো সংঘর্ষে না গিয়ে, তেমন রক্তপাত না ঘটিয়ে কেবল ভয় দেখিয়ে হেফাজতি সমাবেশ সরকার ব্যর্থ করে দেয়। পরবর্তী ধাপে হেফাজতি নেতাদের প্রচুর 'এনাম' ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্তের জাল থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এটা ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এই সাফল্য ছাড়া বাংলাদেশকে তার বর্তমান অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক অবস্থানে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হতো না।

এখানেই যদি লেখাটার ইতি টানতে পারতাম, তাহলে ভালো হতো। কিন্তু ভবির চাতুরী বোঝা দায়। দেখা যাচ্ছে, হেফাজত এখন সরকারের কাছ থেকে দু'হাতে সুযোগ-সুবিধা লুটছে। অন্যদিকে পবিত্র ইসলামের নাম ভাঙিয়ে ভোটের রাজনীতির সুযোগ নিয়ে সরকারের কাছ থেকে এমন সব দাবি-দাওয়া আদায় করে নিতে চাচ্ছে, যা পূরণ করা হলে দেশটির অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চরিত্রই সম্পূর্ণ বদলে যাবে। ধর্মান্ধতা নতুন প্রজন্মের মন-মানসিকতাকে আচ্ছন্ন করবে। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে হিংসার রাজনীতি অনুসরণ করে জামায়াত যে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, হেফাজত সেখানে সরকারের কোলে-পিঠে বসেই সেই লক্ষ্যে পেঁৗছার কাজে সফল হতে চাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের এখানেই সতর্ক হওয়া উচিত। পঞ্চাশের দশকে ভারতে কমিউনিস্টদের প্রতি নেহরু সরকারের প্রেম ও প্রহারের নীতি কমিউনিস্ট পার্টির একটা বড় অংশকে সশস্ত্র সংগ্রাম দ্বারা ক্ষমতা দখলের নীতি থেকে সরিয়ে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে টেনে এনেছিল। বর্তমান বাংলাদেশে হেফাজতিদের শাপলা অভ্যুত্থান ব্যর্থ করার পরও আওয়ামী লীগ সরকার তাদের হুমকিদানের রাজনীতি থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি। এই হুমকি যে কোনো সময় হিংসাত্মক তৎপরতায় পরিণত হতে পারে। সেই চেষ্টা তারা একবার করেছে শাপলা চত্বরে। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে সেই চেষ্টা তারা আবার করবে না- তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

আওয়ামী লীগ সরকারের সম্প্রসারিত সমঝোতার হাতকে হেফাজত সরকারের দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে ধরে নিয়েছে। শুধু হুমকি দিয়ে তারা পাঠ্যপুস্তকের যে ধর্মীয়করণ করেছে, তার ফল হবে সুদূরপ্রসারী। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা পাঠ্যপুস্তকে যা শিখবে তা আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ-চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী। এই পাঠ্যসূচি বাংলাদেশকে আবার অন্ধকার যুগে ফিরিয়ে নেবে। শিক্ষার বিজ্ঞানীকরণের বদলে ধর্মীয়করণ যে কোনো জাতির জন্য ভয়াবহ। কওমি মাদ্রাসার ১৪ লাখ (বেসরকারি হিসাব) ছাত্রের স্বার্থ ও ভবিষ্যতের দায়িত্ব অবশ্যই সরকার গ্রহণ করবে। কিন্তু তার শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাঠ্যসূচি আধুনিকীকরণ ছাড়া কওমি মাদ্রাসার জন্য এই অবাধ ছাড়পত্র শুধু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নয়, সমাজ জীবনেও সুস্থ ভারসাম্য নষ্ট করবে। এ ক্ষেত্রে শিব গড়তে গিয়ে 'বাঁদর' গড়ার ভ্রান্তি অনুসরণ করার শঙ্কা থেকে যাচ্ছে।

ভোটের রাজনীতির জন্য আদর্শের রাজনীতির একটু হেরফের আজকাল সব দেশেই হয়। ভারতের কেরালা রাজ্যে এক সময় কট্টর কমিউনিস্ট দলকে মুসলিম লীগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গড়তেও দেখেছি। কিন্তু কমিউনিস্ট ও মুসলিম লীগের এই কোলাকুলিরও একটা সীমানা ছিল। বর্তমান বাংলাদেশে হিংস্র মৌলবাদীদের সন্ত্রাস দমনে সরকার হেফাজতকে ব্যবহার করুক, তা রাজনৈতিক কৌশল; কিন্তু তাদের মধ্যযুগীয় দাবি-দাওয়ার কাছে ক্রমাগত নতি স্বীকার করা বিপজ্জনক। আগামী সাধারণ নির্বাচনে হেফাজতের ভোট আওয়ামী লীগ পাবে না; কিন্তু হেফাজতের দাবির কাছে ক্রমাগত নতি স্বীকার করলে আওয়ামী লীগ দেশের গণতন্ত্রমনা ও প্রগতিশীল ভোটদাতাদের এক বিশাল অংশের ভোট হারাতে পারে। তারা আওয়ামী লীগ সম্পর্কে হতাশ হয়ে বিএনপিকে অবশ্যই ভোট দেবে না। কিন্তু ভোটকেন্দ্রে অনুপস্থিত থাকতে পারেন। আওয়ামী লীগের জন্য তা হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

মূর্তি এবং ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য কী_ হেফাজতের শীর্ষ নেতারা জানেন না, তা মনে হয় না। তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের নাম ভাঙিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন। শেখ হাসিনা এদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সতর্ক হোন। জামায়াত ও হেফাজতের কৌশল ও কর্মপন্থা ভিন্ন; কিন্তু উদ্দেশ্য অভিন্ন। শেখ হাসিনা এদের বিচ্ছিন্ন রাখার কৌশল অনুসরণ করুন; কিন্তু এদের উদ্দেশ্যের অভিন্নতা সম্পর্কে তার দল ও সরকারকে সতর্ক রাখুন। প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করুন।

লন্ডন, ২১ এপ্রিল, শুক্রবার, ২০১৭








« PreviousNext »

সর্বশেষ
অধিক পঠিত
এই পাতার আরও খবর
ইনফরমেশন পোর্টাল অব বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড -এর চেয়ারম্যান সৈয়দ আবিদুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রওশন জামান -এর পক্ষে সম্পাদক কাজী আব্দুল হান্নান  ও উপদেষ্টা সম্পাদক সৈয়দ আখতার ইউসুফ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত
ইমেইল: info@iportbd.com, বার্তা বিভাগ: newsiport@gmail.com